Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

সঙ্ঘ-মমতার বেঙ্গল চ্যাপ্টার

চন্দন দাস
তৃণমূলের সৃষ্টি থেকে আজকের পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত যদি রাজনৈতিক পরিবেশের একটি রেখচিত্র আঁকা যায়, কয়েকটি উপাদান কিছুতেই নজর এড়াতে পারে না। প্রথমে মমতা ব্যানার্জি ১৯৯৭-এ বলেছেন ‘বিজেপি অচ্ছুৎ নয়।’ রাজ্যে বিজেপি জোটসঙ্গী পেয়েছিল তাঁকে। তারপর সঙ্ঘ তাঁকে বলেছে ‘সাক্ষাৎ দূর্গা।’ বামফ্রন্ট সরকারকে হঠাতে তৃণমূলের সব কটি নৈরাজ্য-প্রয়াসের সঙ্গী ছিল বিজেপি। ২০০৪-এ প্রথম ইউপিএ সরকার। ২০০৬-০৭ থেকে রাজ্যে ‘শিল্প বনাম জমি’ ন্যারেটিভ হাজির করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি।
rss mamata bengal chapter

গত ৩০শে নভেম্বর বিবৃতি দিলেন দত্তাত্রেয় হোসাবলে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সেই বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে পরামর্শ দিলেন সঙ্ঘের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তথা ‘সরকার্যাবহ’। মমতা ব্যানার্জি মুখ খুললেন তার দুদিন পর। 

নাগপুরের সুর বেজে উঠলো পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায়।

হোসাবলে বলেছিলেন,‘‘এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, ভারত, বিশ্ব সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাংলাদেশের ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের সংহতি প্রকাশ করতে হবে।’’

তৃণমূল নেত্রী বিধানসভায়, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বললেন গত ২ ডিসেম্বর। তিনি বললেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়টিকে রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিয়ে যাওয়া উচিত। যাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফ থেকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো যায়।’’ 

হোসাবলের ‘আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি’র নামে বাড়ানো পাস ধরে মমতা ব্যানার্জি খেললেন ‘রাষ্ট্রসঙ্ঘ’,‘শান্তিরক্ষী বাহিনী’। প্রাক্তন তৃণমূলী, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী সময় নষ্ট করলেন না। সেদিনই পেট্রাপোল সীমান্তে দলীয় সভায় তিনি বলে দিলেন, ‘‘আমি তো দুদিন আগেই বলেছিলাম, রাষ্ট্রসঙ্ঘের উচিত বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর। উনি (মুখ্যমন্ত্রী) আজ সেটা বিধানসভায় বলেছেন।’’

কে বড়ো হিন্দু-দরদী, সেই খেলা চলছে রাজ্যে, তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে। আসলে দুই দলই খেলছে একই পক্ষে— সঙ্ঘের পক্ষে। 

যদিও বিদেশনীতি নিয়ে কথা বলা তৃণমূলের সংস্কৃতি বিরোধী। তৃণমূল নেত্রীই জানিয়েছেন একাধিকবার, গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে। তিনি বলেছেন, ‘‘আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। যারাই কেন্দ্রের সরকারের থাক, তাদের বিদেশনীতির পক্ষে আমরা। আমরা বিদেশনীতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা করি না।’’ কিন্তু তিনিই দেশের সরকারের বাংলাদেশের বিষয়ে কী করা উচিত সেই বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে ফেললেন প্রকাশ্যে। আর তা মিলে গেল আরএসএস-এর সঙ্গে! 

তবে তা বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। প্যালেস্তাইন, ইজরায়েলও ভিনদেশ। কিন্তু সেই প্রশ্নে মমতা ব্যানার্জির মুখে ‘লিউকোপ্লাস্ট’! 

হিসাব স্পষ্ট— মোদীর সরকার ইজরায়েলের বন্ধু। গাজায় নেতানিয়াহুর সামরিক বাহিনীর লাগাতার গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি শব্দ খরচ করেনি বিজেপি। কারণ, আরএসএস-এর গাজায় এই মার্কিন-ইজরায়েলি নৃশংসতার পক্ষে। সঙ্ঘ ইজরায়েলের জায়নবাদের পক্ষে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই নীতির পক্ষে আছেন মমতা ব্যানার্জি। তিনি সঙ্ঘের অনুসারী। 

এই পরিস্থিতিতে সঙ্ঘ পরিবারের ন্যারেটিভ ছড়াচ্ছে রাজ্যময়—  গাজা মানে মুসলমানদের ‘উচিত শিক্ষা’। বাংলাদেশ মানে ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়।’ সেই সূত্রেই আসছে দ্বিতীয় ভাষ্য— ‘সিপিআই(এম) গাজার সময় মিছিল করে, বাংলাদেশের বেলায় চুপ।’ সোশাল মিডিয়ায় লিখছেন একাংশ— ‘মুসলমানরা সিপিএম-কে ভোট দেয় না, তবু সিপিএম ওদের দালালি করে, গাজা নিয়ে মিছিল করে।’ এই প্রচারে সংগোপনে তাল দিচ্ছে তৃণমূল। 

গাজায় নৃশংস আক্রমণের বিরুদ্ধে কলকাতায় মিছিল করেছেন বামপন্থীরা। জেলাগুলিতেও মিছিল, প্রতিবাদ সভা হয়েছে। ‘বাংলাদেশে হিন্দুরা যখন আক্রান্ত হয়েছিল, তখন তো মিছিল দেখিনি’—  ট্রেনে, রাস্তায় বলতে শোনা যাচ্ছে একাংশকে। সুকৌশলে সমাজের বিভিন্ন অংশে সঙ্ঘ পরিবার এই প্রচার পৌঁছে দিচ্ছে। 

যদিও প্যালেস্তাইনের সংকট আর বাংলাদেশের পরিস্থিতি এক নয়। সিপিআই(এম) তা অনেক আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছে। প্যালেস্তাইনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে জায়নবাদী ইজরায়েলের শাসকরা একটি স্বাধীনতাকামী জাতির স্বপ্ন ধ্বংস করে দিতে চাইছে। উৎখাত করতে চাইছে প্যালেস্তিনিয়দের। গাজা দখলের ইচ্ছা ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র, যুবদের মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা-বিরোধী আন্দোলনকে ভুল পথে চালনা করা হচ্ছে। মৌলবাদীদের মদতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকেই ধুলিস্যাৎ করার চেষ্টা হচ্ছে ৩২নং ধানমন্ডির বাড়িটির মতো। আক্রান্ত সেখানে সব অংশের মানুষ। সিপিআই(এম) তার প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত ৬ ডিসেম্বর কলকাতায় বামফ্রন্ট বিরাট মিছিল করেছে। আহ্বান ছিল, ‘ভারতে হোক বা বাংলাদেশে, ধর্মীয় উপসনাস্থল ভাঙার রাজনীতি মানছি না।’ 

মোদ্দা কথা, সঙ্ঘর ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে লড়ছে বামপন্থীরাই। সঙ্ঘের অঙ্কে একই দলে খেলছে তৃণমূল এবং বিজেপি। ফলে রাজ্যে কোনও ত্রিমুখী লড়াই নেই। একটি দ্বিমুখী লড়াই-ই আছে। তবে তা তৃণমূল বনাম বিজেপির নয়। লড়াই বামপন্থীদের সঙ্গে সঙ্ঘ পরিবারের।

গাজা, বাংলাদেশের ইস্যু তার একটি প্রকাশ। 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে স্বাধীনতার পরে ধর্ম কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠতে পারেনি। বেশিরভাগ সময়ে তা কোনও ইস্যুই ছিল না। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে জোরদার প্রচার, আন্দোলন হয়েছে। বিশেষত বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে। সেই ভয়ংকর ঘটনার পরে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব লক্ষ করা গেলেও, পশ্চিমবঙ্গে তারা দাঁত ফোটাতে পারেনি। বামপন্থীরা শক্তিশালী ছিলেন এই রাজ্যে। কখনও জমির আন্দোলন ছিল কেন্দ্রে। কখনও গণতন্ত্রের বিকাশের স্বার্থে পঞ্চায়েত, পৌরসভা গড়ে তোলা কিংবা তাকে আরও বিকশিত করা ছিল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মাধ্যাকর্ষণ। আবার ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েতের সুফল রক্ষা এবং কৃষির বিকাশকে সংহত করার লক্ষ্যে শিল্পে অগ্রগতির প্রশ্ন রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বামপন্থীরা। 

তৃণমূলের সৃষ্টি থেকে আজকের পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত যদি রাজনৈতিক পরিবেশের একটি রেখচিত্র আঁকা যায়, কয়েকটি উপাদান কিছুতেই নজর এড়াতে পারে না। প্রথমে মমতা ব্যানার্জি ১৯৯৭-এ বলেছেন ‘বিজেপি অচ্ছুৎ নয়।’ রাজ্যে বিজেপি জোটসঙ্গী পেয়েছিল তাঁকে। তারপর সঙ্ঘ তাঁকে বলেছে ‘সাক্ষাৎ দূর্গা।’ বামফ্রন্ট সরকারকে হঠাতে তৃণমূলের সব কটি নৈরাজ্য-প্রয়াসের সঙ্গী ছিল বিজেপি। ২০০৪-এ প্রথম ইউপিএ সরকার। ২০০৬-০৭ থেকে রাজ্যে ‘শিল্প বনাম জমি’ ন্যারেটিভ হাজির করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। যা আসলে, আজ বোঝা যায়, শুধু শিল্প-বিরোধিতা ছিল না। যেহেতু রাজ্যের শিল্পের বিকাশের উপর ভূমিসংষ্কার রক্ষা, পঞ্চায়েতের আরও উন্নতি এবং সমাজে নতুন মননের বিকাশ নির্ভরশীল ছিল; তাই বামফ্রন্ট সরকারের সেই শিল্পায়নের প্রক্রিয়ায় নৈরাজ্য সৃষ্টির আসল লক্ষ্য ছিল প্রতিক্রিয়ার শক্তির জমি তৈরি করা। 

মমতা ব্যানার্জি এবং তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং অর্থনীতির সেই ক্ষতি করেছে সঙ্ঘ পরিবারের স্বার্থে। কৃষকের জমির জন্য মমতা ব্যানার্জি লড়েননি। সেদিন তিনি সঙ্ঘের জমির জন্য ছুটেছেন, বসেছেন, চিৎকার করেছেন। প্রায় ৭৫ বছর পরে রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রে ধর্মকে ইস্যু করে তুলতে পেরেছেন মমতা ব্যানার্জি। যা সঙ্ঘের প্রয়োজন ছিল। 

সাম্প্রতিক কাণ্ডগুলি দেখা যাক।

বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী গত ১১ মার্চ বিধানসভার লবিতে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের পর তাঁর কর্মসূচি সম্পর্কে বললেন, ‘‘বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়কে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাবো, আর ওদের (তৃণমূল) যে কটা মুসলমান বিধায়ক জিতে আসবে, বিজেপি সরকারে আসবে, চ্যাংদোলা করে তুলে রাস্তায় ফেলবো। ১০ মাস পরে এই রাস্তায় ফেলব।’’ 

বেশ কিছুদিন সাংসদ, বিধায়ক থাকা শুভেন্দু ভালো করেই জানতেন যে, এমন কথা সংসদীয় গণতন্ত্রে, ধর্মনিরপেক্ষ দেশে বলা উচিত নয়। তবু বলেছেন। মমতা ব্যানার্জি পরের দিনই শুভেন্দুর বাড়ানো পাস ধরে বলে নিয়েছেন, ‘‘মুসলমান এমএলএ-দের ছুঁড়ে ফেলে দেবে? এত সাহস! আমি নিজে হিন্দু। আমার বাড়িতে কালীপুজো হয়, সব ধরনের পুজো হয়।’’  

২০০৭-০৮-এ যিনি ছিলেন মাওবাদীদের পছন্দের, সেই শুভেন্দু অধিকারী, প্রাক্তন তৃণমূলী শুভেন্দু এখন সঙ্ঘের প্রিয়পাত্র। কারণ তিনি মমতা ব্যানার্জিকে সুযোগ করে দিলেন ধর্ম নিয়ে বলতে। 

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিধানসভার বাইরে নন্দীগ্রামের বিধায়ক বলেছিলেন, ‘‘এই সরকার মোল্লাদের সরকার। এই সরকার মুসলমানদের সরকার। এই সরকার কাশ্মীরি জঙ্গি জাভেদ মুন্সির সরকার। এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মুসলিম তোষণকারী, হিন্দুবিরোধী, মুসলিম লিগ-২-এর সরকার।’’ পশ্চিমবঙ্গের সমাজে দ্রুত প্রোথিত হচ্ছে একটি দীর্ঘলালিত ধারণা। তা হল, সব মুসলমানই মৌলবাদী। উত্তরপ্রদেশ সহ দেশের নানা রাজ্যে বিজেপি, সঙ্ঘ পরিবারের সংখ্যালঘুদের লাগাতার আক্রমণের ঘটনায় ধর্মনিরপেক্ষ সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এমন পরিবেশে তৃণমূলকেই মুসলমানদের নিরাপত্তার স্বার্থবাহী একমাত্র দল হিসাবে প্রতিপন্ন করার সুকৌশলী চেষ্টা করলেন সঙ্ঘ-ঘনিষ্ট শুভেন্দু।

নাগপুরের ‘খেলা’ স্পষ্ট।

পরের দিন, ১৮ ফেব্রুয়ারি মমতা ব্যানার্জি সেই সুযোগও ব্যবহার করলেন। তিনি বিধানসভায় বলে রাখলেন, যা রেকর্ড হয়ে রইল, ‘‘আমি যে-বাড়িটায় থাকি, ছোটো থেকে, সেই বাড়িটায় একটি মন্দির আছে। শিবমন্দির। সেই দুয়ারে, যেখানে আমি মাথা রেখে ঘুমাই।’’ শিব তাঁর মাথায় থাকলে রাজ্যবাসীর কী লাভ, সেই প্রশ্ন স্বভাবতই বিধানসভায় বিজেপি করেনি। 

তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘‘আমিও কিন্তু ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে।’’ তাতে কী যায় আসে? শূদ্র হলে কী অসুবিধা হত? মুসলমান হলেই বা কী যায় আসে?

আসলে যায় আসে। মধ্য ভারতে বামপন্থীদের একাংশ এক সময় মনে করতেন ‘কাস্ট স্ট্রাগল ইজ দ্য ক্লাস স্ট্রাগল।’ এই প্রতিবেদক বিহারে বিধানসভা নির্বাচন কভার করতে গিয়ে এমন মানুষের মুখোমুখি হয়েছেন। দেশে উচ্চবর্ণের ধনীদের চক্রান্তে, আক্রমণে বিধ্বস্ত হন অনেক গরিব তথাকথিত নিচু জাতের মানুষ। কিন্তু তথাকথিত নিম্নবর্ণের উপর উঁচুজাতের নিপিড়নের সঙ্গে শ্রেণিসংগ্রামের সম্পর্ক আলোচনা এই লেখার বিষয় নয়। কিন্তু প্রবল ব্রাহ্মণ্যবাদী সঙ্ঘ এবার হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্য স্থির করেছে। আর সেই লক্ষ্যে তফসিলি জাতি, আদিবাসী, দলিত সহ অনগ্রসর জাতিগুলির মধ্যে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি, হিন্দুত্বের প্রসার তাদের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছে। 

গত ২১ থেকে ২৩ মার্চ আরএসএস-এর অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভার প্রতিবেদনে দাবি করেছে, দেশের ১০৮৪টি জায়গায় এমন নিপীড়ন তারা চিহ্নিত করেছে। তাদের শাখাগুলি এই সব এলাকায় হস্তক্ষেপ করছে। নিচু জাতের মানুষ যেখানে মন্দিরে ঢুকতে পারেন না, তারা তার বন্দোবস্ত করছে। দলিত, তফসিলি জাতি, আদিবাসী নিবিড় এলাকায় তারা নানা সামাজিক কাজ করছে এবং সর্বত্রই তারা একটি করে মন্দির বানাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সহায়তা করছে সঙ্ঘের ‘ব্যবসায়িক শাখা’গুলি। যাদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই হল মনুবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা, তারা হঠাৎ ‘সব জাত এক আত্মা এক প্রাণ’-এ উদ্বুদ্ধ হল কোন মন্ত্র বলে? লক্ষ্য আসলে ‘হিন্দু ঐক্য।’ হিন্দু রাষ্ট্রের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন যাঁদের জাতের নামে মেরেছে, তাঁদের ভুল বুঝিয়ে কাছে নিয়ে এসে কাজ হাসিল করা।

পশ্চিমবঙ্গে এই প্রশ্নে তাদের লক্ষ্য কী? 

কোচবিহার, নদীয়া, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদের হিন্দু প্রধান এলাকা, বীরভূম, আলিপুরদুয়ারের চা-বাগান, আদিবাসী প্রধান এলাকা, ঝাড়গ্রামে তাদের অগ্রগতি ভালো বলে তাদের দাবি। তাৎপর্যপূর্ণ হল, নদীয়া, কোচবিহারে সিংহভাগ মানুষ তফসিলি জাতির। সঙ্ঘ বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলন করেছে কলকাতায়, ‘কেশব ভবনে’। সেখানে তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দাবি করা হয়েছে তাদের অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি মধ্যবঙ্গে। ২০২৩-এর মার্চে মধ্যবঙ্গে তাদের শাখা ছিল ৪৮৩টি। ২০২৫-এর মার্চে তা পৌঁছেছে ৭৫৮টিতে। শাখা, মিলন (সাপ্তাহিক), মণ্ডলী (মাসিক) মিলিয়ে এই দু-বছরে এই মধ্যবঙ্গে তাদের সংগঠন ১৩২০ থেকে ১৮২৩-এ পৌঁছেছে। এরপরই উত্তরবঙ্গ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে ১০৩৪ থেকে শাখা, মিলন, মণ্ডলীর মিলিত সংখ্যা দু-বছরে পৌঁছেছে ১১৫৩-এ। দক্ষিণবঙ্গের এলাকা তুলনামূলক বড়ো। কলকাতা, হাওড়া শহর, দুই ২৪ পরগণা, দুই মেদিনীপুরের মতো জেলা নিয়ে সঙ্ঘের দক্ষিণবঙ্গ প্রান্ত। সেখানে গত দু-বছরে সংগঠন ১২০৬ থেকে ১৫৬৪-তে পৌঁছেছে বলে তারা দাবি করেছে। কিন্তু এখানেও সুন্দরবন, দুই মেদিনীপুরের তফসিলি জাতি, আদিবাসী প্রধান এলাকা এবং শহরাঞ্চলে বস্তি এলাকায় তারা বিস্তারের চেষ্টা করেছে।

সঙ্ঘের এই বিস্তার ঘটেছে মমতা ব্যানার্জির শাসনে। আর সঙ্ঘ যখন তফসিলি জাতি, আদিবাসী, ওবিসিদের মধ্যে যাঁরা হিন্দু, দলিতদের মধ্যে হিন্দুত্বের প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তখন তৃণমূল নেত্রী নিজের ব্রাহ্মণত্ব ঘোষণা করছেন কেন? জাতিগত পরিচিতিসত্তাকে জাগিয়ে তোলার এই কৌশলে আসলে সমাজে নয়া অঙ্ক তৈরি করতে চাইছেন তিনি এবং সঙ্ঘ। 

উল্লেখ্য, ২০১১-এর জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যে তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষ রাজ্যের জনসংখ্যার ২৩.৫ শতাংশ। রাজ্যে মোট জনসংখ্যার ৫.৮ শতাংশ আদিবাসী। ২০২১-এ জনগণনা হয়নি। দেশে তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষ আছেন ১৬.৬%। আদিবাসীরা আছেন ৮.৬%। অর্থাৎ রাজ্যে তফসিলি জাতির মানুষের হার সামগ্রিকভাবে দেশের হারের থেকে বেশি। রাজ্যে তফসিলিদের মধ্যে রাজবংশী ১৮.৪%। এরা মূলত উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা। এছাড়া নমঃশুদ্র ১৭.৪%, বাগদি ১৪.৯%, পৌন্ড্র ক্ষত্রিয় ১২%, বাউরি ৫.৯%, চামার ৫.৪% আছেন, তবে এরা সাব-কাস্ট। কিন্তু সংখ্যাগতভাবে উল্লেখযোগ্য। এরপরই যাঁরা উল্লেখযোগ্য, তাঁরা জালিয়া কৈবর্ত, হাঁড়ি, ধোপা সাব-কাস্ট। তাছাড়া শুঁড়ি এবং ডোম, ঝালোমালো, লোহার মাল, কাওরা, তিয়ার প্রভৃতি। 

রাজ্যের তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষের ৮৪.১% গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। ২০১১-র জনগণনা অনুসারে তফসিলিদের মধ্যে ৩১.৯% খেতমজুর, ২০.৩% কৃষক। ২০১১-এর পূর্বে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যের তফসিলি জাতি ও আদিবাসী সংরক্ষিত কেন্দ্রগুলিতে বামপন্থীরাই জয়ী হতেন। ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বলছে সেবারও তাঁদের এক বড়ো অংশ বামফ্রন্টকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে প্রথমে তাঁদের সমর্থন দেখা গেছে তৃণমূলের পক্ষে। ২০১৬ পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে এই মানুষদের মধ্যে বিজেপির প্রতি সমর্থন বেড়েছে। 

সঙ্ঘ এই মনুবাদী বিভাজনে তথাকথিত নিচুজাতের মানুষদের সব সামাজিক নিপীড়ন প্রশমিত করে ‘হিন্দু’ পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করার কৌশল নিয়েছে। এমন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নিজের ব্রাহ্মণত্ব ঘোষণা করছেন! 

অথচ তাঁর প্রশ্ন তোলার কথা রেগার কাজ তিন বছরের বেশি সময় কেন বন্ধ, কবে টাকা দেবে কেন্দ্রীয় সরকার, তা নিয়ে। জবকার্ডধারীরা গ্রামবাসী এবং তাঁদের বড়ো অংশ তফসিলি জাতি, ওবিসি, আদিবাসী। মমতা ব্যানার্জির প্রশ্ন করার কথা বিজেপি কেন শ্রম কোড চালু করে শ্রমিকদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রাজ্যের মানুষ জানতে চান, কেন গত ১৪ বছরে ন্যূনতম মজুরি বাড়েনি, কেন প্রতি বাড়িতে পানীয় জল পৌঁছোয়নি, কেন কৃষকের পাট্টা পাওয়া জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, কেন বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে প্রভৃতি বিষয়ে। 

তার বদলে দু-পক্ষের থেকে এল হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গ। সঙ্ঘ যেমন চায়।

এই ক্ষেত্রেও একটি বিষয়ই স্পষ্ট। রাজ্যে ইস্যুর প্রশ্নেও মেরু আছে সেই দুটিই। তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়। বামপন্থীরা বনাম তৃণমূল-বিজেপি। আসলে বামপন্থা বনাম সঙ্ঘ।


প্রকাশের তারিখ: ২৯-মার্চ-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

বর্তমান সময়ে প্রয়োজনীয় নিবন্ধ।।সকলের পড়া দরকার।।
- জীবেশ সরকার , ২৯-মার্চ-২০২৫


Agreed
- ANUSTUP Basu, ২৯-মার্চ-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৯১ টি নিবন্ধ
২৭-এপ্রিল-২০২৬

২৬-এপ্রিল-২০২৬

২১-এপ্রিল-২০২৬

২০-এপ্রিল-২০২৬

১৯-এপ্রিল-২০২৬

১৮-এপ্রিল-২০২৬

১৭-এপ্রিল-২০২৬

১৬-এপ্রিল-২০২৬

১৪-এপ্রিল-২০২৬

১৩-এপ্রিল-২০২৬