Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মেটা, মাস্ক এবং লুলা (পর্ব ১)

ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
...ওয়ার্কার্স পার্টি নিয়ে এল যুবমুখী প্রচার, ‘জুভেন্টুডেস কম লুলা’ বা ‘লুলার সঙ্গে যুব’রা। দলের ব্যানারে লেখা হল যুবদের দাবি— চাকরি, গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল ইনক্লুসন। আজকের দিনে যুবরা আর দীর্ঘ নির্বাচনী ইশতেহার পড়তে চায় না। তারা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কিংবা স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও থেকে দরকারি তথ্য জেনে নিতে চায়। ফলে বিমূর্ত বামপন্থী নীতিগুলিকে কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির চেহারায় বদলে দেওয়া হল। এতে লুলাকে ভোট দেওয়া এবং নিজের জীবনের উন্নতি— এদুটি বিষয় সংযুক্ত হয়ে গেল। বস্তুগত স্বার্থ এবং রাজনৈতিক সত্তার স্বার্থকে মিলিয়ে দেওয়া— ব্রাজিলের বামেরা এভাবেই দেশের যুবদের ভাবনায় একটা অর্থবহ বিবর্তন ঘটিয়ে দিলেন। রাষ্ট্রীয় নীতিগুলিকে নামিয়ে আনলেন জনজীবনের স্তরে। 
Meta, Musk and Lula Part I

ব্রাজিলে দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলা পেয়েছেন ৫১.৮ শতাংশ ভোট। বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২ শতাংশ। দুজনের ভোটের ব্যবধান ৩.৬ শতাংশ। এর আগে প্রথম দফার ভেটে লুলা পেয়েছিলেন ‌৪৫.১৬ শতাংশ ভোট (প্রায় ৫ কোটি ৩৯ লক্ষ ভোট) এবং বলসোনারো পেেয়ছিলেন ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট (প্রায় ৫ কোটি ৬১ লক্ষ ভোট)। মানে প্রথম দফায় ২২ লক্ষ ভোটে পিছিয়েছিলেন লুলা। সেবার দেশের ৩ কোটি ৩০ লক্ষ ভোটার ভোট দিতেই যাননি। অথচ দ্বিতীয় দফায় লুলা এগিয়ে গেলেন ৩.৬ শতাংশ ভোটে। এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতলেন তিনি।

দ্বিতীয় দফায় লুলা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লক্ষ ৪০ হাজার ভোট। পাল্টা বলসোনারো পেয়েেছন ৫ কোটি ৯৮ লক্ষ ৩০ হাজার ভোট। তার মানে দ্বিতীয় দফায় বলসোনারোর চেয়ে লুলা পেয়েছেন ৪৪ লক্ষ ১০ হাজার বেশি ভোট। আবার নিজের প্রথম দফার ভোটের পর লুলা দ্বিতীয় দফায় পেয়েছেন ১ কোটি ৩ লক্ষ বেশি ভোট। প্রশ্ন হল, কীসের টানে প্রথম দফায় ভোট না দেওয়া ৩ কোটি ৩০ লক্ষ ভোটারের বিপুল অংশ দ্বিতীয় দফায় ভোট দিতে এলেন? কেনই বা এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ লুলাকে ভোট দিলেন? কীভাবে এদের ভোটকেন্দ্রে টেনে আনা সম্ভব হল। এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা নানা দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। 

এক কথায় বললে, এ প্রশ্নের উত্তর হল জেন জি, সংক্ষিপ্ত ভিডিও এবং ডিজিটাল হাতিয়ার। 

ভেঙে বললে দাঁড়ায়, দ্বিতীয় দফায় বিপুল পরিমাণে জেন জি ভোট নিজের সমর্থনে আনতে পেরেছেন লুলা, এবং সেকাজে ব্যবহার করেছেন স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, শর্ট ফিল্ম ও শর্ট ভিডিও এবং জিডিটাল মাধ্যমকে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, মূলত জেন জির সমর্থন নিজের দিকে টানার লক্ষ্যেই এত সব মাধ্যমকে কাজে লাগিয়েছেন লুলার প্রচার সচিবেরা। এবং এগুলোকে সফল ভাবে কাজে লাগাতে না পারলে লুলা অনুপস্থিত ভোটারদের কত সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে টেনে আনতে পারতেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

জেন জি, আমি তোমাদেরই লোক

প্রথম দফার ভোটের পর দুটি বিষয় নজরে পড়ল লুলার। তিনি দেখলেন বলসোনারোর চেয়ে তিনি ২২ লক্ষ ভোটে পিছিয়ে পড়েছেন। এছাড়া ৩ কোটি ৩০ লক্ষ ভোটার ভোট দিতেই আসেননি, যাদের একটা বড় অংশ জেন জি। লুলা ও তাঁর প্রচার টিম বুঝলেন, অনুপস্থিত ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টেনে আনতে হবে। এবং টানতে হবে জেন জিকে। আত্মসমীক্ষা করে লুলা বললেন, গত এক দশকে যতগুলো জমায়েত তিনি করেছেন এবারের প্রথম দফার ভোটের আগের জমায়েতটা ছিল সবচেয়ে খারাপভাবে সংগঠিত। এতেই নড়েচড়ে বসল তাঁর প্রচার টিম।

প্রথমেই বহু পরীক্ষিত অফলাইন জমায়েত ডাকা হল অ্যাভেনডিয়া পলিস্টায় এবং এসপিরিটে সান্টো এলাকার থ্রি ব্রিজেস অঞ্চলে। জমায়েতের ডাক দিল ওয়ার্কার্স পার্টি। সেখানে এবার লুলা ভিড়ের মধ্যে নেমে পড়ে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থকদের সঙ্গে কথা বললেন। এটা ছিল প্রচারের নতুন কৌশল। ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন। কিন্তু এখানেই শেষ হল না। প্রচারের দায়িত্বে থাকা লোকজন এবার শক্ত হাতে ধরলেন সোশাল মিডিয়ার প্রচারকে।

মনে রাখা দরকার, প্রথাগত ভোটপ্রচারে মূলত অংশ নেন শিল্প,কৃষি ও পরিষেবা ক্ষেত্রে থাকা লোকেরা। তাঁরা মূলত শ্রমিক, কৃষক ও কর্মচারী। এঁরা বড় জমায়েতের লঙ্গে পরিচিত। কারণ রুটিরুজি বাঁচানোর লক্ষ্যে নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে তাঁদের রোজই লড়তে হয়। কারখানায়, মাঠেঘাটে, এলাকায়, এলাকার বাইরে সংগঠিত লড়াইয়ের রূপটা তাঁদের জানা আছে। সেকারণে ইউনিয়ন বা পার্টি জমায়েতের ডাক দিলেই তাঁরা রাস্তায় নেমে আসেন।

তবে পিছিয়ে পড়া গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিতে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি জেন জিকে ফেলে রেখেছে এই প্রতিবাদী মূল স্রোতের বাইরে। কারণ এই প্রজন্মের একটা বড় অংশ পড়াশোনা মাঝ পথে ছেড়ে দিয়ে নানান পেশায়, এমনকী  গিগ শ্রমিকের পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েন। সপ্তাহে টানা ৬ দিন তাদের অপরিসীম পরিশ্রম করতে হয়। বাকি একদিন তারা হয় পড়ে পড়ে ঘুমোয়, নয়ত বান্ধবীদের নিয়ে আড্ডা দেয়। তাদের বাস্তব রূঢ় জগৎ থেকে সরিয়ে এনেছে মোবাইল। তারা বাস করে সেই রঙীন জগতে যেখানে সর্বদা তাদের নানা অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা পূরণের স্বপ্ন উস্কে দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু ইউনিয়ন নেই তাই এদের ধারাবাহিক, সংগঠিত লড়াইয়ের সংগঠন বা অভিজ্ঞতা নেই। ফলে দেশের শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্তের বিপুল অংশ যখন বড়সড় রাজনৌতিক লড়াইয়ে নেমে পড়েন, তখন শিক্ষাঙ্গনের বাইরে থাকা বিপুল সংখ্যক আংশিক বা পূর্ণ সময়ের জেন জি কর্মী, তারা এই লড়াই উইংসের ধারে দাঁড়িয়ে দেখে। নয়া উদারবাদী ফিনান্স পুঁজিই পুঁজির হামলার বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত লড়াইয়ে নামার সুযোগ করে না দিয়ে, একটা মোহ ও ভ্রান্তির জগতে আটকে রাখে। এ কাজে পুঁজিবাদের মূল হাতিয়ার হল ডিজিটাল মাধ্যম, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন। 

এখানেই একটা পরিকল্পিত ছেদ ঘটিয়েছে লুলা বাহিনী। 

জেন জির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে এবারই প্রথম দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে বিশাল জমায়েতে নিজের হাতে প্রথমবার স্মার্টফোন তুলে নেন ৮১ বছরের লুলা। তাতে প্রথমবার সেলফি তুলে পোস্টও করেন। এভাবেই তিনি সরাসরি বার্তা দিতে শুরু করেন জেন জি ভোটারদের। 

২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে ২৪ অক্টোবর সাও পাওলোর অ্যভেনিডা পলিস্টাতে লুলার জমায়েতে হাজির হন ২০ লক্ষ মানুষ। জমায়েত থেকেই নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে লুলা শেয়ার করলেন একটা স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিয়ো। তাতে রইল এই বার্তা: 

‘আজকের জমায়েতটা সাও পাওলোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। এর আগে অসংখ্য নির্বাচনী জমায়েতে আমি অংশ নিয়েছি এবং সুষ্ঠু নির্বাচন চালু করার জন্য অনেক লড়াই লড়েছি। তবে আজকের এই জমায়েত আগে কখনও দেখিনি। সাও পাওলোর লোকেরা আজ জানিয়ে দিয়েছে, লুলা, ব্যালট নম্বর ১৩, তিনিই এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতবেন। আসুন, আমরা স্রোতটাকে ঘুরিয়ে দিই।’ এই ক্লিপটা ৯৮ লক্ষ ভিউ পেল। আর এভাবেই ভোটের যুদ্ধে অফলাইন জমায়েতের সঙ্গে জুড়ে গেল অনলাইনের প্রচারযুদ্ধ। 

এই যে অনলাইনে লড়াইটাকে নিয়ে যাওয়া, তার সংগঠন গড়ে তোলার মাথা ছিল ‘লুলা আর্মি’ নামে একটি গ্রুপ। ফেডারাল ডেপুটি আন্দ্রে জানোনেস গড়ে তুলেছিলেন একটা হোয়াটস অ্যাপ চ্যানেল। প্রথম দফা ভোটের সময় এর সদস্য ছিল মোটের ওপর ৫০ হাজার। ২৪ অক্টোবরের জমায়েতের পর ২৫ তারিখ সদস্য সংখ্যা লাফিয়ে হয়ে গেল ১০ লক্ষ ৮৮ হাজার। এই সুযোগে লুলা তাঁর তোলা প্রথম সেলফির নাম দিলেন’ কিং অফ সেলফিস’। সেই সেলফিতে তাঁর চোখে ছিল লাল তারার আবরণ। 

প্রশ্ন হল, লুলার প্লাটফর্মের নীতিগুলো তরুণ ভোটারদের জীবনের দাবির সঙ্গে কী ভাবে মিলে গেল? যারা ডিজিটাল প্রচারে এল সেই সব তরুণ কারা? এবং কোন ন্যারেটিভ ও স্টাইলের কারণে শর্ট ভিডিও তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে ঝড় তুলল? পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্রাজিলের বামপন্থা যার শিকড় রয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে, এবারের ভোটে তারা পরিকল্পিতভাবে একটা প্রজন্মভিত্তিক অবস্থান বদল ঘটিয়েছে। যে তরুণ ভোটাররা এতদিন ছিল নিষ্ক্রিয় সমর্থক, তাদের বদলে দেওয়া হল কনটেন্ট প্রোডিউসারের ভূমিকায়। অনেকে আবার হল ভোট জোটানোর এজেন্ট, কেউ বা হল কমিউনিটি কোঅর্ডিনেটর। এই বার লুলা আর্মি লড়াইটাকে ছড়াতে শুরু করল। তৃণমূল স্তরে রাস্তার বিক্ষোভ সংগঠিত করা ব্রাজিলের বামেদের একটা পুরনো ঐতিহ্য। তার সঙ্গে শুরু হল ডিজিটাল পরিসর দখল করার তীব্র লড়াই। এভাবে দুপায়ে চলার নীতি নিয়ে এল লড়াইয়ের কৌশলে বড়সড় বদল। আর সেই লড়াইয়ে স্মার্টফোন ও সেলফি হয়ে উঠল নতুন রাজনৈতিক পরিকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক হাতিয়ার। 

স্ট্রিটস অ্যান্ড স্ক্রিনস 

দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে লুলার প্রচারের অভিমুখ যেখানে রাখা হল, সেটা এরকম— তৃণমূল স্তরে জমায়েতের যে নেটওয়ার্ক তার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ বার্তার মেলবন্ধন। দায়িত্ব নিলেন ফেডারাল ডেপুটি আন্দ্রে জানোনেস, অ্যানা এলিসা স্যান্টোস এবং পেড্রো রুসেফ। এদের নেতৃত্বে  ওয়ার্কার্স পার্টিই সাধারণ নাগরিকদের তৈরি করা কনটেন্টগুলো নিজেদের মেসেজিং ব্যবস্থায় জুড়ে নিল। ফলে অনলাইন প্রচার আর অফলাইন প্রচারের অধীনস্থ হয়ে রইল না। দুটি প্রচারই হয়ে উঠল দুটি সমান্তরাল ধারা। রাস্তার প্রতিবাদের সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল জিডিটাল প্রচার।

একদিকে সংগঠিত করা হল লক্ষ লক্ষ লোকের প্রতিবাদী সমাবেশ। সেখানে বিশাল বিশাল লাল পতাকার ঢেউ আন্দোলিত হয়ে উঠল। এটা প্রতীকি হয়ে বুঝিয়ে দিলে লক্ষ লক্ষ লোক লাল পতাকার পিছনে রয়েছে। এবং তৃণমূল স্তরে তাদের ভালরকম সমর্থন রয়েছে। অতএব লুলার জয় নিশ্চিত। অন্যদিকে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনলাইনে ডিজিটাল পাবলিক ওপিনিয়ন প্রভাবিত করার কাজ শুরু করা হল। জমায়েতের নতুন নতুন ছবি সম্পাদনা করে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মারফৎ ছড়িয়ে দেওয়া হল ইয়ুথ ইনফ্লুয়েনসারদের মাধ্যমে। এবং এই দুই ধারার মধ্যে তথ্য ও মতামত বিনিময় শুরু হয়ে গেল। 

এবাবেই রাস্তা ও মোবাইলের স্ক্রিন (স্ট্রিটস অ্যান্ড স্ক্রিনস) ডিজিটাল যুগের ব্রাজিলিয় রাজনীতির যুগপৎ দর্পণ হয়ে উঠল। এর আগে ২০২৫ সালে রয়টার্সের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট জানিয়েছিল,খবরের সূত্র হিসাবে ৫৪ শতাংশ ব্রাজিলিয় নির্ভর করেন ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলির ওপর। এর জেরে সোশাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচারের খরচ, যা ২০১৬ সালে ছিল ২৩.২ মিলিয়ন, ২০২৬ সালে তা পৌঁছেছিল ১৬৭.৩ মিলিয়ন ব্রাজিলিয় মুদ্রায়। অর্থাৎ ডিজিটাল স্ক্রিনের ওপর িনয়ন্ত্রণ মানেই হল বৈদ্যুতিন পরিকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ। এবারের ভোটে সেই জগতের ওপর সফল প্রভাব বিস্তার করেছে ব্রাজিলের বামেরা।

তরুণ ভোটারদের দাবি পূরণ

এরপর লুলা তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যুক্ত করলেন জেন জির পেশাগত দাবিগুলি। বড় আকারে প্রচার সংগঠিত করে বার্তা দেওয়া হল যে, বিপুল পরিশ্রমসাধ্য ৬ দিনের সপ্তাহ সংবিধান সংশোধন করে তুলে দেওয়া হবে। তার বদলে চালু হবে পাঁচ দিন কাজের সপ্তাহ। দুদিন রাখা থাকবে বিশ্রামের জন্য। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। এবং সেজন্য মজুরিও কমানো হবে না। এতে উপকৃত হবেন ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ। ১৬ অক্টোবর কংগ্রেস সেই আইন চালুও করে দিল। 

ওয়ার্কার্স পার্টি বলল, এভাবেই জয় ছিনিয়ে এনেছে রাস্তার লড়াই। সার্ভিস সেক্টর, রিটেল সেক্টর এবং ডেলিভারির কাজে যুক্ত লক্ষ লক্ষ কর্মী, ৬ দিনের কাজের বিপুল পরিশ্রমে যাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল, এই আইনে তারা পেলেন বিশ্রাম ও গুণমান সম্পন্ন জীবন। এরপর লুলা ক্ষুদ্র উদ্যোগের ঋণ মকুব করলেন, ইউনিভার্সিটিগুলোর স্কলারশিপ বাড়ালেন, জ্বালানি কর তুলে দিলেন, বোলসা ফ্যামিলিয়া সমাজকল্যাণ মূলক কর্মসূচি খাতে নগদ হস্তান্তর বাড়িয়ে দিলেন। এসবের সঙ্গে এল চাকরির শর্তে নমনীয়তা, কাজের ঘণ্টার বোঝা কমা, জীবনধারণের খরচ কমা, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি। সব মিলিয়ে তৈরি হল জাগতিক সুবিধার একটা কাঠামো যাকে ধরতে ছুঁতে পারা যায়। 

এরই পাশাপাশি ওয়ার্কার্স পার্টি নিয়ে এল যুবমুখী প্রচার, ‘জুভেন্টুডেস কম লুলা’ বা ‘লুলার সঙ্গে যুব’রা। দলের ব্যানারে লেখা হল যুবদের দাবি— চাকরি, গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল ইনক্লুসন। আজকের দিনে যুবরা আর দীর্ঘ নির্বাচনী ইশতেহার পড়তে চায় না। তারা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কিংবা স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও থেকে দরকারি তথ্য জেনে নিতে চায়। ফলে বিমূর্ত বামপন্থী নীতিগুলিকে কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির চেহারায় বদলে দেওয়া হল। এতে লুলাকে ভোট দেওয়া এবং নিজের জীবনের উন্নতি— এদুটি বিষয় সংযুক্ত হয়ে গেল। বস্তুগত স্বার্থ এবং রাজনৈতিক সত্তার স্বার্থকে মিলিয়ে দেওয়া— ব্রাজিলের বামেরা এভাবেই দেশের যুবদের ভাবনায় একটা অর্থবহ বিবর্তন ঘটিয়ে দিলেন। রাষ্ট্রীয় নীতিগুলিকে নামিয়ে আনলেন জনজীবনের স্তরে। 

এর উল্টোদিকে দক্ষিণপন্থী শিবিরও ডিজিটাল যুদ্ধে নেমে পড়েছিল। তবে তাদের অ্যাজেন্ডা ছিল করছাড়, গিগ অর্থনীতিতে কাজের ঘণ্টা বাড়ানো, কড়া সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লিঙ্গভিত্তিক স্কুলশিক্ষা উঠিয়ে দেওয়া ও ব্যক্তিগত সাফল্যের রাস্তা পরিষ্কার করা। তারা বলল, প্রতিটি তরুণ হতে পারে ইলন মাস্ক (ঠিক যেমন মোদি বলেন বিলিওনিয়ার তৈরির কথা)। তারা বলল, চুক্তিভিত্তিক চাকরির কথা, বলল ন্যূনতম বেতন কমানোর কথা। বিপুল পরিমাণে ধনীদের ওপর বাড়তি কর বসানো নিয়ে লুলার প্রস্তাব খারিজ করে দিল তারা। বলল, সরকারি খরচ কমানো হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হবে। ভোটারদের কাছে বাম ও দক্ষিণপন্থীদের প্রতিশ্রতির ফারাকটা স্পষ্ট হল। তবে ডিজিটাল মাধ্যমকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারলে এটা হত না। 

শ্লোগানের ধরনও বদলে ফেলল বামেরা। বিমূর্ত দাবির বদলে উঠে এল মূর্ত দাবি। আমরা কি বিশ্রাম পাব? আমি সামাজিক নিরাপত্তার প্যাকজে পাব? উচ্চশিক্ষার খরচ কি জোটাতে পারব? প্রশ্নের আকারে স্লোগানগুলো জনপ্রিয় করে তোলা হল। এর ফলে বামেদের রাজনীতির সমর্থক মাত্র না থেকে যুবরা নিজেদের জীবনের ভবিষ্যতের সঙ্গে বামেদের যোগসূত্র গড়ে তোলার পথ পেল। অথচ আগে কাজের বোঝার কারণে বিপুল ক্লান্তির জন্য তারা বামেদের মিছিলে আসতেই চাইত না। বামেদের প্রথাগত প্রচার পদ্ধতিও তাদের টানত না। 

সবটাই ঘুরিয়ে দিল ডিজিটাল সংযোগ গড়ে তোলার রাজনীতি। ফেডারাল ডেপুটি অ্যানা এলিসা স্যান্টোস বললেন, ‘যারা বলেছিল ইন্টারনেটের নির্বাচনী ভার বলে কিছু নেই, তাদের ভুল প্রমাণিত করে দিয়েছি আমরা। অনলাইন পরিসরও যে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করতে পারে তাও আমরা প্রমাণ করে দিলাম।’ পুরনো ধরনের প্রচার সম্পর্কে লোকের যে একঘেয়েমি, সেটাই লুলার প্রচারের ধরনকে বদলে দিতে বাধ্য করল। যদি এটা করা না যেত তাহলে বিশাল সংখ্যক যুবদের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে যেত বামেরা। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নীতিগুলিকে তুলে আনা, এবং যুবমুখী মিডিয়া কৌশল, একটা প্রজন্মের ভাবনা বদল করার জন্য দুটো হাতিয়ারকে যে যুগপৎ ব্যবহার করতে হবে, সেটাই দেখিয়েছে লুলার এবারের ভোটপ্রচার। 

ডিজিটাল প্রচারে যুবরা

লুলার পক্ষে ডিজিটাল প্রচারের দািয়ত্ব নিয়েছিলেন একদল বামপন্থী রাজনীতিক। তাঁরা কাজে লাগিয়েছেন সোশাল মিডিয়ার বাস্তুতন্ত্রকে। শুধু মিছিলের স্লোগানে আটকে না থেকে তাঁরা তৈরি করেন উচ্চস্তরের প্রচার পরিকল্পনার সার্কিট। এবং যুবদের সঙ্গে সোশাল মিডিয়া মারফৎ কীভাবে সংযোগ গড়ে তুলতে হবে সেটাও তাঁরা বোঝান লুলাকে।

ফেডারাল ডেপুটি অ্যানা এলিসা স্যান্টোসের কথাই ধরা যাক। তিনি ২১ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। থাকেন মিনাস গেরাইস প্রদেশের ডিভিনোপোলিস এলাকায়। তাঁর মা সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। অ্যানা নিজে আইনের ছাত্রী। লুলার আমলের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ৫ লক্ষ ২৪ হাজার ২১৬ ভোটে জিতে তিনি ডেপুটি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৪ সাল থেকে ধরলে তিনিই ব্রাজিলের সবচেয়ে কম বয়সী ডেপুটি। এবং সারা দেশে ওয়ার্কার্স পার্টির হয়ে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। তাঁর ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারের সংখ্যা ৫৪ লক্ষ। তিনি ভিস্টা পলিটিকস (পলিটিক্যাল অ্যাটায়ার) নামে একটি ব্র্যান্ড চালান। সেখানে রাজনৈতিক থিমের সাহায্যে তৈরি পোশাক পাওয়া যায়। 

বলসোনারোবাদের সমালোচনার মধ্যে দিয়ে সামনে আসেন অ্যানা। তাঁর কথায়, ‘আমি রাজনীতি শুরু করেছি মায়ের শোবার ঘর থেকে এবং আমার একমাত্র হাতিয়ার ছিল স্মার্টফোন।‘ সোশাল মিডিয়ায় প্রচার কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য তাঁকে ব্রাসিলিয়া শহরে ডেকে পাঠালেন লুলা। সেখানে যোগ দেন অন্য ইনফ্লুয়েন্সাররাও যারা পরে রাজনীতিতে এসেছেন। অ্যানা জোর দিয়ে যে কথাটা বলেন, রাস্তায় বাঁধা যে মঞ্চ বা হলের ভিতরের পোডিয়াম, তার জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল স্ক্রিন। এবং নতুন রাজনৈতিক অনুশীলনের সূচনাবিন্দু হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। অ্যানার মতোই আরেক ডেপুটি আন্দ্রে জানোনেস। বয়স ৪২। জিতেছেন ৭৮,৭৮০ ভোটে। তিনিই ‘লুলা আর্মি’ নামে হোয়াটস গ্রুপ চালু করেন। দ্বিতীয় দফার ভোট পর্বে তিনি যুবদের উপযোগী করে সোশাল মিডিয়ায় প্রচার চালিয়েছেন। তাঁর ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারের সংখ্যা ৬৭ লক্ষ। সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন লুলা, এমন লক্ষ লক্ষ ছবি সাধারণ স্মার্টফোনেও ছড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁরই উদ্যোগে। এটাই শেষ পর্যন্ত অনেকদূর পর্যন্ত লুলার বার্তা পৌঁছে দেয়। 

তৃতীয় জন হলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের নাতি, ২৬ বছরের পেড্রো রুসেফ। তিনি জিতেছিলেন মিনাস গেরাইস প্রদেশ থেকে। লুলার দ্বিতীয় দফার প্রচারে তিনিই ছিল যুবমুখী ডিজিটাল প্রচারের কেন্দ্রে। এছাড়া সোশালিজম অ্যান্ড লিবার্টি পার্টির ৪৫ বছরের ডুডা সালাবার্ট ব্রাজিলের অন্যতম সুপরিচিত ট্রান্সজেন্ডার ডেপুটি। তিনিও যুবমুখী ডিজিটাল প্রচারে অংশ নেন। এর পাশাপাশি ডেবোরা বালডিন, সাব্রিনা ফার্নান্ডেজ এবং গ্যাব্রিয়েল নাসশিমেন্টো সহ একগুচ্ছ বামপন্থী কর্মী এবং কমিউনিকেটর গড়ে তোলেন ‘ফ্লিপ দ্য ভোট ব্রাজিল’ উদ্যোগ। এঁরা টেলিগ্রাম চ্যানলের মাধ্যমে জড়ো করেছিলেন হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী যারা জনে জনে ভোটারদের কাছে গিয়ে কথা বলেন। বিয়ন্সে, অ্যানিটা, টেলর সুইফট, বিটিএস, ব্ল্যাকপিঙ্ক এবং লেডি গাগার ফ্যান কমিউনিটি তাদের মঞ্চ থেকে লুলার হয়ে প্রচার করেন। তাদের নজরে ছিল তরুণ ও অনুপস্থিত ভোটাররা। এভাবেই অসংখ্য সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী গড়ে তুলেছেন লুলার ভোটপ্রচারের ডিজিটাল পরিকাঠামো। এভাবে যুব শক্তি দুটি লক্ষ্য পূরণ করে। লুলার জয়ের জন্য শক্তিশালী ভোট ইঞ্জিন হিসাবে কাজ করে। এবং হয়ে ওঠে ব্রাজিলের শক্তিশালী বাম আন্দোলনের পরবর্তী প্রজন্ম। 

ঋণ: mronline.org, ব্লুমবার্গ নিউজ। 

(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল) 


প্রকাশের তারিখ: ০৪-নভেম্বর-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আন্তর্জাতিক বিভাগে প্রকাশিত ৮২ টি নিবন্ধ
০৪-নভেম্বর-২০২৬

৩০-অক্টোবর-২০২৬

২৯-অক্টোবর-২০২৬

২৯-অক্টোবর-২০২৬

২৬-অক্টোবর-২০২৬

২৩-অক্টোবর-২০২৬

০৫-অক্টোবর-২০২৬

২৩-সেপ্টেম্বর-২০২৬

২০-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০১-সেপ্টেম্বর-২০২৬