সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
উচ্ছেদের ব্যাকরণ, প্রতিরোধের ব্যাকরণ
অঞ্জন মুখোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের রুক্মিণী হয়তো আরাকানে গেছে, খসরুবাগে গেছে। কিন্তু সে মরে যায়নি। তার ঠিকানা মুছে ফেলা হয়েছে বারবার। কিন্তু প্রতিবারই সে নতুন ঠিকানা তৈরি করেছে। আজকের উচ্ছেদ-উৎপীড়িত মানুষরাও তেমনি ঠিকানা বানাচ্ছেন; পাটিয়ালা হাউসের সামনে, রামলীলা ময়দানে, রেল লাইনের ধারে, বস্তির আঙিনায়।... উচ্ছেদের ব্যাকরণ একমাত্র বাতিল হয় প্রতিরোধের ব্যাকরণ দিয়ে। আর সেই প্রতিরোধের প্রথম পাতায় লেখা থাকে; ঠিকানা হারানো মানুষের ঠিকানা ফেরার ইতিহাস।

শুধাই আমি, ‘কোথায় পাব তাকে।’
ইস্টেশনের বড়োবাবু রেগে বলেন, ‘সে খবর কে রাখে।’
টিকিটবাবু বললে হেসে, ‘তারা মাসেক আগে
গেছে চলে দার্জিলিঙে কিংবা খসরুবাগে,
কিংবা আরাকানে।’
শুধাই যত, ‘ঠিকানা তার কেউ কি জানে।’—
তারা কেবল বিরক্ত হয়, তার ঠিকানায় কার কাছে কোন্ কাজ।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফাঁকি*
রবীন্দ্রনাথের এই কবিতায় একটি চরিত্র— রুক্মিণী। ঝামরু কুলির বৌ। কবিতায় সে খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু যেটুকু বলে তাতেই একটা যুগের সব কথা বলা হয়ে যায়।
সাত বিঘে ওর জমি ছিল কোন্-এক গাঁয়ে কী-এক নদীর ধারে
এই এক পঙক্তিতে একটি মানুষের পুরো জীবন। জমি ছিল— অর্থাৎ, এখন আর নেই। সাত বিঘে— ছোট, কিন্তু নিজের। কোনও এক গাঁয়ে, কোনও এক নদীর ধারে— সেই জায়গার নামটুকুও হয়তো মনে নেই আর। কারণ ভুলে যেতে বাধ্য হলে মানুষ ভুলে যায়।
তের শো কোন সনে আকাল হয়েছিল। জমিদার অত্যাচার করেছিল। স্বামী-স্ত্রী পালিয়ে এসেছিল। এসে পড়েছিল রেলের কুলির জীবনে। আর তারপর, একদিন, সেই স্বামীও চলে গেছে কোথাও। কোথায় গেছে? ইস্টিশনের বড়বাবু রেগে বলেন—
সে খবর কে রাখে।
... তার ঠিকানায় কার কাছে কোন্ কাজ।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফাঁকি
এই রাগটা লক্ষ্য করুন। বড়বাবু শুধু ব্যস্ত নন— তিনি বিরক্ত। একজন কুলির বৌয়ের স্বামীর খোঁজ করা তাঁর কাছে অপ্রাসঙ্গিক, প্রায় অসভ্যতা। এই রাগই শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সবচেয়ে সৎ প্রকাশ— কোনও মুখোশ নেই, কোনও লজ্জা নেই।
স্বাধীনতার সাতাত্তর বছর পর সেই রুক্মিণীর উত্তরসূরিরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন? এই প্রশ্ন নিয়েই এই লেখা।
এক: উচ্ছেদের দীর্ঘ ইতিহাস
শুরু কোথায়?
শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাস আসলে উচ্ছেদের ইতিহাস। কিন্তু এই কথাটা বললেই প্রশ্ন ওঠে— শুরু কোথায়? কোথা থেকে গণনা করব?
প্রাগৈতিহাসিক সমাজে ভূমি ছিল সামাজিক সম্পদ— গোষ্ঠীর, সকলের। রাষ্ট্রের উদ্ভব মানেই এই সম্পদকে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বা রাজকীয় মালিকানায় নিয়ে যাওয়া। মেসোপটেমিয়া থেকে সিন্ধু উপত্যকা— প্রথম সভ্যতাগুলির জন্মের সাথেই জমির উপর রাজকীয় অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, স্বাধীন কৃষক পরিণত হয়েছে করদাতায়, তারপর প্রজায়, তারপর ভূমিদাসে।
ভারতে এই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে স্পষ্ট সাক্ষী আদিবাসী সমাজ। হাজার বছর ধরে অরণ্যের সাথে যাদের সম্পর্ক ছিল— জীবিকার নয়, অস্তিত্বের। অরণ্য তাদের কাছে মাটি, মা, পরিচয়। সেই সম্পর্কে প্রথম আঘাত এসেছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে, তারপর গুপ্ত যুগে, তারপর সামন্ততন্ত্রে— আর চূড়ান্ত আঘাত এনেছিল ব্রিটিশ বন আইন, যা আদিবাসীর অরণ্যকে রাতারাতি ‘সরকারি সম্পত্তি’ বানিয়ে দিয়েছিল।
মার্কসের সতর্কবার্তা
মার্কস পুঁজি-র প্রথম খণ্ডে এই প্রক্রিয়াটিকে চিহ্নিত করেছিলেন আদিম সঞ্চয়ন নামে। ইংল্যান্ডে এনক্লোজার মুভমেন্টের মাধ্যমে কৃষকের সামাজিক ভূমিঅধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে কারখানার মজুরে পরিণত করা হয়েছিল। মার্কস সতর্ক করে বলেছিলেন— এটা কোনও একবারের ঘটনা নয়। পুঁজিবাদের এটি একটি স্থায়ী প্রবণতা, বারবার ফিরে আসে, নতুন রূপে।
এই সতর্কবার্তার সত্যতা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই।
ঔপনিবেশিক উচ্ছেদ: সভ্যতার নামে লুণ্ঠন
ভারতে ব্রিটিশ রেল যখন পাতা হচ্ছিল, তখন একটা গল্প বলা হচ্ছিল— ভারত ‘আধুনিক’ হচ্ছে, ‘উন্নয়ন’ হচ্ছে। রেল ভারতকে এক করবে, বাণিজ্য বাড়াবে, মানুষের জীবন সহজ করবে।
কিন্তু রেলের প্রকৃত কাজ ছিল ভারতের কাঁচামাল দ্রুত বন্দরে পৌঁছে দেওয়া এবং ব্রিটিশ পণ্যের বাজার ছড়িয়ে দেওয়া। আর সেই রেল বানাতে যে শ্রমশক্তি লেগেছিল, তা এল কোথা থেকে? ঠিক সেই জায়গা থেকেই— আকাল, খাজনা, জমিদারি অত্যাচার। ভূমিহীন মানুষ কুলি হয়। এটাই পুঁজির যুক্তি।
রুক্মিণী তাই নিছক একটি চরিত্র নয়। তেরো-শো কোন সনে দেশে ওদের আকাল হল— এই আকাল ব্রিটিশ রাজস্বনীতির ফল। পালিয়ে এল জমিদারের অত্যাচারে— এই জমিদারি ঔপনিবেশিক ভূমিব্যবস্থার তৈরি। রুক্মিণীর জীবন একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মানবিক মুখ।
স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব
১৯৪৭-এ স্বাধীনতা এল। সংবিধানে ভূমি সংস্কার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, শ্রমিকের অধিকার— এই প্রতিশ্রুতিগুলো লেখা হল। কিন্তু নেহরুবাদী উন্নয়ন মডেলও উচ্ছেদের যুক্তি থেকে বেরোতে পারেনি।
বৃহৎ বাঁধ, ইস্পাত কারখানা, ভারী শিল্প— নেহরু যাকে ‘আধুনিক ভারতের মন্দির’ বলেছিলেন, সেই মন্দির নির্মাণে কোটি কোটি আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষ উচ্ছেদ হয়েছেন। পার্থক্য শুধু এইটুকু: ঔপনিবেশিক আমলে উচ্ছেদের ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছিল ‘সভ্যতা’ দিয়ে, স্বাধীন ভারতে দেওয়া হল ‘জাতীয় উন্নয়ন’ দিয়ে।
মতাদর্শের পোশাক বদলেছে। উচ্ছেদের যুক্তি বদলায়নি।
দুই: নয়া উদারবাদ— উচ্ছেদের পরিণত রূপ
১৯৯১ সালের পর যে অর্থনীতি শুরু হল, তাকে বলা হয় ‘সংস্কার’। উন্নয়নের ঢাক পিটিয়ে। কিন্তু এই ‘সংস্কার’ আসলে উচ্ছেদের ইতিহাসের একটি নতুন, অনেক বেশি পরিশীলিত অধ্যায়।
আগের উচ্ছেদ ছিল দৃশ্যমান — জমি কেড়ে নেওয়া, মানুষ তাড়ানো। নয়া উদারবাদী উচ্ছেদ আরও সূক্ষ্ম, আরও বহুস্তরীয়। কয়েকটি পথে এটা কাজ করে।
আইনি কাঠামোর মাধ্যমে: এসইজেড আইন (২০০৫), ভূমি অধিগ্রহণ আইনের সংশোধনী, বন সংরক্ষণ আইনের পরিবর্তন। সংসদে পাস হওয়া আইন, তাই আদালতে যাওয়াও কঠিন।
ঋণের মাধ্যমে: সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি কিনতে ঋণ নেওয়া, ফসলের দাম পড়ে যাওয়া, সুদের বোঝা— শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রি, বা আত্মহত্যা। ১৯৯৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তিন লক্ষ আশি হাজারের বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এই সংখ্যাটা লেখার সময় আমি একটু থামি। এটা শুধু পরিসংখ্যান নয়।
প্রযুক্তির মাধ্যমে: বায়োমেট্রিক পরিচয়, আধার সংযোগ, ডিজিটাল রেশনব্যবস্থা। এই প্রযুক্তি যখন ব্যর্থ হয়, বা যখন ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জন করা হয়, তখন যারা বাদ পড়েন তারা রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য হয়ে যান। অধিকার দাবির জায়গাটুকুই বিলুপ্ত হয়।
বেসরকারিকরণের মাধ্যমে: ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৪.৮৬ লক্ষ কোটি টাকার রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বিক্রি হয়েছে। রেল, বন্দর, রাস্তা ঠিকাদারদের হাতে। আর সংরক্ষিত চাকরির সুযোগ শেষ হওয়ায় দলিত ও আদিবাসীদের কাছে রাষ্ট্রীয় কর্মসংস্থানের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
গিগ ইকোনমির মাধ্যমে: ওলা, উবার, জোমাটো, সুইগির চালক ও ডেলিভারি কর্মীরা আইনের চোখে না শ্রমিক, না কর্মচারী— তারা ‘স্বাধীন ঠিকাদার’। এই পরিচয়টি তাদের ন্যূনতম মজুরি, পিএফ, ছুটি, সংগঠিত হওয়ার অধিকার— সব কিছু থেকে বঞ্চিত রাখে। অ্যালগরিদম ঠিক করে কাকে কাজ দেওয়া হবে, কার রেটিং কমানো হবে। নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ, দায়বদ্ধতা শূন্য।
কার উচ্ছেদ?
উচ্ছেদের ভার সমানভাবে পড়ে না। দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৮ শতাংশ আদিবাসী, কিন্তু উন্নয়নের নামে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে তাঁরা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। এটা দুর্ঘটনা নয়— এটা কাঠামোগত।
দলিতদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জাতীয় ভূমিমালিকানায় দলিতদের অংশ মাত্র ২.২ শতাংশ, জাতীয় গড় ১৭.৯ শতাংশ। শ্রমশক্তির ৯৩ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আটকে। এসইজেড-এর কারণে বিতাড়িত দুই কোটির বেশি মানুষের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আদিবাসী ও দলিত।
এখানেই আম্বেদকরের কথা মনে করা দরকার। অ্যানহিলেশন অব কাস্ট-এ তিনি দেখিয়েছেন, জাতপাত-প্রথা শুধু ধর্মীয় নয়— এটা উৎপাদন-সম্পর্কের ব্যবস্থা। উচ্চবর্ণ ভূমির মালিক, দলিত চিরকালীন শ্রমিক। স্টেটস অ্যান্ড মাইনরিটিস-এ তিনি লিখেছেন, ভূমি সংস্কার ছাড়া জাতপাত থকে মুক্তি অসম্ভব— কারণ জাতপাত-প্রথা ভূমির একচেটিয়া মালিকানাকে স্থায়ী করে। আর জাতপাত-প্রথা ধ্বংস ছাড়া ভূমি সংস্কারও অসম্ভব— কারণ উচ্চজাতই তার প্রধান প্রতিরোধী।
নয়া উদারবাদ এই দুটো বৃত্তকে আরও শক্ত করেছে। এসইজেড-এর মতো প্রক্রিয়ায় ভূমিহীনতা দলিতদের জাতপাতভিত্তিক শোষণের কাঠামোগত রূপ হয়ে ওঠে। আম্বেদকর যে দুষ্টচক্রের কথা বলেছিলেন, তা আরও শক্ত হয়েছে।
লিঙ্গের মাত্রা
এই উচ্ছেদের একটি লিঙ্গগত মাত্রা আছে যেটা প্রায়ই বলা হয় না। জমি থেকে উচ্ছেদ হলে পুরুষ প্রায়ই শহরে পাড়ি দেয়। নারী গ্রামে থাকে— সেচহীন জমি চাষ করতে, পরিবার ধরে রাখতে, বৃদ্ধ ও শিশুদের দেখতে। দলিত ও আদিবাসী নারীর ক্ষেত্রে বোঝাটা আরও জটিল— জাতপাত, শ্রেণি আর লিঙ্গের তিনটি চাপ একসাথে। রেলের নারীশ্রমিকরা শুধুমাত্র টয়লেট ও বাথরুমের অভাবে কিডনির রোগে ভোগেন— এটা প্রশাসনিক অবহেলা নয়, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর একটি নির্দিষ্ট উপাদান।
রেল ও শ্রম কোড
ভারতীয় রেল এই দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি নিয়োগকর্তাদের একটি। কিন্তু রেলের কাঠামোটি ঔপনিবেশিক কাল থেকেই শ্রেণিভেদে বিভক্ত— উপরে বাবু, নিচে কুলি। বিজেপি সরকার ২৯টি শ্রম আইন বাতিল করে চারটি শ্রম কোড চালু করেছে। এই কোডে দু’টি শব্দ আইনের ভাষা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে— ‘শ্রমিক’ এবং ‘মজুরি’।
এই মোছাটুকু পরিভাষাগত নয়। ‘শ্রমিক’ ও ‘মজুরি’ শব্দ মানতে গেলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের একটি গোটা কাঠামো মানতে হয়। সেই বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পেতেই শ্রমিককে ‘ঠিকা কর্মচারী’ বানানো হয়েছে।
মাসিক ২৬ দিনের দৈনিক মজুরিভিত্তিক চুক্তি। একদিন ধর্মঘট করলে আটদিনের মজুরি কাটা। এগুলো আসলে প্রতিরোধের অধিকার বিলোপের আইনি রূপ। স্থায়ী পদ অবলুপ্ত করে রেলকে ঠিকাদারদের হাতে তুলে দেওয়া মানে উচ্ছেদের একটি নতুন পর্যায়— জমি থেকে নয়, অধিকার থেকে, আইনি সুরক্ষা থেকে, সংগঠিত প্রতিরোধের সম্ভাবনা থেকে।
তিন: হিন্দুত্ব প্রকল্প — উচ্ছেদের রাজনৈতিক আড়াল
একটা প্রশ্ন মাঝে মাঝে ওঠে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি আর হিন্দুত্ব রাজনীতি কি পরস্পর-বিরোধী? একটা বাজারের যুক্তিতে চলে, অন্যটা ধর্মীয় পরিচয়ের যুক্তিতে। এরা একসাথে কীভাবে চলতে পারে?
উত্তরটা আসলে সহজ। নয়া উদারবাদ যখন কোটি কোটি মানুষকে জমি, জীবিকা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখন সেই বঞ্চনার ক্রোধটাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। একটি ‘অপরের’ দরকার— যেন রাগটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে না গিয়ে সেই ‘অপরের’ উপর পড়ে। হিন্দুত্ব প্রকল্প এই কাজটাই করে। শ্রমিক কোডের মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, আর তারপর বলা হয় ‘তোমার শত্রু ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সংরক্ষণ, পুঁজিপতি নয়।‘
শ্রম কোড আর সিএএ-এনআরসি তাই একই সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচির দু’টি মুখ। একদিকে দলিত-কৃষক-শ্রমিককে নিরাপত্তাহীন করা, অন্যদিকে নাগরিককে পরিচয়হীন করা। একদিকে রেল ঠিকাদারের হাতে, অন্যদিকে ডিটেনশন ক্যাম্পের হুমকি। কর্পোরেট লাভের জন্য এসইজেড এবং ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে কর্পোরেটগুলোকে সুবিধা দেওয়া হয়; সেই কর্পোরেটগুলো হিন্দুত্ব প্রচার ফান্ড করে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
গ্রামশি এই কৌশলকে বলেছিলেন ‘নিষ্ক্রিয় বিপ্লব’— যেখানে জাতীয়তাবাদের আড়ালে, কোনও প্রকৃত পরিবর্তন ছাড়াই, পুঁজি তার সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখে এবং শ্রিণীক্রোধ ধর্মীয় বা জাতপাতের বৈরিতায় দ্রবীভূত হয়। হিটলার থেকে ট্রাম্প থেকে মোদি এই ধারাটি কোনও আদর্শিক মিলের নয়, কাঠামোগত মিলের।
চার: উন্নয়নের লুকানো যুক্তি
উচ্ছেদের ইতিহাস লেখা হয়নি, কারণ যারা ইতিহাস লেখেন, তারা উচ্ছেদ হন না। তারা উচ্ছেদ করেন। ফলে যা লেখা হয়েছে তা বিজয়ীর আখ্যান।
কিন্তু বিতাড়িতের দেহে যে ক্ষত থাকে, উৎপাদনের সম্পর্কে যে বিরোধ থাকে— সেগুলো নিজেই ইতিহাসের ভাষায় কথা বলে। সেই ভাষা পড়তে পারলে দেখা যায়, প্রাচীন শ্রেণিবিভক্ত সমাজ থেকে আজকের নয়া উদারবাদ পর্যন্ত একটি অবিচ্ছিন্ন যুক্তিসূত্র প্রবাহিত হচ্ছে।
সেই লুকানো যুক্তিটি হল: যে মানুষেরা জমি-অরণ্য-জল-হাতিয়ারের সাথে জৈব সম্পর্কে বাঁচেন, তাদের সেই সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে— কারণ সেই বিচ্ছিন্নতাই পুঁজির সঞ্চয়ের পূর্বশর্ত।
কিন্তু এই বিচ্ছিন্নকরণ কখনও নিজের নামে আসে না। সে আসে ‘প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ’-এর নামে, ‘সভ্যতা’র নামে, ‘জাতীয় উন্নয়ন’-এর নামে, ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র নামে।
প্রতিটি যুগে পোশাক বদলায়, যুক্তি বদলায় না।
ইস্টিশনের বড়বাবু রেগে বলেন, সে খবর কে রাখে। এই রাগটুকুর মধ্যেই উন্নয়নের সত্যিকারের দর্শন লুকিয়ে। রুক্মিণীর ঠিকানা জানার দরকার নেই, কারণ সে প্রক্রিয়ার একটি ক্ষণস্থায়ী উপাদান— ব্যবহার হয়ে গেলে পরিসংখ্যান থেকেও মুছে ফেলা যায়।
নয়া উদারবাদী ভারতে এই মুছে ফেলা সম্পূর্ণতা পেয়েছে। ২৯টি শ্রম আইন বাতিল মানে শ্রমিকের আইনি অস্তিত্ব মোছা। ‘শ্রমিক’ ও ‘মজুরি’ শব্দ বাদ দেওয়া মানে ভাষা থেকে মোছা। বায়োমেট্রিক বর্জন মানে ডেটাবেস থেকে মোছা। ডিটেনশন ক্যাম্প মানে ভূগোল থেকেও মোছা।
উচ্ছেদের যুগ-ভিত্তিক রূপ— ছদ্মবেশ থেকে প্রক্রিয়া


সারণিটি লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও নিবন্ধে উল্লিখিত সূত্রগুলির (এনসিআরবি, ইকনমিক সার্ভে, আইএলও, গণমাধ্যম প্রতিবেদন) সহায়তায় প্রস্তুত। ২০১৪-পরবর্তী উচ্ছেদের উগ্রতা ও প্রতিরোধের বিস্তার টেবিলের বিশেষ দিক।
শেষ দুটি সারি তুলনা করলে স্পষ্ট— উচ্ছেদের পরিমাণ ও তীব্রতা ২০১৪-পরবর্তী সময়ে বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু প্রতিরোধও ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় হয়েছে— কৃষক থেকে গিগ শ্রমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।
পাঁচ: প্রতিরোধের ব্যাকরণ
উচ্ছেদের এই দীর্ঘ ইতিহাসে কি কোনও ফাঁক নেই? উচ্ছেদ কি সবসময়ই একমুখী?
না। ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে উচ্ছেদের সাথেই প্রতিরোধ জন্ম নিয়েছে। ইংল্যান্ডে এনক্লোজারের বিরুদ্ধে ডিগাররা জমি দখল করেছিল। ভারতে ঔপনিবেশিক বন আইনের বিরুদ্ধে সাঁওতাল, মুন্ডা, ভিল, গোল্ড, ওরাওঁ বিদ্রোহ করেছিলেন। নেহরুবাদী উন্নয়নের বিরুদ্ধে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন আজও প্রতিরোধের এক মাইলফলক।
আর ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলন— পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে কোটি কোটি কৃষক তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির সীমান্তে তিনশোরও বেশি দিন অবস্থান করেছিলেন, এবং শেষ পর্যন্ত আইন প্রত্যাহারে বাধ্য করিয়েছিলেন— এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে, নয়া উদারবাদী উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ সম্ভব।
কিন্তু এই বিজয় আংশিক। কৃষকের জমির অধিকার ফেরেনি। গিগ শ্রমিকের স্বীকৃতি আসেনি। আদিবাসীর অরণ্য-অধিকার সুরক্ষিত হয়নি। প্রতিরোধের শিকড় আছে, কিন্তু সামগ্রিক ব্যাকরণ এখনও নির্মীয়মাণ।
বিচ্ছিন্ন, আঞ্চলিক, খণ্ডিত প্রতিরোধ উচ্ছেদের বৈশ্বিক যুক্তিকে বদলাতে পারে না। যতক্ষণ না জমি হারানো কৃষক, চাকরি হারানো শ্রমিক, পরিচয় হারানো নাগরিক, আর ঠিকানা হারানো রুক্মিণী— একসাথে দাঁড়াতে শেখেন, ততক্ষণ উচ্ছেদের যন্ত্রটি প্রতিরোধকে গ্রাস করতে থাকবে।
প্রতিরোধের ব্যাকরণের কেন্দ্রে আছে তিনটি কাজ। উচ্ছেদকে তার নিজের নামে চিহ্নিত করা ‘উন্নয়ন’ বা ‘সভ্যতা’ বা ‘প্রগতি’-র ছদ্মবেশ বেআব্রু করা। বিভিন্ন উচ্ছেদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা— আদিবাসীর জমি-উচ্ছেদ, দলিতের ভূমিহীনতা, শ্রমিকের অধিকার-উচ্ছেদ, নাগরিকের পরিচয়-উচ্ছেদ— এগুলো আলাদা ঘটনা নয়, একই ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক। আর প্রতিরোধকে স্থানিক ও সাময়িক সীমার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া— তাকে একটি আন্তঃ-জাতিক, আন্তঃ-শ্রেণির প্রকল্পে পরিণত করা।
উপসংহার: রুক্মিণীর ঠিকানা
রবীন্দ্রনাথের রুক্মিণী হয়তো আরাকানে গেছে, খসরুবাগে গেছে। কিন্তু সে মরে যায়নি। তার ঠিকানা মুছে ফেলা হয়েছে বারবার। কিন্তু প্রতিবারই সে নতুন ঠিকানা তৈরি করেছে।
আজকের উচ্ছেদ-উৎপীড়িত মানুষরাও তেমনি ঠিকানা বানাচ্ছেন— পাটিয়ালা হাউসের সামনে, রামলীলা ময়দানে, রেল লাইনের ধারে, বস্তির আঙিনায়। এই ঠিকানাগুলো আজ স্বীকৃত নয়। কিন্তু উচ্ছেদের ইতিহাসের চূড়ান্ত অধ্যায়টি কে লেখেন— সেটি কখনও উচ্ছেদকারীরা নির্ধারণ করেন না।
উচ্ছেদের ব্যাকরণ একমাত্র বাতিল হয় প্রতিরোধের ব্যাকরণ দিয়ে। আর সেই প্রতিরোধের প্রথম পাতায় লেখা থাকে— ঠিকানা হারানো মানুষের ঠিকানা ফেরার ইতিহাস।
ঋণ: এই লেখাটির বীজ বপন হয়েছিল সঞ্চিতা সান্যালের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে।
— মতামত লেখকের নিজস্ব
প্রকাশের তারিখ: ০৪-জুন-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
