সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
পরিবেশবাদ ও বামপন্থা (পঞ্চম পর্ব)
অর্চনা প্রসাদ
গুরুতর ব্যাপারটি হল যে এই পরিবারগুলিকে তাদের সম্মতি ছাড়াই স্থানান্তরিত করা হয় এবং এঁদের দুর্দশা থেকে বোঝা যায় পুনর্বাসনের শর্তপূরণের নামে সরকার তাদেরকে কার্যত আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে। আদিবাসীদের মধ্যে যারা ভূমিহীন তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় নি এবং জঙ্গল, কুয়ো, গোচারণ ভূমির মত সাধারণ ব্যবহারের জমি যা তাদের জীবন জীবিকার মূল উৎস, তার প্রবেশযোগ্যতা বা অধিকারের কথা বিবেচনাই করা হয় নি। পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিষয়ের মত প্রাথমিক সুযোগ-সুবিধার কোনো উল্লেখই নেই। এনবিএ আদালতে আবেদন ও প্রতিবেদন পেশ করে জানায় যে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের তৈরি করে দেওয়া শর্তাবলীকে লঙ্ঘন করে।

পঞ্চম পর্ব
উন্নয়ন ও উচ্ছেদের রাজনীতি
সর্দার সরোবর প্রকল্প পুনরারম্ভের নির্দেশ দান করে ২০০০ সালের ১৮ অক্টোবরের উচ্চতম ন্যায়ালয়ের রায় নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনকে (এনবিএ) আবার রাজনৈতিক আলোচনার আলোর কেন্দ্রে নিয়ে আসে। নর্মদা নদীতে বাঁধ তৈরির বিরোধিতায় গড়ে ওঠা আন্দোলন প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত হয়েছে এবং এই লড়াই 'গরিবের পরিবেশবাদ' আন্দোলনকারীদের আদর্শগত অবস্থানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে যাদের গতিশীল নেত্রী মেধা পাটকর উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রভাবশালী বিদ্যমান ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিমূর্তি হিসেবে প্রতিভাত হয়েছেন। 'এ ধরনের প্রকল্পের নৈতিকতা ও কাম্যতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে এনবিএ আধুনিকতা ও আধুনিক উন্নয়নের ধ্যানধারণার দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতার সওয়াল করে এনবিএ এই অবস্থান থেকে যে, উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন হচ্ছে 'আধুনিক উন্নয়নের' অবিচ্ছেদ্য অংশ যা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দুটি দিক থেকেই কার্যকরিতাবিহীন। তারা বিশ্বাস করে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কোনো জনস্বার্থবাহী সমাধান দেয় না এবং দিতে পারেও না। কাজেই একটি ভিন্ন পদ্ধতির উন্নয়ন ভাবনা জরুরি, যে আঙ্গিক বাঁচার সীমিত উপকরণ ও ভাবনার উচ্চ নৈতিকতার উপর ভিত্তি করবে, যে পদ্ধতি বিশ্বাস করবে 'ক্ষুদ্রতরই সুন্দরতর' এবং জোরালোভাবে বিরুদ্ধাচারণ করে 'বৃহৎ'-এর যা উন্নয়নের কার্যকরিতাবিহীন ও অভিজাত ধ্যানধারণার নামান্তর। এই ধারার তৎপরতায় এনবিএ একাকী বা বিচ্ছিন্ন শক্তি নয়; সারা দেশ জুড়েই আদিবাসী এলাকায় উন্নয়নের বৃহৎ প্রকল্পগুলির বিরুদ্ধে তৃণমূল স্তরে অসংখ্য আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যেমন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে উঠেছে ঝাড়খণ্ডের কোয়েল কারো, বস্তারের নাগরনার ইস্পাত প্রকল্প, বিলাসপুরের কাছে সিপাট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, হিমাচলের গ্রেট হিমালয়ান ন্যাশনাল পার্ক ও মহারাষ্ট্রের মহেশ্বর বাঁধ প্রকল্পে যেগুলি রাষ্ট্রপোষিত উন্নয়নের জেরে আদিবাসী জীবন ও জীবিকার বিপর্যয় ঘটানোর প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
অপরপক্ষে, বামপন্থীরা আধুনিকতা বিরোধী নয়। তারা জনগনের স্বার্থবাহী এমন একটি উন্নয়নের পথের পক্ষে সওয়াল করে যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে এই লক্ষ্য অর্জনে সঙ্গী করে নেওয়া হয়েছে। এটাও সর্বজনবিদিত যে বামপন্থীরা সাধারণভাবে সমস্ত বৃহৎ প্রকল্পের বর্জন ও প্রতিবাদ করে না যদিও পরিবেশবাদীদের সাথে সহমত পোষণ করে যে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সুরাহা অত্যন্ত জরুরি। আবার, পরিবেশ আন্দোলনের মত তারাও বিশ্বাস করে যে আধুনিকতার বিদ্যমান রূপটি শোষণ সর্বস্ব এতে খুব স্বল্পাংশ উপকৃত হয় এবং দরিদ্র মানুষকে উচ্ছেদ করে নিজের দেশে উদ্বাস্তুতে পরিণত করে। ফলেই লড়াই আন্দোলনের মূল দিশা এই লক্ষ্যেই হওয়া উচিত যাতে এই প্রকল্পগুলির পরিকল্পনা ও নকশা এমনভাবে তৈরি হয় যার ফলে উপকৃত হতে পারে সমাজের সবচেয়ে ধনীদের বদলে দরিদ্রদের দরিদ্রতম অংশটি। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বামপন্থী নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন এটাও উপলব্ধি করেছে যে জনগনের বৃহত্তম অংশের স্বার্থের মূল্যে 'উন্নয়নের মন্দির'গুলির স্বপক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। সাইলেন্ট ভ্যালি প্রকল্পের বিরুদ্ধে কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদের (কেএসএসপি) নেতৃত্বে বামপন্থীদের সংগ্রাম বামপন্থার অভ্যন্তরে আধুনিক উন্নয়নের প্রকার প্রকরণ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করে। খুব সম্প্রতি ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক ফ্রন্টের নেতৃত্বে হিমাচল প্রদেশে গ্রেট হিমালয়ান ন্যাশনাল পার্ক, নাথপা ঝাকরি ও পার্বতী সাগরে চাষী কৃষকদের লড়াই সংগঠিত হয়েছে। এছাড়াও নর্মদা প্রশ্নে বামপন্থীদের সমর্থন, বিশেষ করে আদালতের রায়ের পর, দেখিয়েছে যে বৃহত্তর আন্দোলনের তরফে উচ্ছেদের প্রশ্নে উদাসীন নয়। বামপন্থী ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে এই বিতর্কের চেয়ে তপ্ত ও মুখর বিষয় সম্ভবত আর নেই। এর কারণ এই মতপার্থক্যের বিশেষ রূপটি জন্যে যা এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে বাম ও পরিবেশ আন্দোলনের মধ্যে ঐক্যের ধরনটি খুবই বিচ্ছিন্ন ও খণ্ড। যৌথ লড়াইগুলি বৃহত্তর আদর্শগত ঐক্যমতের ভিত্তিতে না হয়ে, নির্দিষ্ট অঞ্চল ও বিষয় কেন্দ্রিক। সেজন্যই উচ্ছেদের শিকার মানুষের স্বপক্ষে বামপন্থীদের লড়াইগুলি নজরে আসে না এবং অন্যান্য লড়াইয়ের প্রতি তাদের সমর্থনও স্বীকৃতি পায় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সঞ্জয় সাঙভির সাম্প্রতিক বই 'দ্য রিভার এন্ড দ্য লাইফ'-এ বলা হয়েছে 'সিপিএম ও অন্যান্যরা বিকল্প উন্নয়ন ও জনগনের অধিকারের আন্দোলনের প্রশ্নে কোনও অবস্থান গ্রহণ করে নি।' যদিও এই বিবৃতিটি নিজ গুণেই বিতর্কিত, তবে বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলনের মধ্যেকার বৃহত্তর সমস্যার অভিব্যক্তি হিসেবেই একে দেখতে হবে।
নর্মদা কাণ্ড
সর্দার সরোবর প্রকল্প নিয়ে ইনটাক (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর আর্ট এন্ড কালচারাল হেরিটেজ) -এর একটি বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, নর্মদা ওই উপত্যকার মানুষের জন্যে শুধু একটি নদী নয়, এটা সেখানকার জীবনধারা, সংস্কৃতি এবং চিরন্তন ঐতিহ্যের প্রতীক। এই ধারণাকে আরেকটু অগ্রসর করে নিয়ে আরেক লেখক বলেছেন, যে নদীকে মানুষ চিরকাল উপাসনা করেছে তাকে বাঁধ দিতে যাওয়া 'কুমারী দেবীর ধর্ষণের' সমতুল্য। এই বিষয়গুলিই নর্মদা বাঁধের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থানে সাংস্কৃতিক শক্তি জুগিয়েছে। এই বাঁধগুলি শুধুমাত্র কতগুলি বিচ্ছিন্ন জল সংরক্ষণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়, বরং নর্মদা নদীর সর্বাঙ্গীন ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশমাত্র। এই পরিকল্পনার দৃশ্যমানতায় রয়েছে ৩০টি বৃহৎ, ১৩৫টি মাঝারি ও ৩,০০০ ক্ষুদ্র বাঁধের মাধ্যমে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রের ব্যাপক অঞ্চলে বিস্তৃত এই নদীর অববাহিকা অঞ্চল। যার মধ্যে উচ্চতম প্রকল্প সর্দার সরোবর প্রকল্প যার ৪৫৫ ফুট উঁচু বাঁধ পূর্ণ নিমজ্জন সম্পূর্ণ হলে ১.৫ লক্ষ মানুষের উচ্ছেদ ঘটাবে। মধ্যপ্রদেশ যদিও এই প্রকল্প থেকে সেচের জল পাবে না, কিন্তু সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি মানুষ উচ্ছেদ হয়ে পুনর্বাসন প্রত্যাশী হবে এই রাজ্যে। মধ্যপ্রদেশে জল নিমজ্জিত হবে ১৯৩টি গ্রাম যেখানে গুজরাটে নিমজ্জিত হবে ১৯টি ও মহারাষ্ট্রে নিমজ্জিত হবে ৩৩টি গ্রাম। ফলে মধ্যপ্রদেশই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য যদিও সে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেচের কোনো সুবিধা পাবে না। তদুপরি, উচ্ছেদ হওয়া মানুষের অন্তত ৬২ শতাংশ হবেন অনুসূচিত জাতি ও উপজাতি গোষ্ঠীর যারা ওই অঞ্চলে সর্বাধিক প্রান্তিকায়িত অংশ। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর প্রকল্পের পুনরারম্ভ হলে বিচ্ছিন্নভাবে বহু আন্দোলন শুরু হয় প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সঙ্গে নিয়ে এবং এই লড়াইগুলিই সাধারণভাবে ১৯৮৭-৮৮ সাল থেকে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন নামে পরিচিতি পেয়েছে।
সরকারের কাছে পেশ করা প্রথমদিককার স্মারকলিপির একটিতে এনবিএ-এর বাঁধ প্রকল্পের সর্বাত্মক বিরোধিতা করা হয়েছিল এবং ঘোষণা করা হয়েছিল যে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া একটি পরিবারও নিজেদের ঘর ছেড়ে যাবে না। তারা ভূমি অধিগ্রহণ আইনের অধীনে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছিল। প্রথমদিকে এনবিএ-এর নজর কেন্দ্রীভূত ছিল বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করায় এবং উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের প্রশ্নটি ছিল পেছনের সারিতে যেহেতু আন্দোলনের তরফে বাঁধ নির্মাণের মৌলিক যৌক্তিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল তখন। সে কারণেই যে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের শর্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সোচ্চার হয়েছিল, তাদেরকে এখনও এই আন্দোলনের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। সাঙভির সাম্প্রতিকতম বইই এর প্রমাণ :
কেন্দ্র ও রাজ্যস্তরের বাম থেকে দক্ষিণ সমস্ত শক্তিগুলি গোড়া থেকেই 'উন্নয়ন প্রকল্প'-এর পুনর্বিবেচনার বিরোধিতা করেছে, যদিও একইসঙ্গে স্বীকার করেছে, সমর্থনসূচক ভাবেই, ক্ষতিগ্রস্ত জনগনের উন্নততর পুনর্বাসনের বিষয়টি।
এই দাবির সত্যতা যাচাইয়ে না গিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি যে কট্টর বাঁধ বিরোধিতার পরিণতি সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে এই আন্দোলনের ভাবনায় কী ছিল। এনবিএ এই দৃষ্টিকোণ থেকে হয়ত কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। তারা স্বতন্ত্র পুনর্বিবেচনার স্বপক্ষে চাপ সৃষ্টি করতেও পেরেছিল। ১৯৯১ সালে মূল দাতা সংস্থা বিশ্ব ব্যাঙ্কের তরফ থেকে বাঁধের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত কার্যকরিতা পর্যালোচনার জন্যে মোর্সে কমিটি গঠন করা হয়। এটা যখন ঘটছে তখন বাঁধের ব্যয় সুবিধা বিশ্লেষণের লক্ষ্যে একগুচ্ছ সমীক্ষা চলছিল যেখান থেকেও কাজ শুরু করার আগে পরিবেশগতভাবে যথাযথ পর্যালোচনা ও ছাড়পত্রের দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। ওই কমিটি যখন অভিমত দিল যে প্রস্তাবিত প্রকল্প সমস্ত পরিবেশগত মানদণ্ড ভঙ্গ করেছে এবং এর সুফল যতটা বলা হচ্ছে ততটা হবে না তখন ১৯৯৩ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাঙ্ক এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। এ ছাড়াও বলা হয়, যে বিপুল সংখ্যায় উচ্ছেদ হবে তার পূর্ণ পুনর্বাসন দেশের আইন কানুন ও বিধি অনুযায়ী করা অসম্ভব। এই পর্যালোচনায় উৎসাহিত হয়ে এনবিএ উচ্চতম আদালতে রিট আবেদন পেশ করে এবং সর্দার সরোবর প্রকল্পের সমস্ত নির্মাণ বন্ধ করার দাবি জানায়। দিগ্বিজয় সিং এর নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রদেশ সরকারের উপরও চাপ সৃষ্টি করা হয় নর্মদা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে বাঁধের উচ্চতা কমানোর দাবি জানাবার জন্যে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রদেশ সরকারও আদালতে পৃথক হলফনামার মাধ্যমে বাঁধের উচ্চতা কমানোর দাবি উত্থাপন করল। এই ঘটনাকে আরেকটি সুযোগ গণ্য করে এনবিএ বাঁধের উচ্চতা কমানোর দাবিতে প্রচার শুরু করে এবং মহারাষ্ট্র সরকারের উপরও চাপ সৃষ্টি করে নর্মদা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে একই দাবি পেশ করার জন্যে। ১৯৯৬ সাল নাগাদ তারা প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে তৃণমূল স্তরের নির্দলীয় আন্দোলনগুলির মোর্চা হিসেবে গঠন করে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব পিপলস মুভমেন্ট (এনএপিএম)। স্পষ্টতই, শুধুমাত্র পরিধিকে বিস্তৃততর করা নয়, বৃহৎ প্রকল্প বিরোধী মতাদর্শকে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে একটি বৃহত্তর মঞ্চ গঠন ছিল মূল উদ্দেশ্য।
নর্মদা বাঁধ ও বামপন্থীরা
প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে নর্মদা প্রশ্নে বামপন্থীদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে এরপর। ১৯৯০ এর গোড়ার পর্ব শুধু এনবিএ-র জন্যেই কর্মমুখর ছিল না, সংগঠিত বামপন্থার আওতাধীন সামাজিক আন্দোলন ও শক্তিগুলির জন্যেও ছিল তৎপরতার সময়। সিপিআইএম ধারাবাহিকভাবে এই অবস্থান নিয়েছে যে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সন্তোষজনক পুনর্বাসন না হওয়া অবধি প্রকল্পের কর্মকাণ্ডে অগ্রসর হওয়া অনুচিত। এছাড়াও তারা পর্যাপ্ত পুনর্বাসন অসমাপ্ত রেখে বাঁধের বাড়তি উচ্চতা বৃদ্ধিরও বিরোধিতা করেছে। বামপন্থার আওতাধীন রাজনৈতিক দলগুলি মূলত গোটা প্রকল্প বাতিলের পরিবর্তে কাজ পুনরারম্ভ নিয়ে কতগুলি শর্তারোপ করেছে এবং প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত জনগনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জ্ঞাপন করেছে। এর মাধ্যমে কখনো গোটা প্রকল্পের সমস্ত দিকগুলোর পুনর্বিচারও বোঝানো হয়েছে। ১৯৯২ সালে দলের তরফে নিম্নলিখিত অবস্থান নেওয়া হয়:
সিপিআইএম এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সহমত ব্যক্ত করে না যে পরিবেশগত ও সামাজিক বিবেচনা থেকে সমস্ত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্প রুখে দিতে অথবা পরিহার করতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রেই সামগ্রিক সুফল এবং উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্বার্থের তুলনামূলক বিবেচনার সমীক্ষার পরই অগ্রসর হওয়া উচিত। সর্দার সরোবর ও নর্মদা উপত্যকা প্রকল্পের ক্ষেত্রে, প্রকল্পের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সময় পাশাপাশি ভাবে বল্গাহীন ব্যয় বৃদ্ধির অতীত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে যথাযোগ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সমস্ত দিকগুলির পর্যালোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত। মধ্যপ্রদেশে সিপিআইএম এর তরফে দাবি জানানো হয়েছে মানুষের স্থানান্তরের আগে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের প্রকল্প সম্পূর্ণ করতে হবে।
এই অবস্থান বারবার উচ্চারিত হয়েছে এবং ২০০২ সালের আগস্ট মাসে দলের সাংসদদের গোষ্ঠী যখন গুজরাটের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্গতি নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে যায় তখন এই কথাগুলি আবারো তুলে ধরা হয়েছে। পরিস্থিতির চাক্ষুষ অভিজ্ঞতায় বিচলিত হয়ে এই সাংসদ গোষ্ঠী দিল্লিতে ফিরে দাবি তুলে বলেছেন পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন সম্পর্কিত নর্মদা জল বিবাদ নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনালের রায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। এভাবে দল দাবি তোলে:
- জমি মালিকদের জীবিকা রক্ষার স্বার্থে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নগদ টাকায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বর্তমান নীতির পরিবর্তে বিকল্প জমির বন্দোবস্ত করতে হবে।
- ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে তাদের অধীনে থাকা সেচযোগ্য জমিতে অথবা নিজের রাজ্যের অভ্যন্তরে সরকারি খরচে সেচের ব্যবস্থা সহ সেচযোগ্য জমিতে পুনর্বাসন দিতে হবে।
- ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে গুজরাট অথবা নিজের রাজ্যে বসতজমি জমি চয়ন করার অধিকার প্রদান করতে হবে।
- গ্রামগুলিকে গোটা জনসমাজ সহ গ্রাম হিসেবে গড়ে ওঠার সুবিধাযুক্ত অঞ্চলে বসতি প্রদান করতে হবে।
- পুনর্বাসনের অন্তত এক বছর আগে সেচযোগ্য জমির ব্যবস্থা করতে হবে।
- উচ্ছেদ হতে যাওয়া সমস্ত মানুষের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের সুবন্দোবস্ত ও সে সম্পর্কে তাদের পূর্ণ অবহিত না করা পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের কোনো অঞ্চলকে জল নিমজ্জিত করা যাবে না।
- প্রকল্পের নির্মাণ শুরুর যথেষ্ট আগে পুনর্বাসন সম্পূর্ণ করতে হবে অথবা নির্মাণ ও জলাধারের নিমজ্জনের কাজ পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হওয়া অবধি বন্ধ রাখতে হবে।
- মান বাঁধ প্রকল্প অঞ্চলের উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীদের উপর দমনপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে; এই বিষয়ে গঠিত হওয়া অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণ কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলী অনুযায়ী তাদের পুনর্বাসন প্রদান করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত তাঁদের উচ্ছেদ করা চলবে না।
- মহেশ্বর জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং এই প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
এ থেকে এটা স্পষ্ট যে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত জনগন সম্পর্কে সিপিআইএম-এর অবস্থান ১৯৯০ সাল থেকেই সঙ্গতিপূর্ণ। এমনকী, আজ, তারা মহেশ্বর জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের মত প্রকল্পগুলি যেগুলির উচ্চ ব্যয় মূল্য ও সীমিত সুবিধা সেগুলির বাতিলের দাবিও তুলছে। এভাবে ধীরে ধীরে এনবিএ-এর অবস্থানের কাছাকাছি এসেও তাদের মত আধুনিকীকরণ ও প্রযুক্তি বিরোধিতা অবধি যায় নি। এই পরিবর্তন যতটা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় তার চেয়ে অনেক বেশি বামপন্থীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা প্রসূত।
বিলম্বে হলেও, বহু বৃহৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অভিঘাতের পুনর্বিচার শুরু হয়েছে। বিগত চার বছর ধরে গণসংগঠনগুলি হিমাচল প্রদেশের নাথপা ঝাকরি প্রকল্প ও কৃষক শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় উপর এর আঘাতের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরের অত্যধিক তাপমাত্রার জেরে ১৯৯৩ সাল থেকে প্রায় ২০০ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছে এবং ১৯৯৯ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নসের (সিআইটিইউ) আন্দোলন সরকারি দমনপীড়নের শিকার হয়ে চলেছে। একইসঙ্গে কৃষক সভা কৃষক ও স্থানীয় জনগনের দাবির স্বপক্ষে সোচ্চার হয়েছে। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে নাথপা ঝাকরি প্রকল্পকে জনবান্ধব বলে প্রচার করা হচ্ছিল যেহেতু এই প্রকল্পের ফলে কোনো মানুষ ভূমিচ্যুত হবে না। ১৯৯০ এর গোড়ার দিকে লড়াই শুরু করে সিআইটিইউ; তারা শ্রমিকদের প্রতি হওয়া অমানবিক আচরণের জনসমক্ষে তুলে ধরতে কন্টিনেন্টাল ফাউন্ডেশন জয়েন্ট ভেঞ্চারে (সিএফজেভি) তে ইউনিয়ন গঠন করেছিল। তারা মুখ্যত প্রশ্ন তুলে বলেছিল, নির্মাণ কাজের বিপ্রতীপ ধরনের জন্যে এই প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সিংহভাগ ক্ষয়রোগ ও হাঁপানি রোগের মত গুরুতর ব্যাধির শিকার হচ্ছে। শ্রমিকদের যা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে তা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং এটারও সূত্রপাত হয়েছে রাজ্য মানবাধিকার আয়োগের তরফে এনজেপিসিকে ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের নির্দেশিকা প্রদানের পর। এই প্রশ্নগুলি ছাড়াও, সিআইটিইউ ও কৃষক সভার তরফ থেকে বাঁধ প্রকল্পের নেতিবাচক পরিবেশগত অভিঘাতের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ঘটানো বিস্ফোরণের ফলে স্থানীয় মানুষের ঘরবাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। পানীয় জলের উৎস শুকিয়ে গেছে, পশুচারণের তৃণভূমি দ্রুত অদৃশ্য হচ্ছে এবং কৃষিকাজ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এলাকার পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে নদীবক্ষে পলি ও অনুচ্চ পাহাড়ের পাথরে ফাটল সৃষ্টি হয়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে গেছে অস্বাভাবিক ভাবে। এক্ষেত্রেও বামপন্থী দলগুলি সামগ্রিকভাবে বাঁধ তৈরির বিরোধিতা থেকে বিরত থেকেছে, কিন্তু তাদের অবস্থান ছিল যে নাথপা ঝাকরি প্রকল্পের নকশার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। তাদের দাবি ছিল, বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন করতে হবে যাতে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের যথার্থ পদ্ধতি নিরুপণ হয় এবং এর ভিত্তিতে বিকল্প নকশা প্রস্তাবিত হতে পারে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিএ-এর তরফ থেকে নিয়মিত উত্থাপন করে আসা বিকল্পগুলি বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৯৮০-র শেষ থেকে বামধারার গণ বিজ্ঞান আন্দোলন(পিএসএম) শিল্পায়ন ও উন্নয়নের প্রকরণ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। এর প্রতিফলন ঘটেছে একলব্য ও কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদের সাথে এনবিএ-র মিলিত কর্মসূচি এবং তার পূর্ববর্তী সময়ের সাইলেন্ট ভ্যালি কেন্দ্রিক বিতর্কে। এই প্রেক্ষাপটেই সারা ভারত গণবিজ্ঞান গোষ্ঠী (এআইপিএসএন- বামপন্থায় গভীর আস্থাশীল একটি সংগঠন) ১৯৯৪ সালে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও আন্দোলনকর্মীদের একটি ব্যাপক আকারের সম্মেলন আয়োজন করে সর্দার সরোবর প্রকল্পের বিকল্প নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে। সম্মেলনে সারা দেশ থেকে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা যোগ দিয়েছিলেন মূলত প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে সর্দার সরোবর প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিকল্পগুলির বিবেচনা করতে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন পরিকল্পনা আয়োগ, কেন্দ্রীয় জল আয়োগ ও কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সদস্যরাও যারা এই প্রকল্পের নকশা ও নির্মাণের কাজের সময় কর্মরত ছিলেন। একটি সংলাপের সূত্রপাত ঘটাতে এই সম্মেলনে এনবিএ-কেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা শুধুমাত্র পরিদর্শক পাঠালেন। তাদের মনে হল, এই সম্মেলনে তাদের পুরোদস্তুর অংশগ্রহণ তাদের বাঁধ বিরোধী অবস্থানকে লঘু প্রতিপন্ন করবে। সর্দার সরোবর নিগমকেও পরিদর্শক পাঠানোর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অনুমানকে সত্য করে তারা তাদের পাঠায় নি। এই সভার মূল উপসংহার ছিল, দৃষ্টত সর্দার সরোবর প্রকল্পের চমৎকার বিকল্প রয়েছে, এমনকী চারটি উপকৃত রাজ্যকে (মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্র) নর্মদা ট্রাইব্যুনাল প্রস্তাবিত জল বন্টনকে অপরিবর্তিত রেখেই এবং এমনকী নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়া প্রাচীরগুলিকে যদি ব্যবহার করতেও হয় তবু। সভা থেকে অবিলম্বে এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত, সামাজিক ও মানবিক দিকগুলিকে সাম্প্রতিকতম তথ্যের ভিত্তিতে (যা তখন ট্রাইব্যুনালের কাছে লভ্য ছিল না) এবং আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি উত্থাপন করা হয়।
সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় ছিল গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সাথে যুক্ত মার্কসবাদী বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী সুহাস পরাঞ্জপে ও কে, জে, জয়ের উপস্থাপনা। উপত্যকা ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা এবং হাতে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে তারা ওই অঞ্চলে জল ব্যবহারের বিকল্প পরিকল্পনা হাজির করেন। এই পরিকল্পনার সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক বিষয় ছিল, এনবিএ ও অন্যান্য পরিবেশ আন্দোলনের বিকল্প উন্নয়নের আলোচনায় উত্থাপিত বৃহৎ ও ক্ষুদ্র কাঠামোর বিরোধ নিরসনের একটি প্রয়াস। এই বিকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল এই প্রত্যয় যে, ছোট ব্যবস্থাগুলির অধিকতর ভরসা সম্পন্ন পরিষেবা সুনিশ্চিত করার প্রয়োজনেই বৃহৎ উৎসগুলি ব্যবহার প্রয়োজন। এখানে সংঘাতকে 'বৃহৎ' বনাম 'ক্ষুদ্র' হিসেবে না ভেবে দুইয়ের আন্তঃসম্পর্কের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিকল্পে বিদ্যমান বাঁধের স্থাপনা ও স্থানীয় জলাধার ব্যবস্থার সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে খরা পীড়িত এলাকার চাহিদাপূরণের কথা বলা হয়। তারা যুক্তি দেখিয়ে বলে, পরিকল্পিত ও যথাযথ ব্যবহার বৃহৎ উৎসগুলির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবস্থাপনাগুলিতে সহায়তা প্রদান সুনিশ্চিত হতে পারে এবং ফলে এর ভরসা যোগ্যতার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়িত্বও বৃদ্ধি পাবে। এতে বলা হয়, বড় স্থাপনাগুলি মূল জলাধার হিসেবে থাকবে না, বরং নিরন্তর স্থানীয় জলাধারকে ভরাট রাখার কাজে করবে। দ্রুতবাহী খালের মাধ্যমে খরা আক্রান্ত এলাকায় জল তুলে পাঠানোর কথাও বলা হয় যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে উর্বরতর এলাকাগুলির দ্বারা জলধারা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। এর ফলে ধারণ করে রাখা জলের স্তর অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং নিমজ্জিত এলাকাও সংকুচিত হবে যার ফলে এই মুহূর্তে প্রস্তাবিত উৎখাতের ৮০ শতাংশের কোনো প্রয়োজনই থাকবে না। এতে বাঁধের উচ্চতা ও ব্যয় দুইই হ্রাস পাবে আবার ইতিমধ্যে নির্মাণ হয়ে যাওয়া স্থাপনাগুলোও ব্যবহারে চলে আসবে। এই পরিকল্পনার রচয়িতাদের দাবি ছিল, এতে নর্মদার জলপ্রবাহের সর্বোত্তম ব্যবহার সুনিশ্চিত হবে। এই প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে এনবিএ খুব একটা উৎসাহ দেখায় নি। এই বিকল্প প্রস্তাব মেনে নিলে বছরের পর বছর ধরে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দানা বাঁধা তাদের 'বাঁধ মানি না' অবস্থান বেসামাল হয়ে পড়ে। যার দরুণ, এই পরিকল্পনা রচনার পাঁচ বছর পর রচয়িতারা মন্তব্য করতে বাধ্য হন যে এই সংঘাত 'একে অপরকে ক্লান্ত করিয়ে দেওয়ার যুদ্ধে' পরিণত হয়েছে যেখানে উভয়পক্ষই নিজেদেরকে এমন জায়গায় টেনে নিয়ে স্থিত করেছে যেখান থেকে কোনো মধ্যবর্তী পরিসর দৃশ্যমান হয় না। এটাই যুক্তিসিদ্ধ হয় যে এই সংঘাত 'যারা নিজেদের অধিকতর ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী তাদের এই ধারণা থেকে এসেছে যে তারা ভাবছে অপর পক্ষ অবসন্নতায় পরাজয় মেনে নেবে'।
যদিও নতুন শতকে এসে এই নিবন্ধ ও এই বিকল্পের ধারণা এনবিএ-র আলোচনায়ও স্থান পেতে শুরু করেছে এবং তারা বিজ্ঞান আন্দোলনের ধারায়ই বিষয়টি নিয়ে সওয়াল করতে শুরু করেছে। সাঙভির বই এবং ফ্রেন্ডস অব নর্মদার ওয়েবসাইটে সুহাস পরাঞ্জপে ও কে,জে, রায়ের বিকল্প স্থান পেয়েছে। বিতর্ক মোড় নিয়েছে এখন ব্যয়, সুবিধা ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে। বাঁধ বিরোধী বক্তৃতার ঝাঁঝও এখন অনেকটাই মৃদু হয়ে গেছে। কেন্দ্রবিন্দুর এই পরিবর্তনকে দেখতে হবে ২০০০ সালের ১৮ অক্টোবর ঘোষিত উচ্চতম আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যে কথা আগে বলা হয়েছে, এনবিএ-র তরফে ইতিমধ্যেই সর্দার সরোবর প্রকল্প নিয়ে উচ্চতম আদালতে রিটও আবেদন পেশ করা হয়েছিল। যদিও আদালতের শুনানি শুরু আরম্ভ হওয়ার পরই বোঝা যাচ্ছিল জল কোন দিকে গড়াচ্ছে। ১৯৮৭ সাল নাগাদ এনবিএ-র তরফ থেকে অভিযোগ উত্থাপিত হতে থাকে যে গুজরাট সরকার বসতি প্রদান নিয়ে মিথ্যে হলফনামা দিচ্ছে এবং পুনর্বাসনের কাজ যথাযথভাবে করছে না। তারা প্রকল্প এলাকার বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে আদালতকে ওয়াকিবহাল করার জন্যে পূর্বতন রায়গুলি ও ব্যয় সুবিধা বিশ্লেষণের প্রতি লাগাতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে। এই লক্ষ্য নিয়ে জনমত গঠন করার উদ্দেশ্যে তারা অসংখ্য পদযাত্রা, গণশুনানী ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি সংগঠিত করে। কিন্তু কিছুতেই কোনো কিছু হল না।
রায় ঘোষণার দিন (১৮ অক্টোবর, ২০০০), আদালত জানিয়ে দিল, সর্দার সরোবর প্রকল্পের কাজ অব্যাহত থাকবে, এর উচ্চতা ৯০মি অবধি, এমনকী নর্মদা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সহমত হলে তার চেয়েও বেশি, উঁচু করা যাবে। তার চেয়েও অনেক বেশি মর্মান্তিক ছিল রায়ের এই অংশ যেখানে বলা হয়েছে প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসনের উপর নির্ভরশীল থাকবে না। বিচারপতি ভারুচার সংখ্যালঘুত্বে দেওয়া রায়ে অবশ্য বলা হয়েছে কর্তৃপক্ষকে নির্মাণকাজে এগোনোর আগে পরিবেশগত পর্যালোচনার পর ছাড়পত্র পেতে হবে। যদিও বাস্তবে এর কার্যকারিতা ছিল না। এটা বিশেষ করে এনবিএ-র জন্যে এবং সমস্ত প্রগতিশীল শক্তির কাছে ছিল এক প্রধান বিপর্যয় যারা সাধারণভাবে নর্মদা উপত্যকার সমগ্র জনগনের ভবিষ্যৎ নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করে সোচ্চার হয়েছিল। এনবিএ এই রায়কে 'অযৌক্তিক, জনবিরোধী ও সংবিধানের পরিপন্থী' বলে অভিহিত করেছিল। একই ভাষায় নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বামপন্থীরা সহ সমস্ত প্রগতিশীল শক্তিগুলি। ভারতের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বর্তমান সংকটের সময়কালে এই রায় সমস্ত প্রগতিশীল শক্তিকে নর্মদা প্রশ্নে এক ব্যাপকতর ঐক্যের দিকে নিয়ে আসে। পরিহাসের বিষয়, এটা তখনই ঘটছে যখন সর্দার সরোবর প্রকল্প ঘিরে সমস্ত বিকল্পের দুয়ার ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
পুনর্বাসনের দায়িত্ব অস্বীকার
উচ্চতম আদালতের রায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত জনগন বা প্রজেক্ট এফেক্টেড পিপল (পিএপি)-র স্বার্থরক্ষা থেকে দায়মুক্ত করেছে। সর্দার সরোবর প্রকল্প ইতিপূর্বের সমস্ত প্রকল্পের তুলনায় সর্ববৃহৎ উৎখাতের ঘটনা ঘটাবে। সরকারি তথ্যে সবসময়ই প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ের সময়ে ধারণা করা হয়েছিল মাত্র ৬,১৪৭ টি পরিবার বা আনুমানিক ৪০,০০০ মানুষ জল নিমজ্জনের জন্যে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরিকল্পনা আয়োগ সেই সংখ্যাটি বাড়িয়ে ৬,৭০০ পরিবার করে। ১৯৮৭ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের অনুমানে বলা হয় এর দ্বিগুণ অর্থাৎ ১২,০০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরে এটা সংশোধিত করে ২৭,০০০ ধরা হয়। ১৯৯৪ সালে এটা আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে বলা হয় যে ২৪৫টি গ্রামের মোট ৪১,৫০০ পরিবার প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ২০১১ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩,০০০ পরিবারে। এই সংখ্যার অর্ধেক হচ্ছেন সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিকায়িত অংশ অনুসূচিত জাতি ও উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষেরা। যে পদ্ধতিতে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত জনগন নিরুপণ হচ্ছিল তা নিয়ে এনবিএ-র তরফে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। তারা অভিযোগ করে বলেছে এই সংজ্ঞা অত্যন্ত সংকীর্ণ কারণ জনগণের যে অংশ নিমজ্জিত অঞ্চল বা প্রকল্প এলাকায় বসবাস করে না অথচ প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত তাদের উপর জলাধারের প্রভাবকে ধর্তব্যে আনা হয় নি। এতে অন্তর্ভুক্ত হবে মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী শ্রেণি এবং নদীখাতের চাষীরা। তারা সওয়াল করে বলেছিলেন, জনগণের এই অংশও জীবিকা হারাবে এবং তাদের জীবিকাগত পুনর্বাসনের স্বার্থেই তাদেরকেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগন বা পিএপি হিসেবে গণ্য করতে হবে।
যৌক্তিকতা সত্ত্বেও এই সওয়ালকে সাময়িকভাবে অগ্রাহ্য করে প্রাসঙ্গিকভাবে পুনর্বাসন যে পদ্ধতিতে হয়েছে তার কয়েকটি দৃষ্টান্তের বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৯৯৯ সালে জাতীয় অনুসূচিত জাতি ও উপজাতি আয়োগের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রদেশ থেকে গুজরাটে স্থানান্তর করা ৩,০০০ আদিবাসী পরিবার নিয়ে একটি সমীক্ষা করা হয়। এর ফলাফল বিশ্লেষণ করার পর স্পষ্ট হয়:
- জমি পাওয়ার জন্যে নির্ধারিত পরিবারগুলির ৪০ শতাংশ কোনো জমি পায় নি।
- ১৬ শতাংশের কোনো স্থায়ী পাট্টা জোটে নি।
- ৮৪০টি পরিবার কর্ষণের অযোগ্য জমি পেয়েছে যা জলমগ্ন বা লবণাক্ত কিংবা বন্ধ্যা হওয়ায় প্রক্রিয়াকরণ দাবি করে।
- বন্টনকৃত জমির ৩৯ শতাংশে চাষ হওয়া অসম্ভব এবং ১১ শতাংশ সেচ সুবিধাবিহীন হিসেবে ইতিমধ্যেই নথিভুক্ত রয়েছে।
- উল্লিখিত কারণে ১১ শতাংশ মানুষ আবার তাদের পুরোনো গ্রামে ফিরে এসেছে।
- গ্রামে ফিরে আসা অনেকেই অভিযোগ করেছে যে গ্রামের মূল বাসিন্দারাই তাদের বিরোধিতা করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
উপরে উল্লেখ করা বিষয়ের চেয়েও গুরুতর ব্যাপারটি হল যে এই পরিবারগুলিকে তাদের সম্মতি ছাড়াই স্থানান্তরিত করা হয় এবং এঁদের দুর্দশা থেকে বোঝা যায় পুনর্বাসনের শর্তপূরণের নামে সরকার তাদেরকে কার্যত আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে। আদিবাসীদের মধ্যে যারা ভূমিহীন তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় নি এবং জঙ্গল, কুয়ো, গোচারণ ভূমির মত সাধারণ ব্যবহারের জমি যা তাদের জীবন জীবিকার মূল উৎস, তার প্রবেশযোগ্যতা বা অধিকারের কথা বিবেচনাই করা হয় নি। পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিষয়ের মত প্রাথমিক সুযোগ-সুবিধার কোনো উল্লেখই নেই। এনবিএ আদালতে আবেদন ও প্রতিবেদন পেশ করে জানায় যে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের তৈরি করে দেওয়া শর্তাবলীকে লঙ্ঘন করে।
মহেশ্বর বাঁধের বিষয়ে দাউদ কমিটিও ২০০০ সালের উচ্চতম আদালতের রায়ের পর একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। মহারাষ্ট্র সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দাউদ কমিটি বলেছে বিদ্যমান ৮০ ফুট উচ্চতার ক্ষেত্রে জনগনের পুনর্বাসন প্রদানে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও বলেছে মানুষকে পুনর্বাসন দেওয়ার জন্যে জমির ব্যবস্থা না করেই মহেশ্বর বাঁধের উচ্চতা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। সাম্প্রতিককালে মান বাঁধের বিষয়ে ইন্ডিয়ান পিপলস ট্রাইব্যুনালের গণশুনানী ও মানের উৎখাত জনতার লড়াই থেকে
এটা স্পষ্ট হয়েছে যে ২০০২ সালের জুন মাসে নিমজ্জিত হতে যাওয়া গ্রামগুলির ক্ষেত্রে অতিসত্বর সুরাহা করা প্রয়োজন। ১৭টি গ্রামের অনুসূচিত উপজাতি সম্প্রদায় জীবন জীবিকা হারাবে যদি না নিমজ্জনের আগে চাষবাসের জন্যে বিকল্প জমি ও বসবাসের জন্যে বাস্তু জমির সংস্থান করা হয়। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রদেশ সরকারের নর্মদা প্রকল্প পুনর্বাসন নীতিমালার বিপরীতে বিরাজ করছে। ট্রাইব্যুনাল এটা দেখেও 'মর্মাহত হয়েছে যে উৎখাত হওয়া জনগনের পুনর্বাসনকে বাঁধ নির্মাণের কাজের সাথে সামগ্রিকভাবে যুক্ত করা হয় নি'। তারা প্রস্তাব রেখেছে, জল নিমজ্জনের কাজ যেন উৎখাত মানুষদের নতুন বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন অবধি মুলতুবি রাখা হয়।
ফলে দেখা যাচ্ছে স্থানান্তরিত মানুষদের অবস্থা খুবই অনিশ্চয়তায় ভরা এবং তিরিশ বছর লড়াই করার পরও তাঁরা অভাব অভিযোগের সুরাহা পেতে ব্যর্থ হয়েছে। এটা সাবধানতার সাথেই প্রশ্ন তোলা যায় যে নর্মদার পরিস্থিতিই একমাত্র দৃষ্টান্ত নয় যেখানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্লথ ও রহস্যে ঢাকা এবং যেখানে সন্তোষজনক মীমাংসার চেয়ে সরকারি নিপীড়নের মাত্রাই বেশি। মানের উৎখাত মানুষেরা একটা দৃষ্টান্ত, নগরনার ইস্পাত প্রকল্পের প্রতিবাদকারীদের উপর পুলিশের গুলিচালনা আরেকটি দৃষ্টান্ত এবং হয়ত এমনতর আরো লক্ষ লক্ষ ঘটনা আছে যার কথা আমরা জানি না। এর মূল কারণ হচ্ছে নতুন বসতি প্রদান ও পুনর্বাসনের ধরন এখনও কেন্দ্রীভূত ও ঔপনিবেশিক চরিত্রের রয়ে গেছে। জমি অধিগ্রহণ আইন তৈরি হয়েছিল ১৮৯৪ সালে এবং সরকার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে একে আরো কেন্দ্রীভূত চরিত্রের আইনে পরিণত করতে। একইভাবে খসড়া পুনর্বাসন বিধিও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সীমিত চেহারায় গণ বিতর্কের জন্যে প্রকাশ করেছিল এবং কার্যত কাগজে আটকা থেকে গেল। এর বিরুদ্ধে 'প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা জাতীয় প্রচারাভিযান' এর পতাকা তলে অসংখ্য গোষ্ঠী প্রতিবাদ সংগঠিত করে চলেছে। সামাজিক ক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্রের সরে আসা এবং প্রাকৃতিক ও সাধারণ সম্পদের ক্রমবর্ধমান বেসরকারিকরণ উৎখাত হওয়া জনগনের ভবিষ্যৎকে আরো বিপর্যস্ত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রদেশে দিগ্বিজয় সিং সরকারের উদ্যোগে মহেশ্বর বাঁধের তীরবর্তী জমি এস, কুমার নিগমকে বিক্রয় করা ক্ষতিগ্রস্ত জনগনের স্বার্থের প্রশ্নে সরকারি উদাসীনতার আরেকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। অন্যদিকে জনগনের তরফে তাদের দুর্দশা নিরসনের প্রতিটি প্রচেষ্টা সরকারি বাধার সম্মুখীন হয়েছে। নর্মদা অঞ্চলে মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই সাফল্য পায় নি এবং রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগ উৎখাত হওয়া মানুষের ন্যূনতম মানবিক দাবির প্রতিও কর্ণপাত করে নি। এই বাস্তবতা এই সমস্ত দাবিতে একটি সুসংহত রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা ও বৃহৎ বাঁধের বিকল্প নিয়ে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে একটি অভিন্ন অবস্থান রচনায় এনবিএ-র ব্যর্থতাকে তুলে ধরে। উচ্চতম আদালতের রায় আরো একবার সুযোগ এনে দিয়েছে এই সমস্ত প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে তোলার। ধারাবাহিক সংলাপের মধ্য দিয়ে বামপন্থী ও পরিবেশবাদীদের মধ্যেকার মতপার্থক্যও হ্রাস পেতে শুরু করেছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ ও গ্রহণযোগ্য বিকল্পের বাস্তবায়নের পরিসরও আরো বেশি বেশি করে সংকুচিত হচ্ছে। এখানেই নিহিত রয়েছে নর্মদা বৃত্তান্তের শিক্ষা এবং করুণ পরিণতি, দুইই।
পরবর্তী পর্বগুলিতে
- ভারতীয় গণতন্ত্রে আদিবাসী সমাজ
- উত্তরকথন : ঐক্যবদ্ধ মোর্চার গঠন
মূল রচনা :
লেফটওয়ার্ড বুকস, নতুন দিল্লি- ১১০০০১ থেকে এপ্রিল ২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত সাইনপোস্ট পুস্তিকা মালার নবম প্রকাশনা অর্চনা প্রসাদের 'এনভায়রনমেন্টালিজম এন্ড দ্য লেফট' (কনটেম্পোরারি ডিবেটস এন্ড ফিউচার এজেন্ডাস ইন ট্রাইবেল এরিয়াজ)।
ভাষান্তরঃ
শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ০৯-জানুয়ারি-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
