সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ছায়া পূর্বগামিনী
রতন খাসনবিশ
যাঁরা ভেবেছিলেন ৪৫ টাকা লিটারে জ্বালানি তেল পাওয়া যাবে, ডলার ৪০ টাকায় নামবে, প্রতিটি ভারতবাসী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ করে টাকা পাবেন, যারা ভেবেছিলেন বাড়ির জোয়ান ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকরি পাবে, যারা ভেবেছিলেন আরও বড়ো বড়ো কারখানা গড়ে মোদী প্রতি ঘরে বেকার যুবক যুবতীদের চাকরি দেবেন, যারা ভেবেছিলেন দিনের শেষে নিরাপত্তা দেবে মোদীর রাষ্ট্র যাতে তাঁরা সন্ধেবেলায় নির্বিঘ্নে তুলসীদাসী রামায়ণ পড়ে সময় কাটাতে পারেন, উত্তর ভারতের সেই অগণিত সাধারণ মানুষ মোদীর বিজেপির সরকার কর্তৃক প্রতারিত হয়েছেন। হরিয়ানার শম্ভূ সীমানায় এই মানুষদেরই কাতার ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। রাম লালা কোনও ভাবেই মানুষের এই দীর্ঘ ব্যারিকেড অতিক্রম করতে পারছে না।

সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ কিংবা অযোধ্যায় রাম লালার মন্দির প্রতিষ্ঠা, কোনওটাই যে মোদী সরকারকে সুবিধেজনক অবস্থায় এনে ফেলতে পারছে না ইতিমধ্যেই তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। পাঞ্জাব-হরিনায়া সীমানায় কৃষকেরা ঘাঁটি গেড়ে বসেছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাতেই বিজেপি-শাসিত হরিয়ানার অম্বালা পুলিশ শম্ভূ সীমানায় গুলি করে একজন কৃষকের মৃত্যু ঘটিয়েছে। পাতিয়ালার হাসপাতালে যোগরাজ সিং নামে আরেক আন্দোলনকারী কৃষক মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কৃষক ভাইবোনদের প্রতি তিনি যে যথেষ্ট সংবেদনশীল সেকথা তার এক্স হ্যান্ডলে বার বার জানিয়ে যাচ্ছেন। দাঙ্গাবাজ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরও কৃষকদের ভাই ও অন্নদাতা সম্বোধন করে বলছেন, সরকার সব সময় আলোচনায় রাজি। অন্যদিকে, ব্যারিকেডের পর ব্যারিকেড তৈরি হচ্ছে কৃষকেরা যাতে দিল্লি প্রবেশের কোনও সুযোগ না-পান। সোশাল মিডিয়ায় কোনওভাবেই যাতে কৃষকদের দাবির পক্ষে প্রচার জোরদার না-হয়, তার জন্য সতর্ক পদক্ষেপ করেছেন মোদী সরকার। স্মরণ করা যেতে পারে যে, প্রচারের যে অন্যতম মাধ্যম ছিল টুইটার, গত বছর দিল্লির সীমানায় কৃষক আন্দোলনের সময়ে মোদী সরকার সেই টুইটার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। টুইটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরোসি গত বছর জানিয়েছিলেন, টুইটারকে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন মোদী সরকার, কেননা টুইটার হ্যান্ডল থেকে তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে চলা কৃষক আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দেওয়া হত। টুইটারের মালিকানা বদলের ফলে তার নাম এখন হয়েছে এক্স হ্যান্ডল। এক্স সংস্থা গত ২১ ফেব্রুয়ারি দাবি করেছে যে, মোদী সরকার নির্দেশিকা জারি করে তাদের নির্দিষ্ট কিছু অ্যাকাউন্ট ও পোস্টের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। না-হলে বিপুল পরিমাণ জরিমানা ও কারাদণ্ডের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি স্পষ্ট ইঙ্গিত রাখছে যে, রাম লালাকে বাল্যভোগ খাইয়ে কিংবা দুধের সাগরে স্নান করিয়ে অ্যাজেন্ডা বদলের যে চেষ্টা মোদী সরকার করেছেন, সেটা একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। এমনকী জাঠ কৃষক নেতা প্রয়াত চরণ সিংকে মরণোত্তর ভারতরত্ন উপাধি দিয়েও সুবিধে করা যাচ্ছে না। কৃষক সংগঠনগুলির প্রধান পদাধিকারী ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে। কোনওভাবেই আন্দোলন যাতে না-ছড়িয়ে পড়ে সেটা দেখার জন্য মোদী সরকারকে রাষ্ট্রের যে প্রধান ভাষা, আক্রমণের ভাষা, আশ্রয় নিতে হয়েছে সেই অস্ত্রটির। কৃষকের দাবি যে অন্যায্য, তাদের দাবি পূরণ করতে হলে সরকারি কোষাগার যে ফতুর হয়ে যাবে একথাও অবশ্য বিপুল উদ্যমে প্রচার করা হচ্ছে সুখী ভারতীয়দের মধ্যে। রাষ্ট্র যে শুধু কামান-বন্দুক দিয়ে তার অস্তিত্ব রক্ষা করে না, সম্মতি নির্মাণ করার অস্ত্রও যে তার বড়ো অস্ত্র, তিন কৃষি আইন নিয়ে পাবলিক স্ফিয়ারে মোদীপন্থীদের কীর্তিকলাপে সেটা প্রমাণিত। সুখী ভারত দাঁড়াবে মোদীর পক্ষে। কোনওমতেই কৃষকদের উৎপন্ন ফসলে আর কোনও বাড়তি টাকা দেওয়া যাবে না। রীতিমতো অঙ্ক কষে সেটা প্রমাণের চেষ্টা চলবে। সমস্যা হল, সুখী ভারত মানে ২০ শতাংশ ভারতবাসী। অথচ মোদীকে ভোট আদায় করতে হবে বাকি ভারতবাসীর কাছ থেকেও। রাম লালা দিয়ে সেখানে সুবিধে হচ্ছে না। ৩৭০ ধারা দিয়েও না। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে মোদীর সবচেয়ে বড়ো বিপদ লুকিয়ে আছে এখানেই।
কৃষকের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (এমএসপি) দাবি কতটা ন্যায্য, স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্টে সেটি নিয়েও একটি তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা আছে। এই তথ্যের সারবত্তা ইউপিএ-১ এবং ইউপিএ-২ সরকারও অস্বীকার করতে পারেননি। সেই সময়কার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও দিল্লিতে এসে এই এমএসপির পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। সংক্ষেপে বললে, এই এমএসপি নির্ধারিত হওয়ার কথা কৃষকের যাবতীয় খরচ, যা নগদে দিতে হয় সেটা এবং পারিবারিক শ্রমের যা দাম, উৎপাদনে যে পুঁজি খাটছে তার ওপর যে সুদ এবং চাষ না-করে জমি যদি খাজনার বিনিময়ে ভাড়া দেওযা হত তার যে দাম, সব যোগ করলে দাঁড়ায় চাষের পুরো খরচ, স্বামীনাথন কমিশন যাকে বলেছিলেন C2। এর ওপরে ৫০ শতাংশ লাভ রেখে নির্ধারিত হওয়া উচিত ফসলের সংগ্রহ মূল্য। এটি হল এমএসপি, যেটি কোনও সরকারই দিতে রাজি হননি। এবছর সরকারি হিসাবে গমের ক্ষেত্রে C2 হল ১৬৫২ টাকা (কুইন্টাল পিছু)। কেন্দ্রীয় সরকার এমএসপি নির্ধারণ করেছেন কুইন্টাল পিছু ২২৭৫ টাকা। যে স্বামীনাথনকে মরণোত্তর ভারতরত্ন উপাধি দিয়ে মোদী সরকার কৃষকদের বিরুদ্ধে আর একটি ঢাল তৈরি করার চেষ্টা করছেন, সেই স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুসারে এবছর গমের সংগ্রহ মূল্য হওয়ার কথা কুইন্টাল পিছু ২৪৭৫ টাকা। যে কৃষক মাণ্ডিতে গম বিক্রি করতে আসবেন কুইন্টাল পিছু তাঁকে ২০০ টাকা কম দাম নিয়ে বাড়ি যেতে হবে। বলা বাহুল্য, এতে কৃষকেরা আদৌ খুশি নন। রাম লালা দিয়ে তাঁদের ভোলানো যাচ্ছে না। মোদী সরকার ক্রমশ উপলব্ধি করছেন মানুষের কাছে অর্থনৈতিক সমস্যা বড়ো সমস্যা হয়েই আছে।
ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তর ভারতের কৃষক পরিবার থেকে প্রতি বছরই বেশ কিছু তরুণ সেনাবাহিনীতে কাজ পেতেন, ১০ বছর কাজের পর যাতে পেনসনও পাওয়া যেত, অগ্নিবীর প্রকল্প করে এখন সেসব বন্ধ হয়েছে। ম্যানুফ্যাকচারিং-এ নতুন কোনও কাজ আসছে না। বরং পুরোনো শ্রমজীবীরা ছাঁটাই হচ্ছেন। সরকারি কোনও ভারী উদ্যোগ নেই যাতে হাজার তরুণ একসঙ্গে কাজে ঢুকতে পারেন। স্বউদ্যোগে ছোটোখাটো যা জীবিকা তাতে গড় আয় মাসে ১৩,৫০০ টাকার বেশি নয়। এই অবস্থায় উত্তর ভারত জুড়ে ব্যাপক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। সঙ্গে জুটেছে আর এক সমস্যা— প্রাক-মোদী ভারতে যেটির চাপ এত প্রবল ছিল না। যে কৃষক ২২৭৫ টাকার এমএসপি পাচ্ছেন, তার গ্রামেই তার চেনাশোনা পরিবারে লক্ষ লক্ষ টাকা লেনদেন হচ্ছে। আর্থিক অবস্থা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কীসের টাকা, কোথা থেকে আসছে সে টাকা– এসব প্রশ্নের জবাব নেই। এলাকায় বাড়ছে আর্থিক অসাম্য যেটা তীব্রতর হয়ে সামাজিক অসাম্যে পরিণত হচ্ছে। এই অর্থবানেরা মাথায় তিলক কেটে রাম লালার শোভাযাত্রা বের করছেন, অনুরাগ ঠাকুরের কাছে দাঙ্গার দীক্ষা নিচ্ছেন এবং মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়– এই ধরতাই তুলে অর্থদম্ভের এক প্রবল প্রকাশ ঘটাচ্ছেন।
সমাজ যখন এই ভাবে ভাগ হয়, শাসকের কাছে সেটা অশনি সঙ্কেত নিয়ে আসে। নিজের টোলা বা এলাকায় অর্থদম্ভের সঙ্গে মোদীর রাজনীতির মেলবন্ধন এমএসপি বঞ্চিত কৃষকেরা কাছে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাকে জাতের ধুয়ো তুলে, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন করে বেশি সময় ধরে রাখা যায় না। তার নিজের জীবনযাপন তাকে শেখায় মোদীহীন ভারত সম্ভবত তাকে এক সুদিনের মুখ দেখাবে। এই মানুষেরা যাঁরা ভেবেছিলেন ৪৫ টাকা লিটারে জ্বালানি তেল পাওয়া যাবে, ডলার ৪০ টাকায় নামবে, প্রতিটি ভারতবাসী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে টাকা পাবেন যে টাকা আবার সরকারের বাজেয়াপ্ত করা টাকার অংশ, যারা ভেবেছিলেন বাড়ির জোয়ান ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকরি পাবে, যারা ভেবেছিলেন আরও বড়ো বড়ো কারখানা গড়ে মোদী প্রতি ঘরে বেকার যুবক যুবতীদের চাকরি দেবেন, যারা ভেবেছিলেন দিনের শেষে নিরাপত্তা দেবে মোদীর রাষ্ট্র যাতে তাঁরা সন্ধেবেলায় নির্বিঘ্নে তুলসীদাসী রামায়ণ পড়ে সময় কাটাতে পারেন, উত্তর ভারতের সেই অগণিত সাধারণ মানুষ মোদীর বিজেপির সরকার কর্তৃক প্রতারিত হয়েছেন। হরিয়ানার শম্ভূ সীমানায় এই মানুষদেরই কাতার ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। রাম লালা কোনও ভাবেই মানুষের এই দীর্ঘ ব্যারিকেড অতিক্রম করতে পারছে না।
ছায়া পূর্বগামিনী। ইতিহাস যে রাষ্ট্র নেতাদের বাতিল হিসাবে ঘোষণা করে, মোদীর আশঙ্কা, অতি দ্রুত সেখানেই তার স্থান হবে। যা কিছু তিনি করছেন সবকিছুরই উৎসে আছে এই আশঙ্কা।
প্রকাশের তারিখ: ২৫-ফেব্রুয়ারি-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
