সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মোদীর ফেক গ্যারান্টি
টিম মার্কসবাদী পথ
দশ বছর আগে মধ্যপ্রদেশের ভানুপ্রতাপপুরে নির্বাচনী সভায় ‘মোদীর গ্যারান্টি’ ছিল ক্ষমতায় আসার একশো দিনের মধ্যে এক ঝটকায় বিদেশে সঞ্চিত সমস্ত কালো টাকা উদ্ধার করবেন। যে পরিমাণ কালো টাকা বিদেশে জমা আছে, তা উদ্ধার করার পর দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে ১৫ লক্ষ টাকা। এখন নিতীন গড়করি, অমিত শাহরা কী বলছেন? গড়করির অকপট ভাষ্য, ‘আমরা তো নিশ্চিত ছিলাম, আমরা আসব না। তাই কয়েকজন বলল বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিতে। এখন ওসব শুনলে আমরা হেসে এড়িয়ে যাই।’ অমিত শাহ বলেছেন, ‘ওইসব ভোট প্রচারে নিছক জুমলা!’ এটাই মোদির আসল গ্যারান্টি।

পাঁচ বছরে ভারতীয় অর্থনীতি ছুঁয়ে ফেলবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা!
এবছরের আগস্টে, জোহানেসবার্গে ব্রিকসের শীর্ষ বৈঠকে দাবি করেছিলেন মোদী। এক ট্রিলিয়ন মানে এক লক্ষ কোটি। একের পাশে বারোটা শূন্য। কোনও সন্দেহ নেই, আরও একটি বড় জুমলা! ঘটনাচক্রে, ২০১৯ সালে এই ব্রিকসের বৈঠকে এই একই দাবি করেছিলেন তিনি: পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতি পৌঁছবে পাঁচ লক্ষ কোটি ডলারে। সেই হিসাবে মোদীর দেওয়া সময়সীমা শেষ হচ্ছে ২০২৪ সালে! অথচ, ডলারের অঙ্কে এই মুহূর্তে ভারতীয় অর্থনীতি ৩.৭৩ লক্ষ কোটি। লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও নেই।
তিন, পাঁচ ছাড়িয়ে ভোটের মুখে এখন সাত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থব্যবস্থা হয়ে ওঠার খোয়াবনামা!
পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি! অথচ, মাথাপিছু আয়ে ১৯৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪২। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে একেবারে নিচে। যে ব্রিটেনকে সরিয়ে পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি, তার মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে ১৯ গুণ বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩১ গুণ, জার্মানিতে ২০ গুণ, অস্ট্রেলিয়াতে ২৪ গুণ, জাপানে ১৩ গুণ, চীনে ৫ গুণ, ব্রাজিলে ৪ গুণ। এমনকি অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, লেবানন, বাংলাদেশ, ভুটানের মতো দেশ পর্যন্ত ভারতের চেয়ে এগিয়ে! (২০২৩ সালের জন্য আইএমএফের তথ্য)।
বিশ্বব্যাঙ্কের সংজ্ঞা মেনে ‘উন্নত দেশের’ ক্লাবে ঢুকতে হলে সেই দেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় হতে হবে ১৩,২০৫ ডলার। ভারতের কত? মেরেকেটে ২৬১২ ডলার। মানে মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে অন্তত পাঁচ-গুণ!
ভারতের জিডিপি-র স্ফীতি যে নেহাত জনবাহুল্যের কারণে, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতযশে নয়, সে কথা কে বলবে!
মোদী কি গ্যারান্টি! ভোটের ময়দানে মোদীর গ্যারান্টি-কে নতুন ব্র্যান্ড বানিয়েছে গেরুয়া শিবির। এমনকি ‘গ্যারান্টির গ্যারান্টি’ দিয়ে চলেছেন ‘গ্যারান্টার’ মোদী নিজেও। লোকসভা নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই জোরদার হচ্ছে এই প্রচার। নিজেকে ‘মসিহা’ হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা।
গত দশ বছরের কোনও হিসেব নেই। প্রচারে এখন তেইশ বছর পরের স্বপ্ন! অধিকাংশ মিডিয়াই মোদীতে মন্ত্রমুগ্ধ। ভয়ে অথবা ভক্তিতে। তিনি সর্বত্র, সর্বব্যাপী। পত্রিকার প্রচ্ছদে, বিলবোর্ডে, চ্যানেলে। বিমানবন্দর থেকে রেল স্টেশনের থ্রি-ডি সেলফি বুথে। তিনি সর্বদর্শী, সর্বজ্ঞ। তিনি বাস্তব, পরাবাস্তব। আবার অবাস্তবও বটে। কে কীভাবে দেখছেন, নির্ভর করছে তাঁর ওপর। তবে তাঁকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই। এদেশে থাকলে তাঁর হাত থেকে নিস্তার নেই।
একদিকে নিজেকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছেন বিগ্রহের পর্যায়ে। তিনি এখন একইসঙ্গে ঈশ্বর এবং জনগণের বেছে নেওয়া একজন প্রতিনিধি। যিনি রাম, তিনিই প্রধানমন্ত্রী। সবার ঊর্ধ্বে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা এবং রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায় যেমন বলেছেন, ‘মোদী নিজেই বিষ্ণুর একাদশতম অবতার!’ আর মোদী নিজে বলেছেন, ‘ঈশ্বর আমাকে এই অনুষ্ঠানে ভারতের সমস্ত জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে বলেছেন।’ যেন ঈশ্বরের প্রেরিত দূত! হিন্দুত্বের ধাঁচে এটিই হলো শাসন করার ঐশ্বরিক অধিকার!
অন্যদিকে, ডিমোলিশন ম্যান থেকে ডেভেলপমেন্ট ম্যান। মওত কা সওদাগর থেকে উন্নয়নের ভগীরথ। বিকশিত ভারতের বিকাশ পুরুষ।
স্বাভাবিক। বর্তমানের অন্ধকারকে ঢাকতে ভবিষ্যতের সোনালি সম্ভাবনার খোয়াব ফিরি করার পরিচিত কৌশল। যার সাফল্য পরীক্ষিত। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, ভবিষ্যতে পৌঁছনোর পর গ্যারান্টি মিলিয়ে দেখার কথা কারও বিশেষ মনে থাকে না।
মোদীর গ্যারান্টি ‘তৃতীয়বারের মেয়াদ মানে, ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।’ অন্যদিকে, ছত্তিশগড়ের নির্বাচনী সভা থেকে ‘আরও পাঁচ বছর দেশের ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার’ ঘোষণা। তাঁর কথায়, ‘মোদীর গ্যারান্টি ভারতের জনগণের জন্য’।
যদি ধরেও নেওয়া যায় ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে, তবে তা কার জন্য? কার জন্য ‘অমৃত কাল’! কার জন্য ‘আচ্ছে দিন’? কার জন্য ‘বিকশিত ভারত’? একদিকে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবে, অন্যদিকে ৮০ কোটি গরিব-ও থাকবে!
গত দশ বছরে অন্তত ১৪২টি প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন মোদী (দ্য অয়্যার)। প্রতিটি নতুন ঘোষণার এক এবং একমাত্র লক্ষ্য ছিল মোদীর নিজস্ব ভাবমূর্তি নির্মাণ। এইসব প্রকল্পের হয়নি কোনও পর্যালোচনা। কিংবা খতিয়ে দেখার কাজ। নেই কোনও বিশ্বাসযোগ্য যথার্থ তথ্য। যেমন শুধু ২০১৫ এবং ২০১৬-তেই লোগো-সহ ৪০টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। কুড়িটি এমন প্রকল্প রয়েছে, যার শুরুতে রয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী’-র তকমা। যেমন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা। আবার এমন বেশকিছু প্রকল্প রয়েছে, যার শুরুতে রয়েছে ‘অমৃত’। যেমন অমৃতকাল, অমৃত ভারত ট্রেন।
গত নভেম্বরে শুরু হয়েছিল বিকশিত ভারত সংকল্প যাত্রা। লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। রথের মতো সাজানো একটি ভ্যান। মোদীর ছবি ছাড়াও তাতে ছিল কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্পের পোস্টার। সঙ্গে একটি বড়-মাপের এলইডি টিভি। তাতে সারাক্ষণ চলছে প্রচারের ভিডিও। সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা। যখন প্রকল্পটি শুরু হয়, তখন বলা হয় দেড় হাজার এমন গাড়ি ২৫ জানুয়ারির মধ্যে চষে বেড়াবে দেশের ২ লক্ষ ৬০ হাজার গ্রাম পঞ্চায়েতে, সঙ্গে চার হাজারের বেশি পৌরসভায়। মাঝপথে হটাৎই মোদী নিজেই এই সরকারি প্রকল্পের নতুন নামকরণ করেন: ‘মোদী কি গ্যারান্টি ভেহিক্যাল’! মুহূর্তে পুরোপুরি বদলে যায় প্রচারের কর্মসূচি। ‘ভারত সরকার’ তুলে দিয়ে ভ্যানে লেখা হয় ‘মোদী সরকার’! সঙ্গে পদ্মের প্রতীক। আর এভাবেই সরকারি অর্থে চলেছে ‘মোদীর গ্যারান্টিওয়ালা গাড়ি’।
নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে বেমক্কা বলে চলেছেন ‘মোদী কি গ্যারান্টি মানে, গ্যারান্টি পূরণ হওয়ার গ্যারান্টি’!
কখনও বিজেপি-র সদরদপ্তরে সুর চড়িয়ে বলছেন, ‘যেখান থেকে অন্যদের গ্যারান্টি শেষ, সেখান থেকে মোদীর গ্যারান্টির শুরু।’ আবার কখনও অযোধ্যার মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে তুলে ধরেছেন দেশের ‘গ্যারান্টার’ হিসেবে, বলেছেন ‘গ্যারান্টির গ্যারান্টি’! কখনও বারাণসীতে বলছেন, ‘মোদীর গ্যারান্টি এখন সুপারহিট’। আবার কখনও বিকশিত ভারত সংকল্প যাত্রা নিয়ে আলাপাচারিতায় বলেছেন, ‘আমার কাছে প্রতিটি গরিব ভিআইপি। প্রতিটি কৃষক, যুবা, মা-বোন ভিআইপি। আজ সবাই জেনে গিয়েছেন মোদীর গ্যারান্টির দম আছে।’ যেমন ত্রিশূরে ১৯-মিনিটের ভাষণে ‘মোদীর গ্যারান্টি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন ১৮-বার!
কেন? মোদী বিলক্ষণ জানেন তাঁর অতীতে দেওয়া গ্যারান্টির কী হাল আজ! তাঁর ব্যর্থ প্রকল্পগুলির ভূত আজ তাঁকে দিনরাত তাড়া করে ফিরছে।
দশবছর আগে নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল কৃষকদের জন্য ফসলের দেড়গুণ দাম। দু’বছর বাদে ২০১৬’র ২৮ ফেব্রুয়ারির বাজেট ঘোষণার আগে একধাপ এগিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ২০২২ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে তিনি কৃষকদের ‘আয় দ্বিগুণ করে দেবেন’। এবার ভোটের মুখে প্রয়াত বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথনকে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মোদী। কিন্তু ফসলের দেড়গুণ দাম নিয়ে স্বামীনাথনের সুপারিশ আজও কার্যকর করেননি। দশবছরেও না। অথচ, স্বামীনাথন কমিশন স্পষ্টভাবে বলেছে, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাওয়া কৃষকের আইনি অধিকার। বাড়ছে চাষের খরচ। কমছে ফসলের দাম। পরিণতি কৃষক আত্মহত্যা। ২০২২ সালে সরকারি হিসেবে কৃষক-খেতমজুরের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১১,২৯০ জন। প্রতিদিনে ৩০ জন কৃষকের আত্মহত্যা!
কৃষকরা তাই আবার রাজপথে নেমে আসেন। ছিল দিল্লি চলো’র ডাক। তড়িঘড়ি দু’টি বড় স্টেডিয়ামে হরিয়ানা সরকার অস্থায়ী জেল তৈরি করে। পাঞ্জাব এবং হরিয়ানার মাঝে শম্ভু সীমানায় প্রতিবাদী কৃষকদের রুখতে ব্যবহার করা হয় কাঁদানে গ্যাসের সেল। কৃষকদের রুখতে হাতিয়ার ছিল ড্রোন। আকাশ থেকে নেেম এসেছে কাঁদানে গ্যাস। বন্ধ ইন্টারনেট পরিষেবা। কৃষকদের মিছিল নিয়ে সতর্ক ছিল দিল্লিও। রাজধানীতে একমাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি হয়। সীমানা অবরুদ্ধ। পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমানা-সহ দিল্লিতে ঢোকার সমস্ত প্রবেশপথে বসে ব্যারিকেড। সীমান্তে জায়গায় জায়গায় কংক্রিটের দেওয়াল। কাঁটাতারের বেড়া। পেরেকের পাটাতন। সঙ্গে বিশাল পুলিশবাহিনী।
কৃষকের পথে পেরেক-কাঁটা বিছানো ‘অমৃতকাল’! দেশের অন্নদাতারা যেন ‘সন্ত্রাসবাদী’!
দশ বছর আগে নির্বাচনী সভায় ‘বছরে ২ কোটি কাজ দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদী। অথচ, গত এক দশকে কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেরানো যুবকরা দেখতে পাননি ‘মোদীর গ্যারান্টির দম’! বরং, কাজের বাজারে এখন আরও ভয়াবহ চেহারা। জিডিপি বৃদ্ধিতে বাড়েনি কর্মসংস্থান। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই)-র সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে, গত অক্টোবরে বেকারত্বের হার ছিল ১০.০৫ শতাংশ, গত একুশ মাসে সর্বোচ্চ। যেখানে তরুণদের মধ্যে এই হার ছিল ২৩.২২ শতাংশ। এক দশক আগে চালু হয়েছে বামপন্থীদের সমর্থনে ইউপিএ সরকারের আনা গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন। রোজগারের গ্যারান্টি। আজ কী অবস্থা? গতব ছর রেগার ষাট হাজার কোটি টাকার বাজেটের ৯৩ শতাংশই খরচ হয়ে গিয়েছে প্রথম ছ’মাসে! গ্রামে কাজের চাহিদা ঠিক কতটা, শিল্পের কী করুণ চেহারা, তা এতেই স্পষ্ট। একইসঙ্গে প্রকট কতটা ছাঁটাই করা হয়েছে রেগার বাজেট!
দশ বছর আগে মধ্যপ্রদেশের ভানুপ্রতাপপুরে নির্বাচনী সভায় ‘মোদীর গ্যারান্টি’ ছিল ক্ষমতায় আসার একশো দিনের মধ্যে এক ঝটকায় বিদেশে সঞ্চিত সমস্ত কালো টাকা উদ্ধার করবেন। শুধু তাই নয়, যে পরিমাণ কালো টাকা বিদেশে জমা আছে, তা উদ্ধার করার পর দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে ১৫ লক্ষ টাকা। ‘প্রতিটি গরিব, কৃষক, যুবা, মা-বোন’, যারা মোদীর কাছে ‘ভিআইপি’– তাঁরা এখন কী দেখেছেন? বিজয় মালিয়া, নীরব মোদী, ললিত মোদী, মেহুল চোক্সীরা সরকারের ‘সদাজাগ্রত চোখ’ এড়িয়ে নিরাপদে দেশ ছেড়ে পালিয়ে নিশ্চিন্তে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। নিতীন গড়করি, অমিত শাহরা কী বলছেন? গড়করির অকপট ভাষ্য, ‘আমরা তো নিশ্চিত ছিলাম, আমরা আসব না। তাই কয়েকজন বললো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিতে। এখন ওসব শুনলে আমরা হেসে এড়িয়ে যাই।’ অমিত শাহ বলেছেন, ‘ওইসব, ভোট প্রচারে নিছক জুমলা!’
মোদীর ‘গরিব, কৃষক, যুবা, মা-বোন’রা দেখেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ‘ভিআইপি’ আসলে আদানি-আম্বানিরা।
ধনী দেশ, গরিব মানুষ! বিশ্ব ক্ষুধা সূচক-এ মোদীর ‘রামরাজ্য’ আরও তলানিতে। চার-ধাপ নেমে ১২৫টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান এখন ১১১। এক ক্ষুধার সাধারণতন্ত্র! বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি কাম্বোডিয়ার অবস্থাও ভারতের চেয়ে ভালো। সরল অর্থে, বিশ্বের অন্যতম ‘ধনী’ দেশে জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশের কাছে পুষ্টির মতো মৌলিক অধিকারটিও অধরা। অক্সফামের রিপোর্টে অসহায় আর্তনাদ। ধনীশ্রেষ্ঠ ১ শতাংশের হাতে দেশের ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ, যেখানে আয়ের দিক থেকে নিচের দিকে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র ৩ শতাংশ!
পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি! অথচ, ইউনিসেফের হিসেবে শিশু-অপুষ্টিতে শীর্ষে ভারত! আজও ভারতে তিন-জন শিশুর মধ্যে অন্তত একজন অপুষ্টির শিকার। এখনও দু’বছর বয়স হয়নি, অথচ দিনভর অভুক্ত আছে, ভারতে এমন শিশুর সংখ্যা ঊনষাট লক্ষ। ২০২১ সালের গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট বলছে, সদ্যোজাতের ওজনের ঘাটতি, শিশু অপুষ্টি, মায়ের মৃত্যুহার, রক্তাল্পতা– প্রতিটি নিরিখেই পিছিয়েছে ভারত।
সেপ্টেম্বর, ২০১৪: জাঁক করে মুম্বাই-আমেদাবাদ বুলেট ট্রেনের কথা ঘোষণা করেছিলেন মোদী। তিন বছর বাদে ভূমিপূজা হয়েছিল ২০১৭’র ১৪ সেপ্টেম্বর। বহু টালবাহানার পর প্রকল্প শেষের দিন চূড়ান্ত হয় ২০২২’র ১৫ আগস্ট। তারপর আরেকটা স্বাধীনতা দিবস চলে গিয়েছে। এখনও হয়নি। প্রকল্পের স্টেটাস রিপোর্ট কী? মোদীর ‘গ্যারান্টির গ্যারান্টি’ উড়িয়ে তাঁর রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রকল্পের চার ভাগের মধ্যে মাত্র একভাগ কাজ হয়েছে। শেষ হতে লাগবে আরও চার বছর। ২০২৭। মানে তেরো বছর লেট। এই সময়ে প্রকল্পের খরচ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ! ১.০৮ লক্ষ কোটি টাকা থেকে হয়েছে ২ লক্ষ কোটি টাকা।
ফেব্রুয়ারি, ২০১৬: ‘মোদীর গ্যারান্টি’ ছিল ২০২২ সালের মধ্যে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করবেন। আট-বছর পর কেউ আর এনিয়ে কোনও কথা বলছেন না। মোদীর গ্যারান্টি শুরুতেই শেষ!
এপ্রিল, ২০১৮: মোদী ঘোষণা করেছিলেন, সমস্ত গ্রামে বিদ্যুতের কথা। ১০০ শতাংশ গ্রামীন বিদ্যুতায়ন! ফোর্বস দেখিয়েছে মোদীর ‘গ্যারান্টি পূরণ’ আসলেই অসত্য। ৩ কোটি ১০ লক্ষ বাড়ি এখনও অন্ধকারে! ইন্ডিয়া টুডে বলেছে, মোদীর দাবি মোটেই ঠিক নয়।
আগস্ট, ২০১৮: স্বাধীনতা দিবসে মোদীর গ্যারান্টি ছিল এবার দেশজ যানেই মহাকাশ পাড়ি দেবে কোনও ভারত-সন্তান। ‘২০২২ সালে, ভারত যখন পঁচাত্তরতম দিবস উদযাপন করবে, যদি সম্ভব হয় তাহলে তারও আগে, কোনও এক ভারতীয় মেয়ে কিংবা ছেলে জাতীয় পতাকা নিয়ে গঙ্গাযানে চেপে মহাকাশের পথে পাড়ি দেবে।’ ২০২২ কবেই পেরিয়েছে। আজও পূরণ হয়নি মোদীর গ্যারান্টি।
ন’বছর মনে পড়েনি। শেষে এসে আচমকা সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাস। যথারীতি কৃতিত্ব দাবি, ‘প্রতিশ্রুতি পূরণের গ্যারান্টি হলো মোদী!’ কিন্তু কবে থেকে এই আসন সংরক্ষণ চালু হবে, মেলেনি তার কোনও উত্তর। এই লোকসভা নির্বাচনে তো নয়ই। পাঁচ বছর পরের নির্বাচনেও নয়। কারণ মুলতবি-থাকা জনগণনা সম্পূর্ণ না হলে এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলির পুনর্বিন্যাস না হলে আইনটি কার্যকর হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। বোঝাই যাচ্ছে এক সুদীর্ঘ সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। অথচ, মোদীর মুখে ফাঁপা বুলি!
মোদীর গ্যারান্টি মানে প্রতিশ্রুতি না-পূরণের গ্যারান্টি।
–সম্পাদকীয়, মার্কসবাদী পথ, ফেব্রুয়ারি সংখ্যা
প্রকাশের তারিখ: ০২-এপ্রিল-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
