সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অন্তহীন যুদ্ধ
তারিক আলি
১৯৪৭ সালে যে ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল তার অবসান এখনও হয়নি। পঞ্চাশ ও ষাট দশকের সোস্যাল ডেমোক্রাট বেন গুরিয়ন এবং গোল্ডা মেয়ার বা আজকের চরম দক্ষিণপন্থী নেতানিয়াহু মন্ত্রীসভার মতো তাদের নেতৃবৃন্দ কখনোই নিজেদের মূল লক্ষ্যকে গোপন রাখেনি, যার নাম ‘এরেটজ ইজরায়েল’ বা ইহুদিস্তান। ২০২৩ সাল থেকেই তাদের একমাত্র লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে, প্যালেস্তাইন দাবিকে চিরতরে নিকেশ করে দেওয়া। বাইডেন, ট্রাম্পের সহায়তা এবং ব্রিটেনকে সম্মুখসারিতে রেখে বেশিরভাগ ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলির সমর্থন সত্ত্বেও এই লক্ষ্যপূরণ হয়নি।

বৈভব ও দাপটের প্রতিচ্ছবি ইজিপ্টের পর্যটন নগরী শার্ম-আল-শেখে ট্রাম্প যে হাস্যকর সমাবেশটির আয়োজন করেছিলেন সেখানে একমাত্র বাদ পড়েছিল রোম সম্রাট নিরোর গায়ের চাদরটাই। নিরোর ভূমিকায় নেমে কর্তব্যনিষ্ঠ হয়ে তিনি উদ্যাপন করেছেন ‘মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির’। কোন ‘শান্তি’? ওইদিন এর আগে জেরুজালেমে নেসেটে (ইজরায়েলের সংসদ) উল্লাসরত বর্বর সহযোগী ও দাতাদের সামনে ভাষণ দিতে গিয়ে নিরো ‘বিজয়’ ঘোষণা করেছিলেন।
বিশ্বের সেরা সমরাস্ত্র আমরাই তৈরি করি এবং সেগুলো আমাদের প্রচুর রয়েছে। অনেক অস্ত্র আমরা ইজরায়েলকে দিয়েছি।। সত্যি কথা বলতে কি, বিবি (নেতানিয়াহু) আমাকে এতবার ফোন করেছে!! ‘আমাদেরকে এই অস্ত্রটা দিতে পারো? আর ওটা? এবং সেটা?’ এর অনেকগুলোর নামই আমি কখনো শুনিনি, বিবি। আমি তৈরি করিয়েছি। (হাসির রোল) আমরা এখানে সেগুলো দিয়েছি, দিইনি কি? সেগুলো সেরা অস্ত্র। এক কথায় শ্রেষ্ঠ। আপনারা সেগুলো দারুণ ব্যবহার করেছেন। এগুলো ব্যবহার করতে সে রকম মানুষও চাই এবং নিঃসন্দেহে আপনারা সেগুলো চমৎকার ব্যবহার করেছেন।
‘কী অনবদ্য! কী অনবদ্য কাজটাই না আপনারা করেছেন’। নিরোর বিস্ময়ের যেন শেষ নেই। ‘এই সামান্য কয়েকটি কারণের জন্যে আমি নিজেকে অদ্যাবধি কালের ইজরায়েলের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গর্ববোধ করি’। শেষ নির্ঘোষটি উচ্চারিত হওয়ার আগে দর্শক গ্যালারিতে বসা মিরিয়াম অ্যাডেলসনকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমি ঠিক বলিনি, মিরিয়াম?’ নিরো স্মৃতিচারণ করলেন:
মিরিয়াম আর শেলডন আমার অফিসে (ওভাল) আসতেন… আমার মনে হয় অন্যদের তুলনায় ওরাই সবচেয়ে বেশিবার হোয়াইট হাউসে এসেছে… তাকিয়ে দেখুন কেমন নিরীহ মুখ করে বসে আছে… ব্যাঙ্কে ওর ৬০ বিলিয়ন ডলার রয়েছে। ৬০ বিলিয়ন!! (হাসির রোল) আমার মনে হচ্ছে ও বোধহয় বলেছিল, ‘আর প্রয়োজন নেই’! সে ইজরায়েলকে ভালোবাসে…. ওর স্বামী অবশ্য খুবই আগ্রাসী ব্যক্তিত্বের, তবে আমার ভালো লেগেছিল… আমাকে খুবই সমর্থন করে। আমাকে প্রায়ই কল করে বলত, ‘একবার দেখা করতে আসতে পারি কি?’ আমি বলতাম, ‘দেখো, শেলডন, আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি। এগুলো এভাবে হয় না’। তাও সে আসতই। তবে এটা ঠিক, ওদের জন্যেই অনেক কিছু সম্ভব হয়েছে, এমনকী গোলান হাইটস নিয়ে আমাকে ভাবিয়েছেও ওরাই।
তাদের এই ভাবনাচিন্তা এবং অ্যাডেলসনদের অর্থায়নের সঙ্গী শর্তাবলী দেখে তার প্রশ্ন জাগত, মিরিয়ামের প্রাথমিক আনুগত্য কোথায়? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, না ইজরায়েলে? ‘এ নিয়ে আমি ওকে বিরক্তই করতে চাইতাম। একবার জিজ্ঞেসই করেছিলাম, “শোনো, মিরিয়াম, আমি জানি তুমি ইজরায়েলকে ভালোবাসো। কিন্তু কাকে তুমি বেশি ভালোবাসো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র? না, ইজরায়েলকে?” ও উত্তর দিতে অস্বীকার করে। তার মানে সেটা ইজরায়েলই।’
আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মৃতি জোট বা ইন্টারন্যাশনাল হলোকাস্ট রিমেমব্রেন্স অ্যালায়েন্সের (আইএইচআরএ) সংজ্ঞা অনুযায়ী এমন ধরনের প্রশ্নও অ্যান্টিসিমেটিজম বা ইহুদি বিদ্বেষের গোত্রেই পড়বে। অবশ্য ট্রাম্প-মুলুক আমেরিকার বহু বিদ্যায়তনে এর চেয়ে অনেক লঘু প্রশ্নের জন্যেও নিরোর প্রশাসনের রক্তচক্ষু বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। তবে, যা সচরাচর থাকে নিভৃতে তাকেই আরো একবার বেশ উচ্চঃস্বরে বলে দিলেন তিনি। অর্থাৎ গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার অভিযানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলির সমর্থন থেকে কতটা নির্লজ্জ ফায়দা লোটে সে দেশের ইজরায়েল-লবি সেটা নগ্ন হয়ে গেল।
অন্যদিকে, সরকারি অর্থের আদ্যশ্রাদ্ধের মাধ্যমে নেসেটের উদ্যাপন থেকে পঞ্চাশ মাইলের চেয়েও কম দূরত্বে দু’ মিলিয়ন উপবাসী গৃহহারা প্যালেস্তিনীয়রা তখন হন্যে হয়ে খাদ্য, জল ও আশ্রয়ের সন্ধান করছে। কী ঘটছে এখন? ২০জন বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে হামাস এবং ইজরায়েলীরা ২০০০ জনকে। একটা আংশিক স্বস্তি মিলেছে। ভালো খবর। কিন্তু ইজরায়েলীরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের ঔপনিবেশিক দখলদারির অবসান কখনোই হবে না। আনুমানিক ১ লক্ষাধিক মৃত্যু ছাড়াও সেখানে ইজরায়েলের তরফে বিশাল আকারের ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। নিরোর ‘শান্তি চুক্তির’ আগেই গাজা ভূখণ্ডের ১৪০ বর্গ কিলোমিটারের ৮০ শতাংশের দখল নিয়েছে ইজরায়েলের সেনা। আল জাজিরা-র মতে ‘পীত রেখা’-র পেছনে নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও রাফা গভর্নরেটর বেশিরভাগ অঞ্চল, খান ইউনুস গভর্নরেটের অর্ধেকেরও বেশি, গাজা নগরী, বেইট হানুন ও বেইট লাহিয়ার অংশ সহ, তারা এখনও মোট ভূখণ্ডের ৫৮ শতাংশ নিজেদের করায়ত্ত করে রেখেছে। হাজার হাজার প্যালেস্তিনীয় এখনও ইজরায়েলী কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বিনা বিচারে আটক রয়েছে।
এই চুক্তি গাজা নগরীকে কার্যত দ্বিখণ্ডিত করে বিপুল সংখ্যক প্যালেস্তিনীয় জনগনকে তাঁবু-শহরের ঘেরাটোপে থাকতে বাধ্য করেছে। ইজরায়েলী বোমা, গোলা, ড্রোন এবং বুলডোজার নগরীর স্থাপত্য প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। ৮০ শতাংশ ভবন হয় ক্ষতিগ্রস্ত নয়তো গুঁড়িয়ে গেছে, ৯০ শতাংশ বাড়ি ভেঙে পড়েছে এবং ৮০ শতাংশ চাষজমি ছাই হয়ে গেছে। ওই ভূখণ্ডে এখন ১৭ হাজার অনাথ শিশু। রাষ্ট্রসঙ্ঘের অনুমান, বিগত দু’বছরের ঘটনাবলী গাজার মানবোন্নয়নকে অন্তত ৬৯ বছর পিছিয়ে দিয়েছে।
ছ’দিন হয়ে গেল যুদ্ধবিরতির। এখনও প্যালেস্তিনীয়দের খুন ও জখম অব্যাহত রেখেছে ইজরায়েলী সেনা। রাফার পারাপার চৌকি এবং অন্যান্য প্রবেশদ্বারগুলি এখনও ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। বোমা বিধ্বস্ত অঞ্চলে থেকে মৃত ইজরায়েলী পণবন্দিদের শব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে, ইজরায়েল দাবি করছে যে প্যালেস্তিনীয়রা শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করছে এবং ইতিমধ্যেই নেতানিয়াহু সরকার ত্রাণ চলাচলের প্রক্রিয়ায় টুঁটি টিপে ধরতে শুরু করেছে।
এত কিছু করেও ইজরায়েলের যুদ্ধাভিযান সম্পূর্ণ লক্ষ্যপূরণ করতে পারেনি। হামাস ধ্বংস হওয়ার বদলে নতুন উদ্যমে দ্রুতগতিতে সদস্যভুক্তি করছে যা নিকট অতীতে বাইডেনের প্রতিরক্ষা সচিব ব্লিঙ্কেন স্বীকার করেছিলেন। হামাসের এক কর্মকর্তা বর্ণনা করেছেন, শীর্ষ নেতৃত্বের অধিকাংশ নিহত হওয়ার পরও কীভাবে ইজরায়েলে সেনার আক্রমণ ‘নতুন প্রজন্ম’কে প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা দক্ষ হয়ে উঠছে বিস্ফোরণ না-হওয়া মার্কিন ও ইজরায়েলী রকেট, বোমা ও গোলাকে স্ব-উদ্ভাবনী প্রকৌশলে বিস্ফোরকে পরিণত করার মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারে। ট্রাম্প-চুক্তিতে তৃতীয় ধাপে হামাসকে বলা হয়েছে নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করতে, যদিও পিটার বেইনার্ট বলে দিয়েছেন কেন এটা সম্ভব নয়: ‘কারণ দশকের পর দশক ধরে ইসলামী গোষ্ঠীগুলি তাদের বিরোধীপক্ষ ফাতাহ-নেতৃত্বাধীন প্যালেস্তিনীয় কর্তৃপক্ষের এই সমালোচনাই করেছে যে, কেন তারা প্যালেস্তাইনের দখলদারির অবসানের আগে সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ পরিত্যাগ করেছে। রাজনৈতিক সমাধানের কোনো ইঙ্গিত ছাড়াই হামাস সেই নীতিগত অবস্থান এখন পরিত্যাগ করবে এমনটা আশা করার কোনো কারণ নেই’।
১৯৪৭ সালে যে ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল তার অবসান এখনও হয়নি। পঞ্চাশ ও ষাট দশকের সোস্যাল ডেমোক্রাট বেন গুরিয়ন এবং গোল্ডা মেয়ার বা আজকের চরম দক্ষিণপন্থী নেতানিয়াহু মন্ত্রীসভার মতো তাদের নেতৃবৃন্দ কখনোই নিজেদের মূল লক্ষ্যকে গোপন রাখেনি, যার নাম ‘এরেটজ ইজরায়েল’ বা ইহুদিস্তান। ২০২৩ সাল থেকেই তাদের একমাত্র লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে, প্যালেস্তাইন দাবিকে চিরতরে নিকেশ করে দেওয়া। বাইডেন, ট্রাম্পের সহায়তা এবং ব্রিটেনকে সম্মুখসারিতে রেখে বেশিরভাগ ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলির সমর্থন সত্ত্বেও এই লক্ষ্যপূরণ হয়নি।
বিশ্বের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠা অভূতপূর্ব প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের জন্যে বার্তাটি স্পষ্ট। গাজার সমর্থনে ইতালির সাধারণ ধর্মঘট সে দেশের প্রতিবাদী রাজনীতির পুনর্জন্ম দিয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের জনগনের বিপুল অংশ তাদের দুর্বল সরকারের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। ট্রাম্প ও স্টার্মার নিজেদের দেশে স্বৈরাচারী পথ নিচ্ছে। গাজার ভূখণ্ডে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধ একটা গোটা প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলেছে। দুঃখের বিষয়, ওই অঞ্চলে ইজরায়েল তাদের বড় মুরুব্বি মার্কিনীদের প্রধান পেয়াদার ভূমিকা গ্রহণ করে তাদের দুঃস্বপ্নের রাত আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিলেও আরব দুনিয়া এখনও নিদ্রাচ্ছন্ন। আজকের বার্তাটি হল এই: এখান থেকে সরে যেয়ো না। ক্রোধে অবিচল থাকো। ইজরায়েলের দখলদারিতে থাকা প্যালেস্তিনীয় জনগনের জন্যে এটাই আমাদের ন্যূনতম কর্তব্য। ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধ নানা চেহারা নিয়ে ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ এবং ২০২৩ সময়পর্ব ধরে অব্যাহত থেকেছে। এই শেষতম পর্যায়টিও অন্তিম পর্ব নয়। কোনো মাপকাঠিতেই নয়।
অনুবাদ- শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
ঋণ : সাইডকার।
প্রকাশের তারিখ: ২১-অক্টোবর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
