সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
১৯৪২ (প্রথম পর্ব)
ইলিয়া এরেনবুর্গ
নাৎসি বাহিনীর স্তালিনগ্রাদ অভিযানের তিনটি পৃথক দিনের ধারাভাষ্য। সোভিয়েত সাহিত্যিক এবং যুদ্ধোত্তর ইউরোপে শান্তি আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট সংগঠক ইলিয়া এরেনবুর্গের কলমে যা পেয়েছিল এক অভিন্ন রূপ। ইংরেজি অনুবাদ (1942) থেকে বাংলায় তার ভাষান্তর মার্কসবাদী পথ-এ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালের আগস্টে। স্তালিনগ্রাদের ঐতিহাসিক যুদ্ধে হিটলারের সেনাবাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পরে আট দশক অতিক্রান্ত। ফিরে দেখা সেই তিনটি দিন।

২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২
ভলগাপারের এক শহরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা পৃথিবী। স্তালিনগ্রাদের ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বিতীয় মাস। শত্রু তার সৈন্যের সংখ্যা অনবরত বাড়িয়ে চলেছে। এই ইউনিটগুলো রঝেফ বা সিনিয়াভিন থেকে আসছে না, বার্লিন বা চাঁদ থেকেও না। আসছে আটলান্টিকের তীর থেকে। জার্মানদের পাশাপাশি রুমানিয়ান আর ইতালিয়ান ডিভিশনগুলো লড়ছে। রাশিয়া একা এই আক্রমণ সহ্য করছে।
জার্মানদের পক্ষে সৈন্য বা গোলাবারুদের সরবরাহ বাড়ানো সহজ। রুশদের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধার নয়।
আগাছা আর সোমরাজে ভর্তি দগ্ধ স্তেপে ঘেরা স্তালিনগ্রাদ। ধুলোর মেঘে হাওয়ার চাবুক চলে। বেশিদিন হয়নি, লোকে উত্তাপের কষ্ট সয়েছে। এখন রাতগুলো শীতল। শরতের বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।
উট দেখে এশিয়ার কথা মনে পড়ে। ভলগা দুই পৃথিবীর মাঝখানে এক সীমান্তের মতো। ভলগা শুধু রাশিয়ার মধ্য দিয়েই বয়ে যায়নি, প্রতিটি রুশ হৃদয়ের মধ্য দিয়েও তা প্রবাহিত। ভলগা আমাদের ইতিহাসের দোলনা। ভলগা আমাদের দেশের সম্পদ; বহু রুশীয় গানের মর্মকথা। আর ভলগা চলেছে যুদ্ধের মধ্য দিয়েও। রঝেফ–এ এখন যে-লড়াই চলেছে, ভলগার সংযোগস্থল দখল তার লক্ষ্য। ভলগা সেখানে ছোটো নদী, এক ক্ষুদ্র স্রোতোধারার মতো। স্তালিনগ্রাদের কাছে তা প্রায় এক সমুদ্র, দু’কিলোমিটার চওড়া। ফেরি করে পার হতে হয়। সেই যেখানে প্রেমিকেরা নৌকোর দিকে তাকিয়ে থাকত, ছোট্ট ছেলেরা তাদের মাছ ধরার দণ্ড তৈরি করত আর রোদে পোড়া যুবকেরা উজ্জ্বল, সবুজ তরমুজ খালাস করত, সেখানে এখন মেশিনগানের নীড়। দীর্ঘ যন্ত্রণাকাতর এই শহরের নারী আর শিশুরা গুহায় আশ্রয় নিয়েছে।
জার্মানরা স্তালিনগ্রাদের বাইরে বিমানবহরের ব্যাপক সমাবেশ করেছে। স্তালিনগ্রাদ দখলের লড়াইয়ে বিমানবাহিনীর ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সকলেরই জানা। আগস্টের শেষ থেকে আকাশ থেকে শহরের ওপর ভয়ঙ্কর বোমাবর্ষণ চলেছে: দৈনিক দেড় হাজার বিমানহানা। শেষ পনেরো বছর ধরে শহরের কেন্দ্রস্থল গড়ে উঠেছিল। সেখানে চমৎকার সব বাড়ি, শিশুদের হাসপাতাল, লাইব্রেরি আর স্কুল ছিল। জার্মানরা সোভিয়েত ইউনিয়নের এক সুন্দরতম শহরকে ধ্বংস করেছে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে স্তেপ। শিশু এবং বৃদ্ধরা ক্লিষ্টগতিতে পুবদিকে সরে গেছে।
স্তালিনগ্রাদে বাড়ি আর কারখানার দীর্ঘ ঘন সারি। ভলগার বাঁকে পঞ্চাশ কিলোমিটারের বেশি জায়গা জুড়ে বাড়িগুলো রয়েছে। শহরের উপকণ্ঠে এখন লড়াই চলেছে। প্রত্যেক বাড়ির জন্য শুধু নয়, লড়াই চলেছে প্রতি ঘরের জন্যও। কোনো এক তলা জার্মানদের দখলে তো আর এক তলা আমাদের। আজ তিনটে বাড়ি হাতছাড়া হয়েছে, আগামীকাল প্রতি-আক্রমণ হবে। ভয়ঙ্কর এবং রক্তক্ষয়ী লড়াই চলেছে।
আমাদের সৈনিকেরা শহরের উত্তরে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানত এখানেই পঙ্গু, আগুনে পোড়া স্তালিনগ্রাদের ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে যা এখন শুধু সৈনিক আর শহরের রক্ষকদের আশ্রয়স্থল। জার্মানরা এখন এখানেই বিমানহানা কেন্দ্রীভূত করেছে। আমাদের লোকেরা বিরল সাহসিকতা দেখাচ্ছে। বাজেয়াপ্ত জার্মান দলিল থেকে এটা স্পষ্ট যে জার্মানরা পরিকল্পনা করেছিল যে সেপ্টেম্বরের দশ তারিখের মধ্যে তারা স্তালিনগ্রাদের দখল নেবে আর কুড়ি তারিখে অন্য ফ্রণ্টে আক্রমণ শুরু করবে। আজ চব্বিশে সেপ্টেম্বর এবং স্তালিনগ্রাদ শক্তভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
স্তালিনগ্রাদ শ্রমিকদের শহর। আমরা কর্মরত রুশ শ্রমিকদের বীরত্ব দেখেছি। একবছর আগে জার্মানরা যখন লেনিনগ্রাদের দিকে এগোচ্ছিল তখন লেনিনগ্রাদের শ্রমিকরা সেনাবাহিনী গড়ে তোলে যা পরে লালফৌজের ইউনিটে পরিণত হয়। মস্কোতে যখন বিপদ ঘনিয়ে এসেছিল তখন মস্কোর কারখানাগুলো হাজার হাজার হোমগার্ড তৈরি করেছিল। আমি এক হোমগার্ড বাহিনীকে জানি যা সম্প্রতি প্রতিরক্ষাবাহিনী হয়ে উঠেছে। গত শরতে শত্রুর কঠিন চাপের মুখে তুলা-ও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল। তুলা-র বিখ্যাত বন্দুক নির্মাতারা তাদের শহর রক্ষায় যোগ দেয় আর দেখিয়ে দেয় যে তারা শুধু অস্ত্র তৈরি করতেই জানে না, তা ব্যবহার করতেও জানে। আর এখন শ্রমিকদের বাহিনীগুলো স্তালিনগ্রাদের প্রতিরক্ষায় যোগ দিচ্ছে। জার্মান বোমা আর রুশ সাহসিকতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তারা। ওলগা কোভালিওভা নামে চল্লিশ বছরের এক সাহসী রুশ নারী একটা ইস্পাত কারখানা রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। তিনি তাঁর তরুণ বয়স থেকে সেখানে কাজ করতেন। তাঁর কারখানা, শহর এবং দেশকে ভালোবাসতেন তিনি। জার্মানদের বিরুদ্ধে এক বাহিনীর নেতৃত্ব করতে করতে তিনি নিহত হন।
জার্মানরা শহরের রক্ষকদের দৃঢ়তায় বিস্মিত। তারা ‘বলশেভিকদের পাগলামি’ নিয়ে লেখে। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বহুদিন ধরে গড়ে ওঠা এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শহরের প্রতিরোধে ছিল। তারা স্তালিনগ্রাদকে এক ‘দুর্গ’ বলে উল্লেখ করে। আমাদের মিত্ররা একে ‘রুশ ভার্দুন’ বলে। দুঃখের বিষয়, স্তালিনগ্রাদ কোনো দুর্গদ্বারা সুরক্ষিত ছিল না। নারী শ্রমিকরা দ্রুততার সঙ্গে ট্রেঞ্চ খুঁড়েছিলেন আর ব্যারিকেড বানিয়েছিলেন। স্তালিনগ্রাদ কোনো দুর্গ নয়। চিরায়ত সংজ্ঞা অনুযায়ী, এ এক ‘উন্মুক্ত শহর’, রুশ সৈন্যদের সাহস আর আক্রমণকারীদের প্রতি রুশ জনসাধারণের জ্বলন্ত ঘৃণাই শুধু একে ঘিরে রেখেছিল। ভার্দুনের চারপাশে অনেক দুর্গ ছিল, স্তালিনগ্রাদের চারপাশে একটাও ছিল না। কিন্তু স্তালিনগ্রাদের রক্ষকরা ভার্দুনের বীরদের মতোই লড়েছিল। আর একটা কথা: এক রুশ আক্রমণ জার্মান বাহিনীর একাংশকে সরিয়ে নিয়ে ভার্দুনের রক্ষকদের সাহায্য করেছিল। মার্ন আর ভার্দুনের দিনগুলোতে রুশরা দেখিয়েছিল সত্যিকারের মিত্র কাকে বলে। তা সত্ত্বেও আটলান্টিকের ওপার থেকে এক আক্রমণের জন্য স্তালিনগ্রাদের রক্ষকদের প্রতীক্ষা বিফলে যায়। ‘পশ্চিম সীমান্তে সব শান্ত...’।
ভাষান্তর: দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়
–দ্বিতীয় পর্ব আগামীকাল
প্রকাশের তারিখ: ১৬-নভেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
