শ্রম কোড:  দাবি, প্রচার, বাস্তবতা

ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
চারটি শ্রম কোড হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমজীবী জনগণের ওপর দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার একেবারে শয়তানি প্রকল্প। শ্রম কোডগুলির আরও লক্ষ্য হল শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি খর্ব করা। মোদির শাসনের আসল লক্ষ্য হল সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রের ওপর সংগঠিত হামলা নামিয়ে আনা। শ্রম কোড মারফৎ শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হামলা তারই সূচনা মাত্র।  শ্রম আইনকে কোডে আবদ্ধ করে সেই হাতিয়ারের সাহায্যে মোদী ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের ওপর আক্রমণ নামিয়ে এনে এই অধিকারকে নিকেশ করতে চাইছেন। এর পিছনে রয়েছে নিখাদ শ্রেণি প্রতিহিংসার মনোভাব।

এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপWhatsapp logo Vectors & Illustrations for Free Download | Freepikচ্যানেল

প্রধানমন্ত্রী মোদির দাবি: 

‘নতুন শ্রম কোডগুলি ন্যূনতম মজুরিকে সর্বজনীন হিসাবে স্বীকৃতি দেবে এবং সঠিক সময়ে মজুরি পাওয়া নিশ্চিত করবে। শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেয় এই কোডগুলি’। এবং ‘এই সমস্ত সংস্কার আরও উন্নত কাজের পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করবে এবং তারই ফলে অর্থনৈতিক বিকাশের গতি দ্রুততর হবে।’ এই শ্রম সংস্কারগুলি ‘সহজে ব্যবসা করার’ বিষয়টিকে নিশ্চিত করবে’। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রম কোডগুলি পাস করানোর সময় এমনটাই টুইট করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

বাস্তবতা:

বিদ্যমান ২৯টি শ্রম আইনকে বাতিল করে তার জায়গায় আনা হয়েছে চারটি শ্রম কোড। এগুলি হল মজুরি সংক্রান্ত কোড, শিল্প সম্পর্ক বিষয়ক কোড, পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশ বিষয়ক কোড এবং সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোড। বাতিল হওয়া আইনগুলিতে আদতে যে সব অধিকার এবং সুযোগ সুবিধা পাওয়া যেত, এই সব কোডে সেই সব অধিকার ও সুযোগসুবিধাগুলিকে আরও দুর্বল করে ফেলা হয়েছে এবং অনেকগুলিকে স্রেফ বাদ দেওয়া হয়েছে। .

সামগ্রিকভাবে দেখলে, চারটি শ্রম কোড তৈরি করা হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর কার্যত দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এবং এগুলি শোষক মালিক শ্রেণির স্বার্থে কাজ করবে। 

সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া কাজের পরিবেশ, ন্যূনতম মজুরি, কত ঘণ্টা কাজ, এবং সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সংগঠিত করার অধিকার, যৌথ দরকষাকষি করার অধিকার এবং ধর্মঘটের অধিকার ইত্যাদি শ্রমজীবী মানুষের প্রাপ্য সমস্ত বিধিবদ্ধ সুযোগসুবিধাগুলি, সরাসরি এবং পারিপার্শ্বিকতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে, একেবারে ছেঁটে ফেলার জন্যই এই কোডগুলি চালু করা হচ্ছে। 

শ্রম আইন কার্যকর করা হচ্ছে কিনা তা জানার জন্য সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হল পরিদর্শন। সেটাই শ্রম আইনের প্রাণভোমরা। অথচ সেই পরিদর্শন ব্যবস্থাকেই কার্যত তুলে দেওয়া হয়েছে। তার বদলে চালু করা হয়েছে স্ব-শংসাপত্র এবং ওয়েব ভিত্তিক যখন খুশি যেমন খুশি এবং এলোমেলো পরিদর্শনের ব্যবস্থা। শ্রম কোডে শ্রমিকদের স্বার্থবাহী অথচ এখন দুর্বল হয়ে পড়া যেসব ব্যবস্থা তবুও চালু রয়েছে, সেগুলিও একতরফা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এগজিকিউটিভ / আমলাদের হাতে। এই পরিবর্তনগুলি করা যাবে সংসদীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এর মানে, এখানে সংসদীয় আইন প্রণয়ণকারী প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

কাজে নিয়োগ করার নিয়মকানুনগুলিকে একেবার চূড়ান্ত মাত্রায় নমনীয় করে তোলা হয়েছে যাতে নিয়মিত উৎপাদনে বিশাল আকারে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক, ক্যাজুয়াল শ্রমিক, নির্দিষ্ট মেয়াদের কর্মী, শিক্ষানবিশ ইত্যাদি নিয়োগের সুবিধা হয়। বিধিবদ্ধ ন্যূনতম মজুরিরও নীচে ফ্লোর লেভেল মজুরি দেওয়াকে আইনসিদ্ধ করা হয়েছে। ৮ ঘণ্টার কাজের দিনের বিষয়টাকে প্রায় তুলে দিয়ে আরও দীর্ঘ সময়ের কাজের দিন চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসবই করা হয়েছে শ্রমিকদের যাতে আরও তীব্রভাবে শোষণ করা যায় তার স্বার্থে। 

শিল্প সম্পর্ক কোড এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কাজের জায়গায় আর ইউনিয়ন করা না যায়। ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার ব্যাপারটাকে আরও কঠিন করে তোলা হয়েছে, বলা যায় নতুন কোডে ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন পাওয়া কার্যত অসম্ভব। এরই পাশাপাশি রেজিস্ট্রার অফ ট্রেড ইউনিয়নের হাতে খেয়ালখুশি মতো ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।‘ধর্মঘট’ এর সংজ্ঞা  সুপরিকল্পিতভাবে এতটাই প্রসারিত করা হয়েছে যে, তাতে এমনকী যৌথভাবে প্রতিবাদ করাকেও ধর্মঘট হিসাবে বিবেচনা করা যাবে। নতুন কোডে কার্যত যে কোনও ধর্মঘটকেই বেআইনি ঘোষণা করা যাবে বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা যাবে। শ্রমিকদের ওপর, ট্রেড ইউনিয়নের ওপর কিংবা যদি কেউ কোনওভাবে ধর্মঘটকে সমর্থন করেন তাহলে তাঁর ওপরও বিপুল টাকার জরিমানা চাপানো যাবে এবং জেলে বন্দি করে রাখা যাবে।

 পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশ বিষয়ক কোডে (ওএসএইচডব্লিউসি)  পুষিয়ে দেওয়ার মতো উপযুক্ত মজুরি না দিয়েই কাজের সময় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্রমিকদের কাজের জায়গায় যে বিপদগুলি রয়েছে সেগুলির মোকাবিলা করার জন্য আগে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল। এই কোড তার সবগুলিকেই বাতিল করেছে। কাজের জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনা ঠেকানোর ব্যবস্থা —এসব বিষয়ে কোডে নির্দিষ্টভাবে কিছুই বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে ‘উপযুক্ত সরকার’ এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আসলে এ হল কাজের জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে মালিকদের যে দায় থাকে, সেই দায় থেকে তাদের মুক্তি দেওয়ার অজুহাত মাত্র। 

সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোডে কোনও সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের উল্লেখ নেই। অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিপুল সংখ্যক শ্রমিকদের কোনও সুবিধার কথাও উল্লেখ নেই। এখন যে সমস্ত সেক্টর-নির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রকল্প চালু রয়েছে সেগুলির মধ্যে পড়েন বিড়ি শ্রমিক, খনি শ্রমিক, এবং অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রের শ্রমিকেরা। এঁদের জন্য নির্দিষ্ট তহবিলের ব্যবস্থাদিও রয়েছে। সেই সেক্টর-নির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রকল্পগুলি এবং নির্দিষ্ট তহবিলের ব্যবস্থাও খুবই চালাকি করে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই কোড এগজিকিউটিভ/ আমলাদের হাতে এমন ক্ষমতা তুলে দিয়েছে যাতে তারা খেয়ালখুশিমতো পিএফ, ইএসআইয়ের মতো খুবই ভালভাবে কাজ করে চলা সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পগুলিকে দুর্বল করে ফেলতে পারেন। মালিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সব ধরনের প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক আলোচনার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। পিএফ এবং ইএসআই এর তহবিলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত রয়েছে সেগুলো শেয়ার বাজারে ফাটকার কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

এইভাবে চারটি শ্রম কোড হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমজীবী জনগণের ওপর দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার একেবারে শয়তানি প্রকল্প। শ্রম কোডগুলির আরও লক্ষ্য হল শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি খর্ব করা। মোদির শাসনের আসল লক্ষ্য হল সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রের ওপর সংগঠিত হামলা নামিয়ে আনা। শ্রম কোড মারফৎ শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হামলা তারই সূচনা মাত্র।  গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখতে হলে তার অন্যতম পূর্বশর্ত হল ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকলাপ জারি রাখা। শ্রম আইনকে কোডে আবদ্ধ করে সেই হাতিয়ারের সাহায্যে মোদী ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের ওপর আক্রমণ নামিয়ে এনে এই অধিকারকে নিকেশ করতে চাইছেন। এর পিছনে রয়েছে নিখাদ শ্রেণি প্রতিহিংসার মনোভাব। 

২০১৫ সালের পর  ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্সের কোনও বৈঠকই ডাকেনি সরকার। অথচ এটাই হল জাতীয় স্তরের সেই ত্রিপাক্ষিক সংস্থা যার প্রতি বছর বৈঠকে বসার কথা। 

এসেনসিয়াল ডিফেন্স সার্ভিস মেনটেন্যান্স অ্যাক্ট চালু করেছে মোদি সরকার। প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এই অজুহাতে যে কোনও সেক্টরে সাধারণ ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকলাপ নিষিদ্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রিত করার হাতিয়ার হিসাবে এই আইনকে মোদি সরকার ব্যবহার করতে চায়। এই অত্যাচারী ইডিএসএ আইনকে কাজে লাগিয়ে সরকার নিজের হাতে সেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে যার সাহায্যে  তারা যেকোনও সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়নের বিক্ষোভকে, বিশেষ করে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষেত্র যেমন, বিদ্যুৎ, বন্দর, পেট্রোলিয়াম, পরিবহণ, ইস্পাত, কয়লা ইত্যাদি ক্ষেত্রে, ট্রেড ইউনিয়নের বিক্ষোভকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। 

একমাত্র ধারাবাহিকভাবে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলেই শ্রমিক শ্রেণি শ্রম কোডের বিজ্ঞপ্তি জারি করা ও সেগুলি কার্যকর করাকে রুখে দিতে পারে। যদিও মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই শ্রম মন্ত্রক জানিয়েছে যে, সরকার শ্রম কোড সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করতে চায়। 

মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারকে নির্ধারকভাবে পরাস্ত করতেই হবে যাতে শ্রমিক-বিরোধী শ্রম কোডগুলি একেবার ঘটশুদ্ধ বিসর্জন দেওয়ার কাজটা নিশ্চিত করা যায়। মোদীর নেতৃত্বাধীন কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক অশুভ জোটকে পরাস্ত করাটাই নয়া উদারবাদী নীতিসমূহের বিরুদ্ধে জারি থাকা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামগুলিকে আরও জোরদার করার পূর্বশর্ত। মনে রাখতে হবে, শ্রম কোডগুলি নয়া উদারবাদী নীতিসমূহেরই অংশ মাত্র। 

ভাষান্তর : সুচিক্কণ দাস
ঋণ:  সিআইটিইউ সেন্টার

আরো পড়ুন:
স্বাস্থ্য পরিষেবা: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
খাদ্য ও পুষ্টি: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা

কর্মসংস্থান: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
সকলের জন্য বাড়ি: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
সঙ্কটে গণতন্ত্র! পরাস্ত করুন বিজেপিকে!
প্রতিহত করুন হিন্দুত্ব রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা! পরাস্ত করুন বিজেপিকে!
প্রতারিত মেহনতিরা, পরাস্ত করুন বিজেপিকে
প্রতারিত কৃষকেরা, পরাস্ত করুন বিজেপিকে


প্রকাশের তারিখ: ০৭-এপ্রিল-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org