আয় ও মজুরি: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা

ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
মোদীর আমলে কৃষিখাতে সরকারি বরাদ্দ কমেছে। কৃষিকাজে গড় বার্ষিক মজুরিবৃদ্ধির হার ১২.৩ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪.৮ শতাংশ। এমএসপি দাবি করায় আক্রমণের শিকার হয়েছেন কৃষকেরা। ২০১৪- ২০২০র মধ্যে সংগঠিত শিল্প শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি একই জায়গায় আটকে রয়েছে। অক্সফ্যাম ইন্ডিয়া সাপলিমেন্ট ২০২২ রিপোর্ট দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভারতের ৮৪ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে এবং তাঁদের জীবনজীবিকার বিপুল ক্ষতি হয়েছে। এটাই মোদীর আমলের বাস্তবতা।

এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপWhatsapp logo Vectors & Illustrations for Free Download | Freepikচ্যানেল

২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যেহেতু ২০২২ সালে ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি হবে, তাই ওই বছরে ‘কৃষকদের আয় দ্বিগুণ’ (ডিএফআই) করা হবে। ডিএফআই সংক্রান্ত অশোক দালওয়াই কমিটি গঠন করা হয় ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল। তখন দাবি করা হয়েছিল যে, কৃষকদের আয় বেড়ে হবে মাসে ২২,৬১০ টাকা। 

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদী দাবি করলেন, ‘এখন এমন একটা সময় এসেছে যখন সুযোগ-সুবিধা এবং আয় দুটোই বাড়ছে এবং দারিদ্র কমছে।’

বাস্তবতা:

কৃষকদের অবস্থা

এনএসএসও রিপোর্ট (সেপ্টেম্বর ২০২১) অনুযায়ী, কৃষিকাজ থেকে দৈনিক মাথাপিছু গড় আয় মাত্র ২৭ টাকা অর্থাৎ গড় মাসিক আয় ৮১৬ টাকা ৫০ পয়সা মাত্র। 

ভারতে ২০০৪-০৫ সাল থেকে ২০১৩-১৪ সাল পর্যন্ত কৃষিতে গড় বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ১২.৩ শতাংশ। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির এই হার ভয়ঙ্করভাবে কমে হয়েছে ৪.৮ শতাংশ। ফসল কাটা সংক্রান্ত কৃষিকাজে মজুরি বৃদ্ধির হার ১৩.১ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৫.৭ শতাংশ। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল বছরে ১ শতাংশেরও কম। এমনকী কৃষি শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটেছে। 

বাজেটের মোট ব্যয়ের অনুপাতে কৃষিখাতে সরকারি ব্যয় মোদী সরকারের দ্বিতীয় বারের শাসনকালে ধারাবাহিক ভাবে কমেছে।

কৃষক আত্মহত্যা: ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১০০৪৭৪ জন কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং জীবনযাপনের অসহনীয় নিম্নমানের কারণে প্রতি দিন ২০০০এর বেশি কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। 

কৃষকেরা প্রতারিত:

কৃষকদের ঐতিহাসিক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের জেরে মোদী সরকার তিনটি কালা কৃষি আইন খারিজ করতে বাধ্য হয়েছে। এই সংগ্রামে ৭৫০ জনের বেশি কৃষক তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) নিয়ে কৃষকদের যে আশ্বাস মোদি সরকার দিয়েছিল, সে ব্যাপারে সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। যেসব কৃষকেরা আইনি গ্যারান্টিসহ এমএসপি কার্যকর করার দাবি করে আসছিলেন তাঁদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই একজন তরুণ কৃষককে হত্যা করেছে মোদী সরকারের পুলিশ। 

শ্রমিকদের অবস্থা

সংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মজুরি একই জায়গায় আটকে রয়েছে: ২০০৫-২০০৬ থেকে ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে সংগঠিত সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ১০.১ শতাংশ। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যে এই হার ভীষণভাবে কমে হয়েছে ৬.১ শতাংশ। যদি ধরে নেওয়া যায় ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের পর্বে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৫.১ শতাংশ, তাহলেই একথা স্পষ্ট হবে যে মোদী সরকারের শাসনের পুরো পর্ব জুড়েই শিল্প শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কার্যত কিছুই বাড়েনি।  কাজ পাওয়ার ব্যাপারেও চরম অনিশ্চয়তা শ্রমিকদের গড় উপার্জনকে ঠেলে আরও নীচের দিকে নামিয়ে দিয়েছে। 

৮০র দশকে সংগঠিত ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পক্ষেত্রে নীট মূল্য সংযুক্তিতে (নেট ভ্যালু অ্যাডেড) মুনাফার অংশ ছিল ১৮ শতাংশ। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ সালের সময়পর্বে মুনাফার অংশ লাফিয়ে বেড়েছিল গড়ে একেবারে ৪৫.৩ শতাংশ। অন্যদিকে নীট মূল্য সংযুক্তিতে মজুরির অংশ ৮০র দশকে ছিল গড়ে ৩০.৪ শতাংশ। সেটাই ২০১৪-২১ সালের পর্বে  কমে হয়েছিল গড়ে ১৬ শতাংশ। 

অকৃষি কার্যকলাপে এবং শহরের কাজকর্মের সমস্ত ক্ষেত্রে মজুরি কমছে। প্রায় ৪৪ কোটি অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকেরা একেবারে দুঃসহ অবস্থার মধ্যে গিয়ে পড়েছেন। সূত্রধরদের মজুরির হার ওই একই সময়পর্বে ১০.৯ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৫.৫ শতাংশে। সাফাইকর্মীদের ক্ষেত্রে মজুরির হার মোদীর শাসনকালে ১১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৫.৯ শতাংশে! 

২০২২এর জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন মাসের মধ্যে করা পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের (পিএলএপএস) তথ্য অনুযায়ী, ভারতে স্বনিয়োজিত লোকেদের হার, যা ২০১৮-১৯ সালে ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ তা ২০২২-২৩ সালে বেড়ে হয় ৫৭.৩ শতাংশ। এই সব স্বনিয়োজিত লোকের গড় মাথাপিছু আয় ছিল মাসে ১০,০০০ টাকার অনেক কম। ২০২২ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরের মধ্যে স্বনিয়োজিত লোকেদের আয় প্রকৃত অর্থেই কমে গিয়েছিল। অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২২ থেকে জানুয়ারি-মার্চ ২০২৩ সালের সময়পর্বে নিয়মিত/বেতনভুক শ্রমিকদের গড় আয়ও কমে গিয়েছিল।

অনিশ্চিত কাজ: এমনকী নিয়মিত মজুরি পাওয়া এবং বেতনভুক শ্রমিকদের ৬২ শতাংশ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন কোনও রকম লিখিত চুক্তি ছাড়াই। নিয়মিত মজুরি ও বেতন পান এমন শ্রমিকদের ৪৯.২ শতাংশ সবেতন ছুটি পান না। নিয়মিত মজুরি পাওয়া ও বেতনভুক শ্রমিকদের ৫৩ শতাংশই কোনও রকম সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পান না। 

আয় ও মজুরির এই যে অনিশ্চিত অবস্থা তা একজন গড় ভারতীয় নাগরিকের সাধারণ জীবনযাত্রার পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিফলিত হয়। অক্সফ্যাম ইন্ডিয়া সাপলিমেন্ট ২০২২ রিপোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ভারতের ৮৪ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে এবং তাঁদের জীবনজীবিকার বিপুল ক্ষতি হয়েছে। 

ইউএনডিপি (২০২২এর সেপ্টেম্বর) যে মানব উন্নয়ন রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেই রিপোর্ট অনুসারে ভারতে জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশের বেশি (২৭.৯ শতাংশ) তীব্র দারিদ্রের মধ্যে বেঁচে থাকেন। চরম সংখ্যার কথা ধরলে, ভারতে প্রায় ৩০ কোটি লোকের দৈনিক আয় ১৭৮ টাকার কম। 

বাড়ছে ঋণের বোঝা: প্রকৃত মজুরি এবং আয় কমে যাওয়ার এই যে দশা, এর ফলে ঋণের বোঝা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ২০১৮ সালের এনএসএসও রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে পরিবার পিছু গড় ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০ হাজার টাকা এবং শহর এলাকায় পরিবার পিছু গড় ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। নীট পারিবারিক সঞ্চয় যা ২০২১ অর্থবর্ষে ছিল জিডিপির ১১.৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা নেমে আসে জিডিপির ৫.১ শতাশে। এই সংখ্যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর মানে হল আমাদের দেশের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সঞ্চয় হয়ে উঠেছে ঋণাত্মক এবং ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে। এতেই মোদীর জমানায় সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকার সঙ্কট আরও স্পষ্ট চেহারা নিয়ে সামনে এসেছে। 

আত্মঘাতী দিনমজুরেরা: অকৃষিকাজে যুক্ত দিন মজুরদের আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনাও অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৩২০০০। ২০২০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ৩৮ হাজার এবং ২০২১ সালে হয় ৪২ হাজার। এতেই স্পষ্ট হয়ে আমাদের শ্রমিকেরা কী ধরনের দুঃসহ অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। 


মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার মুখে যাই দাবি করুক না কেন, বাস্তবতা আসলে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মোদী সরকার সবেচেয়ে বেশি শ্রমিক-বিরোধী, সব চেয়ে বেশি কৃষক-বিরোধী সরকার। স্বাধীনতার পর এত বেশি শ্রমিক ও কৃষক বিরোধী সরকার ভারত কখনও দেখেনি !

যদি আয় ও মজুরি সত্যিই বাড়াতে হয় তাহলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে হবে। এবং সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে মোদি সরকারকে ক্ষমতা থেকে অবশ্যই সরাতে হবে!


ভাষান্তর : সুচিক্কণ দাস
ঋণ:সিআইটিইউ সেন্টার

আরো পড়ুন:
শ্রম কোড:  দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
স্বাস্থ্য পরিষেবা: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
খাদ্য ও পুষ্টি: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা

কর্মসংস্থান: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
সকলের জন্য বাড়ি: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
সঙ্কটে গণতন্ত্র! পরাস্ত করুন বিজেপিকে!
প্রতিহত করুন হিন্দুত্ব রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা! পরাস্ত করুন বিজেপিকে!
প্রতারিত মেহনতিরা, পরাস্ত করুন বিজেপিকে
প্রতারিত কৃষকেরা, পরাস্ত করুন বিজেপিকে


প্রকাশের তারিখ: ০৮-এপ্রিল-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org