|
স্বাস্থ্য পরিষেবা: দাবি, প্রচার, বাস্তবতাওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ |
শুরুর দিকে মোদি সরকার জনগণের মধ্যে মহামারী সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা গড়ে তোলার বদলে থালা-বাজানো, আলো জ্বালানো-বন্ধ করা ইত্যাদির মতো সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক কাজ-কর্মে জনসাধারণকে উৎসাহিত করেছিল। সরকার কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার আগে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো মজবুত করতে পারেনি। যার ফলে অক্সিজেন ও হাসপাতালে বেডের অভাবে মৃত্যুমুখে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। আমরা এখনও ভুলতে পারিনি সেই দৃশ্যগুলো.. |
এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপ কিন্তু বাস্তবটা ঠিক কেমন? আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা মোদি জমানায় স্বাস্থ্যক্ষেত্র আমূল বদলে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউ.এইচ.ও) ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির ভিত্তিতে রচিত ভারতের বিনামূল্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার স্থান নিচ্ছে স্বাস্থ্য-বীমা নির্ভর পরিষেবা। জনগণের মূল চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারীর ভূমিকায় না থেকে সরকার বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের অর্থদাতার ভূমিকায় নিজেদের পরিবর্তিত করেছে। দেশের দরিদ্র জনগণের জন্যে আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জনআরোগ্য যোজনার প্রকৃত বাস্তবতা এটাই। সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো মজবুত করার পরিবর্তে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি ৬০:৪০ অনুপাতে বীমা কোম্পানিগুলিকে প্রিমিয়াম দিচ্ছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা তথ্য জানার অধিকার আইনের (আরটিআই) মাধ্যমে জানতে পারে যে, এ-খাতে ব্যয়-করা অর্থের দুই-তৃতীয়াংশ গেছে বেসরকারি হাসপাতালে। এটা সবারই জানা, বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির খরচ সরকারি হাসপাতালের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। একই সময়ে, এটাও জানা গেছে যে গ্রামাঞ্চলের ৮৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলের ৮০ শতাংশ মানুষ কোনও স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় আসেন না। স্বাস্থ্য বাজেট জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি-২০১৭ অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে সরকার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.৫ শতাংশ ব্যয় করবে। বাস্তবে, স্বাস্থ্য খাতে মোট সরকারি ব্যয় এখনও ঘোরাফেরা করছে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.৩০ থেকে ১.৪০ শতাংশের কাছাকাছি এবং কেন্দ্রীয় বাজেটে মাত্র ০.৩ শতাংশ-ই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হয়েছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউ.এইচ.ও)-র একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয়দের চিকিৎসার জন্য মোট ব্যয়ের ৫৩ শতাংশই খরচ হয় নিজের পকেট থেকে (যার মধ্যে পরিকাঠামো, যন্ত্রপাতি, ওষুধ, চিকিৎসক ও কর্মীদের বেতন অন্তর্ভুক্ত)! প্রতি বছর চিকিৎসা-খাতে বিপুল ব্যয়ের কারণে আমাদের দেশের ৫.৫ কোটি মানুষকে সুপরিকল্পিতভাবে ঠেলে দেওয়া হয় দারিদ্র্যের প্রান্তে। জনস্বাস্থ্যের পরিকাঠামো দেশে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র (পিএইচসি) এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের (সিএইচসি) সংখ্যা খুবই কম। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে প্রকাশিত গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান (আরএইচএস) ২০২১ থেকে জানা যাচ্ছে, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে (সিএইচসি) চিকিৎসকের ঘাটতি ২০০৫ সালে ছিল ৪৫ শতাংশ। ২০২১ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ৮০ শতাংশ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের ঘাটতি ৭ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গ্রামে বসবাস করলেও মোট স্বাস্থ্যকর্মীর ৩৩ শতাংশ ও মোট চিকিৎসকের ২৭ শতাংশ মাত্র গ্রামাঞ্চলে রয়েছে। জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো মজবুত করার পরিবর্তে সরকার সরকারি-বেসরকারি-অংশীদারিত্ব (পিপিপি)-মডেলের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকে বেসরকারি হাতে তুলে দিতে চলেছে। এটা কি অপরাধ নয়? ২০২২ সালের জুলাই মাসে সরকার লোকসভায় জানায়, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য সুরক্ষা যোজনার আওতায় ২২টি নতুন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস) তৈরি করা হবে। অথচ এখন পর্যন্ত দেশে যে সাতটি মাত্র এইমস পূর্ণাঙ্গরূপে কাজ করছে, যার মধ্যে প্রথমটি ১৯৫৬ সালে দিল্লিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আর বাকি ছয়টি ইউপিএ সরকারের আমলে তৈরি হয়েছিল। ওষুধের দাম বাড়ছে হাথি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি প্রথম জাতীয় ওষুধ নীতির লক্ষ্য ছিল সুলভ মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা। নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির আগমনের সঙ্গী হয়ে সেই নীতি একাধিকবার সংশোধিত হয় এবং আইনকানুনকে করা হয় লঘু। ওষুধের ক্ষেত্রে মোদী সরকার ব্যয় নির্ভর মূল্য নির্ধারণের ধারণাকে বাজার নির্ভর মূল্য নির্ধারণে পরিবর্তিত করেছে। ওষুধের মূল্য স্থির হচ্ছে বাজারের ন্যূনতম ১% নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন উচ্চ মর্যাদার মার্কাওয়ালা ওষুধের গড় মূল্য অনুযায়ী এবং তাদেরকে অবারিতভাবে বছরে ১০% হারে মূল্যবৃদ্ধির অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। উৎপাদন খরচের ওপর কর আরোপ না-করে খুচরো দামের উপর আরোপ করার মাধ্যমে চড়া হারে কর আদায় করা হচ্ছে ওষুধ থেকে। খুচরো মূল্য প্রায়শই উৎপাদন ব্যয়ের ১০০ থেকে ৫০০% বেশি হয়ে থাকে। রাজ্যগুলির বিক্রয় করমুক্ত করার ক্ষমতাকেও বাতিল করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বিপর্যয় শুরুর দিকে মোদি সরকার জনগণের মধ্যে মহামারী সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা গড়ে তোলার বদলে থালা-বাজানো, আলো জ্বালানো-বন্ধ করা ইত্যাদির মতো সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক কাজ-কর্মে জনসাধারণকে উৎসাহিত করেছিল। সরকার কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার আগে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো মজবুত করতে পারেনি। যার ফলে অক্সিজেন ও হাসপাতালে বেডের অভাবে মৃত্যুমুখে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। আমরা এখনও ভুলতে পারিনি সেই দৃশ্যগুলো— হাসপাতালের বাইরে ফুটপাথে পরে আছে মৃতদেহ কিংবা নদীতে ভেসে যাচ্ছে শয়ে শয়ে লাশ। আর সে-কারণেই কোভিডকালে আমাদের দেশে সাতজন নতুন কোটিপতির উত্থান হয়েছে স্বাস্থ্য ও ওষুধ ব্যবসা থেকে। স্বাস্থ্য মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা এবং যে কোনও নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব তার সকল নাগরিকের জন্য সর্বজনীন বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক আঁতাতের প্রতিনিধিত্বকারী মোদি সরকার এ-দায়িত্বকে শুধু যে উপেক্ষাই করেছে তা নয়, বরং লাভজনক ব্যবসা ফাঁদতে সাহায্য করেছে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের। সরকার অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা প্রচার করছে, ভুয়ো দাবি করছে আর মিথ্যা কথা বলে চলেছে। সকলের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবাকে টিকিয়ে রাখতে হলে মোদির নেতৃত্বাধীন এই বিজেপি সরকারকে পরাজিত করতে হবে। আপনার ভোটকে ব্যবহার করুন বিজেপি ও তার সহযোগীদের পরাজিত করতে ও অষ্টাদশ লোকসভায় বামপন্থীদের শক্তিশালী করতে। প্রকাশের তারিখ: ০৬-এপ্রিল-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |