|
কর্মসংস্থান: দাবি, প্রচার, বাস্তবতাওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ |
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে মোট কর্মচারীর সংখ্যা ২০১৩ সালের মার্চ মাসের ১৭.৩ লক্ষ থেকে ২০২২ সালের মার্চ মাসে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১৪.৬ লক্ষ। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩-এর মধ্যে নিযুক্তি হ্রাস পেয়েছে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রায় ১২%, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কে ১৮% এবং কেন্দ্রীয় সরকারি স্তরে ৫%। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে চুক্তিভিত্তিক এবং ঠিকে মজুরের সংখ্যা ২০১৪ থেকে ২০২৩-এ ২০.১% থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৩.৪%। |
প্রতিশ্রুতি: আমরা প্রতি বছর ২ কোটি নতুন চাকরির ব্যবস্থা করব বাস্তবতা ২০১৪ সালে কর্মসংস্থান নিয়ে যে বড়ো ভাষণটি দিয়েছিলেন মোদী প্রতিটি জনসভায় কিংবা রঙবেরঙের প্রচারের পোস্টার আর ফিল্মে যে প্রতিশ্রুতির বন্যা ছুটিয়েছিল বিজেপি, তার মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে বিশ্ব শ্রম সংস্থার প্রকাশিত এই তথ্য। এই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে পূর্ণ কর্মসংস্থানে নিযুক্ত মানুষের যে মোট সংখ্যা ছিল, তা ২০২৪ সালে এসে বাড়েনি। কমে গেছে। ভারতের নগরাঞ্চলে ২০১৬-১৭ সালে যত মানুষ চাকরিতে নিযুক্ত ছিল, তার তুলনায় ২০২২-২৩ সালে চাকরিতে থাকা মানুষের সংখ্যা কমে গেছে ৫০.২ লক্ষ। বছরে ২ কোটি মানুষের যদি সত্যিই কর্মসংস্থান হত, তবে এই সংখ্যাটা এখন ম্যাজিকের মত বেড়ে যেতো। ওই একই সময়পর্বে গ্রামাঞ্চলেও চাকরিতে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে ২০.১ লক্ষ। এর সঙ্গে গড়ে অন্তত ৮০ লক্ষ বা তার চেয়ে বেশি তরুণ প্রতি বছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। ভারতের তরুণদের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা এই মুহূর্তে বেকারত্ব। ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৪ অবধি বেকারত্বের হার ৫% থেকে ৫.৫% শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করেছে। তারপর ২০১৯ সালে বেকারত্বের গড় হার এক লাফে হয়েছে ৭.৪%। ২০২০ সালে আরো বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১০%। ২০২৩ সালে বর্ধিত হারে ৮%-এর আশেপাশেই বিরাজ করছে এই হিসেব। ১৫-২৪ বয়সের ২৮.৯৬ শতাংশ যুবকেরা ২০২১ সালে ছিল কর্মহীন। একইসাথে স্নাতক পর্যায়ের অনধিক ২৫ বছর বয়সের শিক্ষিত যুবকের ৪২% ছিল কর্মহীন। কর্মক্ষম মানুষের ৯০%-এর বেশি মাত্র ‘অনুচ্চ স্নাতকস্তরের শিক্ষায়’ শিক্ষিত। এদের মধ্যে ৬৫%-এর কাজ নেই। ২০২৩ সালে ভারতের মোট কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪.২ কোটি। সরকারি সংজ্ঞা অনুযায়ী, যদি কোনো মানুষ চলতি সপ্তাহের এক ঘন্টার জন্যেও কোনো কাজে নিযুক্ত থাকেন, তবে তাকে কর্মসংস্থান প্রাপ্তদের দলে মান্য করা হবে। কাজেই বেকারত্ব সম্পর্কে সরকারি পরিসংখ্যান দেশের বেকারত্ব ও কর্মহীনতার একটি ডাহা অবমূল্যায়ন। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ‘দেশ কী নওজোয়ানোকো’ (দেশের তরুণদের জন্যে) ‘মোদী কী গ্যারান্টি’ বাস্তবে আরেকটি ‘জুমলা’ হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার কর্মসংস্থানে যুক্ত অথবা কর্মপ্রত্যাশী বেকার এবং ১৫ বছরের অধিক বয়সের মোট কর্মক্ষম জনগনের অনুপাতকে শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার (এলএফপিআর) বলা হয়ে থাকে। ১৯৯১ সালে এটা ছিল ৫৮%-এর চেয়ে বেশি। বিগত দশকে ধারাবাহিকভাবে এর হ্রাস হতে হতে বিগত পাঁচ বছরে প্রবল ধাক্কায় ৭% হ্রাস পেয়েছে। ২০২১ সালে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৪০%-এ। ২০১৭-১৮ সালে এই হার ছিল ৫২.৩৫%, ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২১-২২ সময়পর্বে সেটা দাঁড়িয়েছে ৫৮.৩৫%। গ্রমাঞ্চলের মেয়েরা আগের তুলনায় অনেক বেশি কাজের বাজারে যোগ দিতে চাইছেন, এটাই এই বৃদ্ধির পিছনে একটা বড় কারণ। মোদী সরকারের পরিসংখ্যান বিকৃতি বিষয়ক কুকীর্তির পূর্বদৃষ্টান্ত মাথায় রেখে বলা যায়, এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র ও সরকারি কর্মসংস্থান কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে মোট কর্মচারীর সংখ্যা ২০১৩ সালের মার্চ মাসের ১৭.৩ লক্ষ থেকে ২০২২ সালের মার্চ মাসে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১৪.৬ লক্ষ। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩-এর মধ্যে নিযুক্তি হ্রাস পেয়েছে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রায় ১২%, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কে ১৮% এবং কেন্দ্রীয় সরকারি স্তরে ৫%। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে চুক্তিভিত্তিক এবং ঠিকে মজুরের সংখ্যা ২০১৪ থেকে ২০২৩-এ ২০.১% থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৩.৪%। ঠিকেপ্রথা কোনো ধরনের সংরক্ষণের সুযোগ রাখে না। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগেই ৯.৭৯ লক্ষ শূন্য পদ রয়েছে। কর্মচারি নিযুক্তি আয়োগের বা এসএসি’র নিয়োগের পদের সংখ্যা ২০১৪ সালের ৮০,৬৫০ থেকে এক ধাক্কায় কমে ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৬,৩৪৮। উৎপাদনমুখী শিল্পে কর্মসংস্থান ২০১৬ থেকেই উৎপাদনমুখী শিল্পে শুষ্কতার আরম্ভ এবং সেটা বাড়তে বাড়তে ২০১৬-২০ সময়পর্বে সর্বনিম্ন হয়ে মোট ঘরোয়া উৎপাদনের ১৩%-এ নেমে এসেছে। মোট কর্মসংস্থানের সাপেক্ষেও উৎপাদনমুখী শিল্পের অংশ ২০১২ সালের ১২.৮% থেকে কমে ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ১১.৫%-এ। ২০২২ সালে এটা ২০১২-র মাত্রা ছুঁয়েছে মাত্র। এছাড়া, সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমশক্তির ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের ধরনে আগ্রাসী পরিবর্তনের মাধ্যমে দ্রুত ঠিকাকরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। ভারতের শিল্প শ্রমিকদের জন্যে এই দশকটি নিঃস্বতার দশক হিসেবেই চিহ্নিত হবে। ভারতীয় অর্থনীতির পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা সিএমআইই-র ২০২৩ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদনের অনুযায়ী, ছোট দোকানের ক্ষেত্রে দৈনিক মজুরি শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে ১.০৩ কোটি। বাধা মাইনের শ্রমিকের সংখ্যাও কমেছে ৪৬ লক্ষ। এমজিএনআরইজিএ বা মনরেগা মনরেগার কাজের চাহিদা বৃদ্ধি থেকেই বর্তমান পরিস্থিতির গুরুতর দশাটি বোঝা যাবে। কিন্তু মোদী সরকার ২০২২-এর এপ্রিল থেকে মনরেগার পঞ্জীকৃত তালিকা থেকে ৭.৬ কোটি শ্রমিকের নাম কেটে দিয়েছে। চালু থাকা অবশিষ্ট তালিকা থেকেও এক তৃতীয়াংশ (৮.৯ কোটি) বাদ যাবে আধারভিত্তিক অর্থপ্রদান ব্যবস্থার জন্যে। অনিশ্চিত নিযুক্তি, উন-নিযুক্তি এবং স্বনিযুক্তি কর্মসংস্থানের যে সুযোগ রয়েছে তার বেশিরভাগই অনিশ্চিত, যেমন চুক্তিভিত্তিক, স্থিরমেয়াদের কর্মসংস্থান অথবা শিক্ষানবীশ ইত্যাদি বা স্বনিযুক্তি। স্থায়ী সুরক্ষিত কর্মসংস্থান শোচনীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। নিয়মিত মজুরি বা বাধা মাইনের চাকরির ৪৬.৮%-তে কোনো সবেতন ছুটির সুযোগ নেই যাতে অন্তর্ভুক্ত চিকিৎসা ছুটি ও মাতৃত্বকালীন ছুটিও। নতুন কর্মসংস্থান প্রাপ্ত ১০ জনের মধ্যে ৭ জনই হয় স্বনিযুক্তি অথবা দুর্বল নিযুক্তি বিধির আওতাধীন। ২০২৩ সালে মোট শ্রমশক্তির ৪৬% কৃষিক্ষেত্রে উন-নিযুক্তিতে থাকা শ্রমিক। কোভিড-উত্তর সময়ে নারী শ্রমিকদের ৬০%-ই স্বনিযুক্ত। তাদের অর্ধেকের বেশি বেতনহীন সাংসারিক কাজ বা পারিবারিক খামারে কর্মরত। ফলে, কর্মসংস্থানের আওতায় যাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে, তাদেরও এক বিরাট অংশ নিংস্বতা ও ঋণগ্রস্ততার প্রান্তে পতিত হয়েছে। দরিদ্র শ্রমজীবীর সংখ্যা বিপুল আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি-র এই সরকার এমন একটি নীতি অনুসরণ করে চলেছে যার ফলে শুধুমাত্র আজকের নবীন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাই নয়, ভবিষ্যতের নবীন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকেও বিনষ্ট হয়ে গেছে। এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। ভাষান্তরঃ শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার প্রকাশের তারিখ: ০৩-এপ্রিল-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |