|
সুকান্তগোলাম কুদ্দুস |
১৯৪২ সালের আন্দোলন এলো । তখন সুকান্ত দেশবন্ধু স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য স্কুলের কর্তৃপক্ষ তার উপর মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। সে স্কুল ছেড়ে অন্য স্কুলে গিয়ে সুকান্ত ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলো। কিন্তু সুকান্ত অঙ্কে ফেল করলো । ইতিমধ্যে ঘনিয়ে এসেছে বাঙালীর চরমতম দুর্দিন, অর্থাৎ ১৯৪৩ সালে মহা দুর্ভিক্ষ শুরু হলো। তার বহু আগেই সুকান্তর কবিতা লেখা শুরু হয়ে গেছে। কলকাতার কঠিন রাজপথে দুর্ভিক্ষগ্রস্ত কৃষক তখন মরছে হাজারে-হাজারে। |
প্রতি বৎসর যখনি আমরা কবি সুকান্তর জন্মদিবস পালন করতে সমবেত হই, যখনি আমাদের মনে পড়ে যে-বয়সে অনেকে কাব্য রচনা শুরু পর্যন্ত করে না সেই 'বয়সে সুকান্ত এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে গেছে, তখনি নতুন করে একবার আমাদের মনে বেদনা উপস্থিত হয়। রবীন্দ্রনাথ পূর্ণ দান রেখে গেছেন আমাদের সামনে, তাঁকে হারানোর ব্যথা অন্য রকমের; মাইকেলের মৃত্যুতে আমাদের মন আলোড়িত হওয়ার বেদনাও ভিন্ন প্রকারের, আর আজ নজরুল ইসলাম যে জীবন্মৃত হয়ে রয়েছেন তার জন্য আমাদের আকুতির প্রকৃতিও আলাদা—কিন্তু সুকান্তর কাব্য-প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশের আগেই ঝরে পড়ার জন্য আমাদের প্রায় বিলাপ করতে ইচ্ছে হয় । বিশেষ করে আমরা যারা সুকান্তের সঙ্গে কাজ করেছি, সুকান্তকে নানা ছোটখাট ঘটনার মধ্যে নিকট থেকে পেয়েছি, তাদের অকাল- বিয়োগের দুঃখ বোধ হয় সবচেয়ে বেশী। অনেকের মতো আমিও ভেবেছি, এতো অল্প বয়সে সুকান্তর এতখানি কাব্য-প্রতিভার বিকাশ হলো কী করে। শুনেছি সুকান্ত তার জ্যেঠতুতো বোন রানীদির কোলে ছোটোবেলায় বেড়ে ওঠে এবং সেই রানীদির কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান এবং কবিতা শুনে-শুনে সে বড় হয়। কিন্তু সুকান্তর বয়স যখন এগারো তখন এই রানীদি মারা গেলেন। সেই সঙ্গে-সঙ্গে মারা গেলেন সুকান্তর মা। প্রৌঢ় পিতা তাঁর বইয়ের দোকান নিয়ে ব্যস্ত । বাড়ীতে টাকা পয়সার যে খুব অভাব, তাও নয়—কিন্তু জীবনে কিছু একটার তীব্র অভাব অনুভূত হয়। স্নেহের কাঙাল থেকে যায় মন—অতো অল্প বয়সে প্রিয়জনের মৃত্যুর শূন্যতাকে পুরণ করতে পারে। মৃত্যুর আঘাতেই বোধহয় ছোটো বয়সে বড় হয়ে ওঠে। আর নিজের বেদনা-বোধ অন্যের বেদনার কাছে কিশোর কবিতে টান মারে । ১৯৪২ সালের আন্দোলন এলো । তখন সুকান্ত দেশবন্ধু স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য স্কুলের কর্তৃপক্ষ তার উপর মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। সে স্কুল ছেড়ে অন্য স্কুলে গিয়ে সুকান্ত ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলো। কিন্তু সুকান্ত অঙ্কে ফেল করলো । ইতিমধ্যে ঘনিয়ে এসেছে বাঙালীর চরমতম দুর্দিন, অর্থাৎ ১৯৪৩ সালে মহা দুর্ভিক্ষ শুরু হলো। তার বহু আগেই সুকান্তর কবিতা লেখা শুরু হয়ে গেছে। কলকাতার কঠিন রাজপথে দুর্ভিক্ষগ্রস্ত কৃষক তখন মরছে হাজারে-হাজারে। এই ধ্বংসের রাজত্বে সুকান্তর বড়দার কয়েকটি বন্ধুর সাথে আলাপ হয় ৷ তাদের মধ্যে ছিলেন তদানীন্তন কালের ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শ্রীঅন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য। দিনের-পর দিন অন্নদাশঙ্কর এবং তাঁর বন্ধুদের কাছে সুকান্ত মৃত্যু এবং দুর্ভিক্ষের মধ্যে শুনতে লাগলো জীবনের বাণী, করণীয় কাজের কথা, সেই সঙ্গে তাঁদের কাছে থেকে পেতে লাগলো কাব্যসৃষ্টির উৎসাহ! সেদিন থেকে কবি-সুকান্ত আর কর্মী-সুকান্ত মিলে গেলো। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার হলো, সুকান্ত তার আদরের কিশোর বাহিনী প্রতিষ্ঠা করলো, সুকান্ত দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে 'অভিযান' নাম দিয়ে নাটক লিখলো, 'আকাল' নাম দিয়ে দুর্ভিক্ষের উপর লেখা বহু কবির কবিতা নিয়ে কাব্য সঞ্চয়ন বের করলো । সুকান্তর একার বেদনা সকলের বেদনার সঙ্গে মিলে গেলো। সুকান্ত অনেক বড় হয়ে উঠলো। তবু এ পরিচয়ও সুকান্তর বাহ্যিক পরিচয়। বেদনা অনেকে পায়, অভিজ্ঞতা অনেকের হয়; কিন্তু কবিতা সবাই লেখে না, কবি সবাই হয় না । সেজন্য অন্তরের জারক রসে মিশ্রিত করে বাইরের জগৎকে ভিতরের জগৎ করতে পারে, সত্যকে করতে পারে সুন্দর, সেই মানুষই হচ্ছে কবি। অন্তরের সেই প্রক্রিয়া কীভাবে চলতে থাকে তার হদিস পাওয়া অনেক সময় কবির নিজের পক্ষেই শক্ত। কাজেই সুকান্তর অন্তরের ইতিহাস বলার সাধ্য আমার নেই। তবে সেই অন্তর বস্তুটি জগৎ-নিরপেক্ষ নয়। কবি চিরকাল তাঁর যুগকে প্রকাশ করেন । যে কবি তাঁর যুগকে যত বেশী প্রকাশ করেন তিনি ততো বড় কবি। সমাজের মানুষেরা এই যুগধর্মকে প্রকাশ করে নিজেদের আবেগ আর চিন্তার মধ্যে। তাদের সেই আবেগ আর চিন্তার দুই ধারা—নূতন এবং পুরাতন, ক্ষয়িষ্ণু এবং বর্ধিষ্ণু, প্রগতিশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল। বিপ্লবী কবি তিনিই যিনি লোকের Revolutionary Spirit - কে ব্যক্ত করতে পারেন ৷ আমার ধারণা সুকান্ত তার যুগের এই Revolutionary Spirit-কে ব্যক্ত করতে পেরেছে যথেষ্ট পরিমাণে। প্রকাশ করেছে অন্তরের জারক রসে রসিয়ে, সত্যকে সুন্দর করে তুলে। সুকান্ত কিশোর হয়েও তাই কিশোর-কবি নয়। সে হচ্ছে মরার দেশে প্রাণের উন্মাদনা, সে হচ্ছে যৌবনের উদগাতা। তার কাব্য খুলে দেখছি পনেরো বছর বয়সে সে যে কবিতা লিখেছে তার নাম 'আঠারো বছর বয়স' : এ বয়স যেন ভীরু কাপুরুষ নয় এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে—অর্থাৎ যৌবনচঞ্চল হোক এই ভারতবর্ষ । অর্থাৎ শিশু হোক যুবক, কিশোর হোক যুবক, প্রৌঢ় হোক আবার যুবক, বৃদ্ধ হোক পুনর্বার যুবক। এই যৌবন-শক্তি সেদিন জেগেছে সোভিয়েট ইউনিয়নে, জেগেছে মহাচীনে, আগামীকাল জাগবে ভারতবর্ষে । সুকান্তর কবিতার মধ্যে আছে এই যৌবনের পৌরুষ। সে কাঁদেনা, সে কাঁদায় না, সেএগিয়ে যেতে বলে, সে সংগ্রামের পথ জয় করতে ডাক দেয় ৷ শত্রুকে সে আঘাত করে, মিত্রকে সে কোলে টানে, যন্ত্রণায় সে বিমূঢ় হয় না। এই সূত্রে মনে পড়ছে সেদিন আমাদের বাংলা দেশেরই এক কবি লিখেছেন, আমাকে তোমরা কেউ বাঁচার গৌরব বলে দিতে পারো?— সুকান্ত থাকলে হয়তো তার উত্তর দিতো, কবিকে কে বাঁচার গৌরব বলে দেবে, কবির কাজই তো হচ্ছে বাঁচার গৌরব অন্যকে বলে দেওয়া। সুকান্ত দেখেছিলো বাঁচার গৌরব এ-দেশে আসছে কী করে। অঙ্কুরিত বীজের মধ্যে সে দেখেছে বটবৃক্ষের গৌরব, সে দেখেছে প্রাসাদ বিদীর্ণ করা চারাগাছ, সে প্রভাতের খবর পেয়েছে রাত্রিতে বসে, সে তাই কলমকে ডাক দিয়েছে বিদ্রোহ করতে। সুকান্ত সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষের চেতনা নিয়ে শুধু মানুষের দুঃখ দেখেনি, অগ্রদূত হয়ে খুঁজেছে কোথায় সেই দুঃখজয়ী শক্তি কতো বিচিত্র পন্থায় জমা হচ্ছে গোপন বারুদের মতো । তবু সুকান্ত শুধু শুরু করেছিলো—নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে যেতে পারেনি। মানুষ-জীবনের বিচিত্র জটিল রূপের প্রসাদের প্রথম সোপানে সে পা দিয়েছিলো। আজ বেঁচে থাকলে সে হয়তো আমাদের কাব্য-জগতের পথ আলোকিত করার জন্য প্রদীপ হাতে থাকতো সবার আগে। তবু সুকান্ত না থেকেও আছে। যে কবি জীবনের জয়গান গায় সে কবি মরে না, আর যে কবি মরার কবিতা লেখে সে মরে যায় । সুকান্তকে দেশবাসী ভোলেনি, ভুলবে না, ভুলতে পারে না। নিজের প্রাণের গরজে কিশোর এবং যুবক সুকান্তকে সন্ধান করে ফিরছে। সুকান্ত তার 'ঠিকানা' কবিতায় লিখেছিলো : আমার ঠিকানা খোঁজ করো শুধু সংগ্রামের পথের উপরই সুকান্ত প্রাণ দিয়ে ঠিকানা লিখে রেখে গেছে। তার ঠিকানা আজ হয়তো কুড়িয়ে পাচ্ছে পাটনা নগরের পথে গুলিবিদ্ধ ছাত্রের দল, তার ঠিকানা পেয়েছে আজ হয়তো ভারতের এক সুদূর সীমান্তের শহীদ নিত্যানন্দের সঙ্গীরা । যতদিন দুঃখের বিরুদ্ধে মানুষ মানুষের মতো দাঁড়াবে, ততোদিন সুকান্তর ঠিকানা খুঁজে পেতে কষ্ট হবে না । স্বাধীনতা। ২৮শে আগষ্ট, ১৯৫৫ প্রকাশের তারিখ: ১৪-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |