|
সুকান্তঅবন্তীকুমার সান্যাল |
কিন্তু সুকান্তর কলমেই সর্বপ্রথম খাটি স্লোগান খাঁটি কবিতা হয়ে উঠেছিল। একমাত্র সুকান্তর কবিতা থেকে এমন প্রচুর স্লোগান জড়ো করা যায় যা দিয়ে একটা পুরো মিছিলকে সাজানো চলে, আর সে-স্লোগানগুলির বেশির ভাগ অব্যর্থ বলেই কবিতা অথবা কবিতা বলেই অব্যর্থ। স্লোগান লিখতে গিয়েই সুকান্ত লিখেছে এমন আশ্চর্য লাইনটি |
১৯৪১-৪২ সালে সাহিত্যতত্ত্বের ক্লাসে কাব্যবিচার প্রসঙ্গে আধুনিক কবিদের স্থায়িত্বের কথা যখনই তুলতাম, মাস্টারমশাই একটি কথাই দিনের পর দিন বলতেন। তাঁর ছিল কাব্যপরিমাপের রাজসিক দাড়িপাল্লা, তাঁর গণনার মহাকবি ছিলেন মাত্র ‘কালিদাস প্রভৃতয়ো দ্বিত্রা পঞ্চষাঃ বা’। তবু তিনি বলতেন: পঁচিশ বছর পরেও যে কবির কবিতা পড়া চলে, পড়তে ইচ্ছে করে, সে সার্থক কবি। মাস্টারমশাই আজ বেঁচে থাকলে অবশ্যই বলতেন যে সুকান্ত সার্থক কবি৷ সুকান্তর অসম্পূর্ণতা, সুকান্তর অপরিপক্কতা সত্ত্বেও সুকান্তর সার্থকতা তর্কাতীত। জনপ্রিয়তাই সুকান্তর সার্থকতার একমাত্র মাপকাঠি একথা কখনও-ই বলব না, তবুও কখনও ভুলব না যে জনপ্রিয়তাই তার সার্থকতার অন্যতম মাপকাঠি। রুচিবাগীশরা ‘জন’ কথাটিতে যতই নাক কোঁচকান না-কেন, সুকান্ত কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই ‘জন’-এর চিত্র স্পর্শ করার দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছিল এবং ‘জন’-এর প্রিয়ত্ব অর্জনই সুকান্তর সজ্ঞান কামনা ছিল। প্রায় পঁচিশ বছর পরে সাক্ষাৎ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, যে-কিশোরের কবিতায় ‘জন’ তার আবেগের স্পষ্ট-প্রত্যক্ষ ও তীক্ষ্ণ প্রকাশটিকে আবিষ্কার করে রোমাঞ্চিত হয়, আবরণমুক্ত উলঙ্গ-শব্দের ‘স্লোগানে’ অনিবার্যভাবে প্রত্যুত্তর দিয়ে ওঠে, নিছক ‘জনপ্রিয়’ আখ্যা দিয়ে সে-কবিতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটা স্নবারি ছাড়া আর কিছুই নয়। সুকান্ত যখন লিখতে শুরু করেছিল, তখন আধুনিক কবিদের মধ্যে নামডাক ছিল মুখ্যত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ দাশ, সমর সেন আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের৷ সুধীন্দ্রনাথের শব্দ-পার্ট সুকান্তকে বিস্মিত করত, কিন্তু তাকে মুগ্ধ করত প্রেমেন্দ্রের শব্দ-স্বাচ্ছন্দ্য। জীবনানন্দের শব্দ-শৈথিল্য তার পছন্দ হত না, বিষ্ণু দে-র শব্দ-নৈপুণ্য বোঝার মতো তার বয়স ছিল না৷ তার আকর্ষণ ছিল সমর সেন আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি। সমর সেনের ভাষণের স্পষ্টতা সে ভীষণ তারিফ করলেও তার সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন সুভাষ— তাঁর শব্দের তীক্ষ্ণতায়, অব্যর্থতায় এবং বক্তব্যের বিশেষতায়। তখনকার দিনের আরও অনেকের মতো ‘কী বলব’ এ সমস্যা সুকান্তর ছিল না, সমস্যা ছিল, ‘কেমন করে বলব’। বলার কথা নিয়ে তার তিলমাত্র দ্বিধা ছিল না, দ্বিধা ছিল বলার কারণ নিয়ে। কিন্তু তার ওই বয়সে সুভাষের পরিশীলিত বাক্-সম্পদ আয়ত্ত সম্ভব ছিল না। সে ঝুঁকেছিল রবীন্দ্রনাথের প্রান্তিক, নবজাতক-এর দিকে৷ সুকান্তর সদ্য-কৈশোর মনে বিশ্ববোধের উন্মেষের মূলেও ছিলেন প্রধানত প্রান্তিক, সভ্যতার সংকট-এর রবীন্দ্রনাথ (সে সময়টায় রবীন্দ্রনাথ বিশ্বরাজনীতি সচেতন তরুণদের কী প্রচণ্ডভাবে উদ্দীপ্ত করেছিলেন, আজকের কাউকে তা কিছুতেই বোঝানো যাবে না।) অতি দ্রুততায় বিশ্ববোধ ও জীবনবোধকে হৃদয়রসে জারিত করে সোচ্চার হয়ে ওঠার মুহূর্তে সুকান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রান্তিক, নবজাতক-কে তার শব্দের অভিধান করে নিয়েছিল। কবিতার বক্তব্য সম্পর্কে সুকান্তর সঙ্গে একমত হলেও, আজকের কোনও তরুণ কবি ভাবতেও পারেন না সেদিনকার সেই ‘কেমন করে বলা’-র সমস্যা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সেই মধ্যবর্তীকালে ভারতবর্ষে জাতীয় আন্দোলনের সংকটময় পর্বে, দেশবাসী দুর্ভিক্ষের পটভূমিকায়, বিপর্যস্ত সমাজজীবনে একদল সচেতন তরুণের কাছে রাজনীতি অকস্মাৎ অতি প্রত্যক্ষ বস্তুরূপে ধরা পড়েছিল, এই প্রথম রাজনীতি একটি সম্পূর্ণ জীবনবোধ ও আচরণের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিশোর সুকান্ত এই রাজনীতির অংশীদার হয়েছিল, সে সোজাসুজি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। এই রাজনীতির প্রেরণায় একেবারে গোড়া থেকেই সে ছিল সর্বক্ষণের কর্মী এবং তার কর্ম ছিল তার কবিত্বের পরিপূরক। রেশনের লাইনের তিক্ত অভিসম্পাতে, লঙ্গরখানার করুণ কোলাহলে, মিছিলের উল্লাসে চিৎকারে যে-ক্ষোভ যে-বেদনা যে-আশা যে-উদ্দীপনা, তাকে কেমন করে ভাষা দিতে পারা যায়? সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে অতি-প্ৰত্যক্ষ এই ক্ষোভ-বেদনা-আশা উদ্দীপনাকে কোন তিৰ্ষক বক্রভাষণে প্রকাশ করা সম্ভব? অনুভব যেখানে স্পষ্ট প্রত্যক্ষ ও তীক্ষ্ণ ভাষাকে সেখানে অবশ্যই স্পষ্ট প্রত্যক্ষ ও তীক্ষ্ণ হতে হবে। সহধর্মী কবিদের মধ্যে অন্য কারুরই সুকান্তর মতো এমন আক্ষরিকভাবে নগ্ন রুক্ষ বাস্তবের মুখোমুখি হবার দুর্ভাগ্য (?) হয়নি। তাই স্বভাবতই সুকান্ত ভাষার স্বতন্ত্র পথ খুঁজে নিতে চেয়েছিল। কোনোরকম বক্রতা নয়; যাদের কথা তারা যেমন করে বলতে চায়, তেমন করেই লিখতে হবে; যাদের জন্য বলা, তারা যেমন করে বোঝে, তেমন করেই বলতে হবে। এই বলার প্রবল প্রচেষ্টাতে সুকান্ত নিঃসন্দেহে বহু ক্ষেত্রে কবিতার শর্তকে লঙ্ঘন করেছে। তার জন্য দায়ী তার বয়স, তার জ্ঞান ও কাব্য-সংস্কারের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু অন্যদিকে আবার এইগুলিই তার পক্ষে আশীর্বাদ হয়েছিল। প্রত্যক্ষ অনুভবকে প্রত্যক্ষ ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে গড়ে ওঠা কোনও সংস্কার তার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রত্যক্ষ ভাষার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে সুকান্ত এমন কিছু লাইন লিখে ফেলেছিল যা সত্যিই অবাক করা। যেমন: সুভাষ কখনও-ই এমন অবক্র ভাষণের কথা ভাবতে পারতেন না, কিন্তু তিনিও এই দুটি লাইনের অব্যর্থতায় চমকিত না-হয়েও পারতেন না। সুকান্তর কবিতায় স্লোগান আছে, তার কারণ কিশোর সুকাস্ত দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান লিখত, মিছিলে মিছিলে স্লোগান দিত। কিন্তু সুকান্তর কলমেই সর্বপ্রথম খাটি স্লোগান খাঁটি কবিতা হয়ে উঠেছিল। একমাত্র সুকান্তর কবিতা থেকে এমন প্রচুর স্লোগান জড়ো করা যায় যা দিয়ে একটা পুরো মিছিলকে সাজানো চলে, আর সে-স্লোগানগুলির বেশির ভাগ অব্যর্থ বলেই কবিতা অথবা কবিতা বলেই অব্যর্থ। স্লোগান লিখতে গিয়েই সুকান্ত লিখেছে এমন আশ্চর্য লাইনটি: ‘রক্তে আনো লাল সুকান্তর মানসিকতায় রাজনীতি ও কবিতায় কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না। সমকালের রাজনীতির ছোটোবড়ো সকল কিছুই তার প্রেরণার বিষয় ছিল। আজকের দিনের রাজনীতি-সচেতন তরুণদের পক্ষে সেই সাময়িকতার প্রসঙ্গ অনুধাবন করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। তারা কেমন করে বুঝবে সীমান্তের সেই প্রহরীর কথা, অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে যে স্বদেশের সীমানায় থমকে দাড়িয়ে ভগ্নকণ্ঠে বলে: ‘আমি যেন সেই বাড়িওয়ালা, ফ্যাসিস্ট-শক্তির প্রতিরোধে জাগ্রত পৃথিবীব্যাপী জনশক্তির সঙ্গে যারা একাত্মতা অনুভব করতেন, কায়-মন-বাক্যে যারা বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষের মুক্তি ওই জনশক্তির বিজয়ের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, বিজয়ের চরম মুহূর্তে ভারতবর্ষের হতভাগ্যকে প্রত্যক্ষ করে, সুকান্তর সেদিনকার সেই প্রত্যেকটি ক্লান্ত সমধর্মীরই মনে হয়েছিল: ‘আমি যেন সেই বাতিওয়ালা’, ইতিহাসের জ্ঞান থেকে সেদিনকার সেই তাৎক্ষণিক অনুভবটিকে আজকের কেউ স্পর্শও করতে পারে না। আজ এক যুগ পরে সুকান্তর কবিতায় এই ধরনের তাৎক্ষণিক অনুভূতি আমাদের বাসনাকে যেন অন্য জন্মের অনুসঙ্গ জাগিয়ে তোলে। সেই ক্ষুধার কান্না, অবিশ্বাসীর বাঁকা-হাসি, বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ বাহিনীর পদধ্বনি, সেই বার্লিনের পতনের উল্লাস, ইন্দোনেশিয়া-ইন্দোচীনের অভ্যুত্থান, সেই আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারী, ঊনত্রিশে জুলাই, আমাদের ষোলোই আগস্টের নরক-বিভীষিকা, একমাত্র সুকান্তর কবিতাই এসব কিছুর দিন-পঞ্জিকা হয়ে আছে। কিন্তু দিন-পঞ্জিকা লিখতে লিখতে কী আশ্চর্য ক্ষমতায় সুকান্ত ইতিহাসের মর্মকেন্দ্র স্পর্শ করেছিল, সাময়িকতার কুয়াশা ভেদ করে যেন মুহূর্তের জন্য ইতিহাসের নিরঞ্জন মূর্তির সাক্ষাৎকার ঘটেছিল। ‘ঐতিহাসিক’ কিশোর সুকান্ত লিখেছিল: ‘আর মনে করো আকাশে আছে এক ধ্রুব নক্ষত্র, সুকান্ত ছাড়পত্র কবিতা শেষ করেছিল একটি সজ্ঞান আকাঙ্ক্ষায়: ‘তারপর হব ইতিহাস’, ‘লেনিন’ কবিতায় সে লিখেছিল: ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’। এই ‘হতে চাওয়া’ আর ‘হয়ে ওঠা’র মধ্যে চৈতন্যের যে রূপ-পরিবর্তন, তা কি বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে। আর, শত অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও, কবি হিসেবে এখানেই সুকান্তর পরম সার্থকতা। সকলেই লক্ষ করেছেন, শেষের দিকে সুকান্তর কবিতার ভাব ও ভঙ্গিতে রং পালটাচ্ছিল, অর্থাৎ সুকান্তর বয়স বাড়ছিল, কিশোর যুবক হচ্ছিল। এই নতুন রং-করা দুয়েকটি কবিতা নিয়ে কিছু অনুরাগীর অস্বস্তির অস্ত নেই। তেমন একটি কবিতা ‘অসহ্য দিন’, ‘পূর্বাভাস’-এর এককোণে সংকোচে মুখ লুকিয়ে আছে। সেই অনুরাগীরা যদি জানতেন, ওটি সুকান্তর একেবারে শেষের রচনা তাহলে আরও বিব্রত হতেন। যাদবপুরের হাসপাতালে যাবার মাত্র কয়েকদিন আগে শ্যামপুকুরে রাখালবাবুর বাড়িতে দেখা করতে গিয়ে বালিশের নিচে লুকোনো একটি চিরকুটে লেখা কবিতাটি আমিই টেনে বার করেছিলাম। পড়তে গেলে সুকান্ত বাধা দিতে চেয়েছিল। যার আকাঙ্ক্ষা ইতিহাস হবার, যে অনুভব করেছে, ‘আমিই লেনিন’, সেই লিখেছে: ‘আজ মনে হয় জীবন-ধারণ বুঝি খানিকটা অসঙ্গত।’ সুতরাং তার কুণ্ঠা স্বাভাবিক ছিল বই কী। কবিতাটি কাগজে টুকে নিয়ে বলেছিলাম: সুকান্ত তুমি বড়ো হচ্ছ। বাড়ি ফিরে কবিতাটি আমার যে-প্যাডের মলাটে টুকে রেখেছিলাম, কী করে জানি না, সেই তেইশ বছর আগেকার মলাটসুদ্ধ ক্ষীণকায় প্যাডখানি এখনও টিকে আছে। আজ মিলিয়ে দেখছি, ছাপা বইতে একটি কথা পরিবর্তিত হয়েছে। সে কার পরিবর্তন? সুকান্তর না অন্য কারুর? আমার সন্দেহ আছে ‘অসহ্য দিন’-এর পর সুকান্ত আর কোনও কবিতা লিখেছিল কি না। ‘অসহ্য দিন’-ই প্রমাণ করে সুকান্ত সত্যি সত্যি বড়ো হচ্ছিল, কিন্তু বড়ো হওয়ার সুযোগ সে পায়নি। বয়স বেড়ে আজ সে পঁয়তাল্লিশ বছরের প্রৌঢ় হত। জীবনধারণ পরিপূর্ণ সঙ্গত কি না? চেতনার চাবুকে অস্থির সুকান্তকে এ-প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই খুঁজতে হত। সমু্দ্যত বিপদের পথে চলতে চলতে আজ ‘ডাইনে’ ‘বাঁয়ে’ তাকাই আর ভাবি, প্রৌঢ় সুকান্ত কোন উত্তর খুঁজে পেত। সূত্র- সুকান্ত স্মৃতি, সুজিতকুমার নাগ (সম্পাদিত) প্রকাশের তারিখ: ০২-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |