|
শ্লোকদীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় |
মেডিকেল হস্টেলের প্রাঙ্গণে মুখ থুবড়ে দু-হাতে মাটি আঁকড়ে ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল বরকত সালাম, আরও কতজন। পুলিসের সতর্ক প্রহরা এড়িয়ে রাতারাতি সেইখানে মাথা তুলল শহীদের স্তম্ভ। আবার দিনের আলোয় সেই পবিত্র স্মৃতি-মন্দির সৈন্যদের বুটের লাথিতে মাটিতে মিশে গেল। |
বাঁশের বেড়ার ভেতর লম্বায় চওড়ায় কয়েক হাত মাত্র জায়গা। করুণ স্নেহের মতো শ্যামল আচ্ছাদনে ঢাকা। আজ আর এক ফোটা রক্তের চিহ্ন নেই! সময় সেখানে সবুজ সমারোহে সলজ্জ ঔদ্ধত্যে মাথা তুলতে চায়। আমরা চারদিকে গোল হয়ে দাড়ালাম। আমরা পূর্ব আর পশ্চিম বাঙলার অনেকগুলি ভাইবোন। কলকাতার সাহিত্যিকদের পক্ষ থেকে শ্রীমতী রাধারাণী দেবী ফুলে মালায় সেই একটুকরো জমিকে অপরূপ সাজিয়ে দিলেন। যেন সুরের ছোঁয়ায় কবিতা গান হয়ে উঠল। বাঁশের বেড়াটা শক্ত দু-হাতে চেপে ধরলাম। ঝাপসা দুটো চোখ বার বার গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে বুলেটের দংশনে ক্ষত-বিক্ষত সামনের মেডিকেল হস্টেলের দেওয়ালটায়। ওরা বলেছিল— আমাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে দেবে না; আলাওল আর রবীন্দ্রনাথ, পদ্মাতীরের মাঝি আর গঙ্গাপারের কৃষকের গানকে দেবে না স্তব্ধ করতে। তাই গুলি। মেডিকেল হস্টেলের প্রাঙ্গণে মুখ থুবড়ে দু-হাতে মাটি আঁকড়ে ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল বরকত সালাম, আরও কতজন। পুলিসের সতর্ক প্রহরা এড়িয়ে রাতারাতি সেইখানে মাথা তুলল শহীদের স্তম্ভ। আবার দিনের আলোয় সেই পবিত্র স্মৃতি-মন্দির সৈন্যদের বুটের লাথিতে মাটিতে মিশে গেল। কিন্তু। বেয়নেটের ফলা উচিয়ে দস্যুরা যে-প্রতিজ্ঞাকে রুদ্ধ করতে চেয়েছিল, জীবনের তরঙ্গে সেই প্রতিজ্ঞা আসন্ন বিদ্রোহের সংকেত রক্তপদ্মের মতো ভেসে বেড়াল দিকে দিগন্তে, এমন কী দেশ থেকে দেশান্তরে। হল আন্দোলন। তারপর নির্বাচন। ওরা জিতল। ওরা— যারা পূর্ব-পাকিস্তানের সর্বস্তরের সচেতন মানুষকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গড়েছিল। বাঁশের বেড়ার ভেতর লম্বায় চওড়ায় কয়েক হাত মাত্র জায়গা। ইতিহাস! রাধারাণী দেবী বলেন— তিনি মা, তাঁর সমস্ত হৃদয় দিয়ে তাই তিনি এই ছেলেদের যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারেন। তারপর অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে থেমে গেলেন হঠাৎ। কোনও কথা বলল না আর কেউ। পারল না বলতে। আমরা স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। সন্তানের রক্তে মায়ের চোখের জল মিশেছে। আর বক্তব্য কী-ই-বা থাকতে পারে? ফিরে যাব ভাবছিলাম। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ চট্টগ্রামের উর্দু-কবি, নাজ পারভেজ, খুলে ধরলেন তাঁর কবিতার খাতাখানা— একটু আগে সেই ঐতিহাসিক সাহিত্য সম্মেলনে যে-খাতা থেকে তিনি সকলকে পাবলো নেরুদার অনুবাদ-কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। হাল্কা ঘি-রঙের প্যান্ট আর বুশ শার্টে মোড়া সেই আশ্চর্য ঋজু চেহারা কোনোদিন ভুলব না। বাঁ হাতে খাতা ধরে ডান হাতে মুঠি পাকিয়ে হৃদয়ের প্রবল যন্ত্রণা, প্রচণ্ড আক্রোশ আর অপরিসীম ভালোবাসা দিয়ে তিনি শুরু করলেন কবিতা পড়তে। আমার গৌরব, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের আমি সাক্ষী। আমার প্রেরণা, সেই আশ্চর্য সেতুবন্ধের আমিও এক স্ৰষ্টা ৷ উর্দুতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙলা ভাষার আন্দোলনে যারা বুকের রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের স্মৃতি-মন্দিরের সামনে দাড়িয়ে এক উর্দু-কবি পড়ছেন আমাদের সুকান্তের কবিতা। মনে হল, শোক এবার শ্লোক হয়ে উঠেছে। শুধু রক্ত নয়, শুধু অশ্রু নয়। আরও কিছু, অন্য কিছু ! সূত্র- সুকান্ত স্মৃতি, সুজিতকুমার নাগ (সম্পাদিত) প্রকাশের তারিখ: ০৩-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |