‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ' একটা বড়ই অনির্দিষ্ট শব্দ এবং ভিন্ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এর অর্থও ভিন্ন ভিন্ন। 'আধুনিকতা' একটি পরিভাষা যা প্রাসঙ্গিক একান্তভাবে কলা এবং সাহিত্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। যুক্তির দিক থেকে ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ’ বলতে বোঝানো উচিত এমন কিছু যা কলা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘আধুনিকতাবাদ’-এর পরবর্তী সময়ে এসেছে। কিছু মানুষ এই অর্থে তা ব্যবহার করে। কিন্তু প্রায়শ ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় বহু দার্শনিককে উল্লেখ করতে। এদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতি সম্পন্ন হলেন লিয়োতার, ফুঁকো, দেরিদা (Lyotard, Foucault, Derrida)। এরা সবাই আধুনিকতাবাদী কলার মুগ্ধ প্রশংসাকারী কিন্তু প্রবলভাবে হেয় করেন জ্ঞানদীপ্তি বা আলোকপ্রাপ্তি ( Enlightenment )-কে। নিবিড় অনুশীলনে, যদিও আমরা দেখি যে আলোকপ্রাপ্ত চিন্তার সেই সমস্ত দিকগুলি যা বাজার মতাদর্শ, বুর্জোয়া রাজনীতি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির সমস্ত সৌধগুলি তৈরি করেছে অর্থাৎ অ্যাডাম স্মিথ বা জন লকের মত চিন্তাবিদদের সাথে এদের কোন সমস্যাই নেই। জ্ঞানদীপ্তির সেই সমস্ত অংশগুলিই কেবলমাত্র আক্রান্ত হয় যা দায়বদ্ধ রয়েছে সর্বজনীনতা ( Universalism), যুক্তিবোধ (Reason), অগ্রগতি (Progress) এবং আরও সাধারণভাবে বললে, মার্কসবাদের দিকে পথনির্দেশ করে।
অন্য আরো দুটি পরিভাষার উপলব্ধি প্রয়োজন: ‘আধুনিকতা’ (Modernity) এবং ‘উত্তর-আধুনিকতা’ (Postmodernity)। ‘আধুনিকতা’ বলতে সাধারণত বোঝায় সেই সমস্ত ধারণাগুলি, রাষ্ট্রের রূপ এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিগুলি যা প্রথমে উদ্ভব হয়েছিল ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায়, পরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে : (ক) জ্ঞানদীপ্তির দার্শনিক অভিঘাত (খ) ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক অভিঘাত এবং (গ) শিল্প বিপ্লবে উদ্ভূত আর্থসামাজিক পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে। উত্তর-আধুনিকতাবাদের মুখ্য ধারণা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পুঁজিবাদের নিজস্ব চরিত্রে, সাথে সাথে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় এবং এই ব্যবস্থার সাথে খাপ খায় এমন রাজনীতির একেবারে মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে এবং এই পরিবর্তন হয়েছে সর্বব্যাপ্ত। ‘আধুনিকতা’-র দিন শেষ হয়েছে, আমাদের বলা হচ্ছে আমরা ‘উত্তর- আধুনিকতা’-য় জীবন যাপন করছি।
যে আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণের উপর উত্তর-আধুনিকতা দাঁড়িয়ে আছে তার অধিকাংশই প্রথমে বিকশিত হয় ঠান্ডাযুদ্ধের প্রথম দশক, ১৯৫০-এর দশকে একদল আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী এবং তাদের সহকর্মীদের হাতে, মার্কসবাদ এবং শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। ফ্রান্সে, ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ’ আধিপত্যে আসে এর প্রায় এক দশক পরে, ওখানে ১৯৬৮-তে বামেদের ব্যাপক পরাজয়ের পর। এটা মার্কিন সমাজতত্ত্বের উত্তর-আধুনিকতার রকম ফের থেকে অনেকটাই ধার করা কিন্তু ফরাসি দর্শনের ভাষায় খাপ খাইয়ে নেবার জন্য পুনর্বিন্যস্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সিকি শতাব্দী, ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০ ছিল পুঁজিবাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিকাশ এবং বৈভবের কাল, প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং তারপর পশ্চিম ইউরোপে। এই উন্নতি সম্পর্কিত ছিল পশ্চিমী শিল্প ব্যবস্থায় যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন এবং সামরিক শিল্প উৎপাদন কেন্দ্রগুলির উদান, টাটকা কারিগরি জ্ঞান এবং উন্নত পুঁজিবাদী দুনিয়ায় কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উত্থানে। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই উত্তর-আধুনিকতাবাদী ধ্যানধারণার প্রারম্ভিক সূচনা।
এর কেন্দ্রীয় প্রস্তাবনাটা ছিল, অগ্রসর এলাকাগুলিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ফলে রূপান্তরিত পুঁজিবাদ শেষ পর্যন্ত তার চিরকালীন প্রতিশ্রুতি মতো বৈভব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এই বৈভব স্থায়ী হবে, এবং এটাই স্বাভাবিক যে আগে বা পরে গরিব মানুষও এর একটা অংশের ভাগীদার হবে। এই ব্যবস্থা, এর প্রায় অসীম সম্পদ উৎপাদন ক্ষমতায়, সমগ্র বিশ্বকে এক আচ্ছাদনে বেঁধে ফেলতে বাধ্য : যদি তৃতীয় বিশ্ব পশ্চিমী পুঁজিবাদী কৌশলগুলির পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তবে তাদের আগামীকাল হবে তেমনই যা প্রথম বিশ্বে ইতিমধ্যেই ঘটেছে। সমাজ বিজ্ঞানের বিশ্লেষণে এই দাবি করা হচ্ছিল যে আমেরিকা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমাজ এবং নিজস্ব বাড়ি গাড়ি ইত্যাদি নিয়ে শ্রমিকশ্রেণিও এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশে পরিণত হয়েছে। এটাও তখন দাবি করা হচ্ছিল যে যেহেতু ক্রমশ বেশি বেশি শ্রমিক মধ্যবিত্ত আয়ের সীমার মধ্যে আসছে, কমিউনিস্ট রাজনীতি আজ অপ্রাসঙ্গিক।
বলা হলো ট্রান্স ন্যাশান্যাল কর্পোরেশন বা বহুজাতিক সংস্থাগুলি তৃতীয় বিশ্বে শিল্পায়নের উপহার এনে দিয়েছে। উন্নত পশ্চিমী দুনিয়াতেও এগুলি আধিপত্য করছে। এদের মূলধনের অধিকাংশটাই স্টক এবং শেয়ার বিক্রির মধ্য দিয়ে বানানো। বলা হলো, এগুলি আধুনিক পুঁজির মূলগত চরিত্র বদলে দিয়েছে, পুঁজি এখন আর মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির মালিকানা নয় বরং সমস্ত অংশীদারগণের। শ্রমিক, যাদের বলা হলো ‘মধ্যবিত্ত’ বনে গেছে, এভাবে স্টক ও শেয়ার কিনে ছোট পুঁজিপতি বনে যেতে পারে। অধিকন্তু, কর্পোরেশনগুলিতে সিদ্ধান্ত পুঁজিপতিরা নেয় না। বরং একটা নয়া ধরনের পরিচালক শ্রেণী (managerial class) এই সিদ্ধান্ত নেয়, যাদের নিয়োগ কেবলমাত্র পারিবারিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে হয় না বরং মেধা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে হয়। এভাব মেধাতন্ত্রের (meritocracy) হাতে উত্তর-শিল্প উৎপাদক সমাজে পুঁজিপতি শ্রেণি রঙ্গমঞ্চের পিছন দিকে সরে গেছে। এই মেধাজীবীরা উচ্চ-শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, যে শ্রেণি থেকেই আসুক না কেন, এখন কর্পোরেট পিরামিডের সর্বোচ্চ শীর্ষে তাদের আরোহণের সমান সুযোগ রয়েছে। এভাবে এটা বলা হয়ে থাকে, যেহেতু মার্কস যেমন লিখেছিলেন উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদে তেমন উৎপাদন ব্যবস্থা নেই, সেই শ্রমিক শ্রেণিও নেই, তাই মার্কসবাদ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই উত্তর-আধুনিক পরিপ্রেক্ষিতকে সানন্দে অভ্যর্থনা জানান হয়েছে। অবশ্য, এই গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান চিন্তাবিদরা আবার হতাশাবাদী ঢঙেও কথা বলছেন। পূর্বতন ট্রটস্কিপন্থী আরউইং হাও এবং ডানিয়েল বেল যারা এক সাংস্কৃতিক আভিজাত্য এবং মৃদু সামাজিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, তাঁরা প্রাচুর্য নিয়ে উচ্ছ্বসিত থাকলেও ভোগবাদ এবং সংস্কৃতির জনতায়ন নিয়ে বিলাপ করতেন। তাঁরা সমাজের অপেক্ষাকৃত বিবর্ণ চিত্রই এঁকেছেন, আরউইং হাও-র ভাষায় ‘কিছুটা সমাজকল্যাণকর, কিছুটা সামরিক’। ড্যানিয়েল বেল এই সব কিছুর মধ্যে অভিনব মোচড় দিয়েছেন তাঁর কাছে আধুনিক মানে ‘ওয়েবারীয় প্রোটেস্টান্ট মূল্যবোধের সঞ্চয়ী সমাজ’ (the saving society) যেখানে তুমি ব্যয়ের আগে সঞ্চয় কর। অন্যদিকে, উত্তর আধুনিক মানে ‘খরুচে সমাজ’ (the spending society) যা ১৯৩০-র ঋণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে। যেখানে তুমি সহজে ঋণ নিতে পার এবং তোমার না থাকা জিনিসের জন্য খরচ করতে পার (যেমন, বন্ধকী ঋণে বাড়িঘর কেনা, ধারে গাড়ি ইত্যাদি)। উত্তর-আধুনিক হলো দেদার ব্যয়কারী, আত্মমগ্ন। তা পুঁজিবাদী সমাজের একটা বুনিয়াদী অবস্থান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে, ‘উৎপাদন’-এর পরিবর্তে ‘ভোগ’ হল বৃদ্ধির চালিকাশক্তি। তাঁর কাছে। এই ভোগবাদী ‘উন্মাদনা’ হল সমাজিক ক্ষয়ের চিহ্ন এবং উচ্চ বুর্জোয়া সমাজের সামাজিক মূল্যবোধ থেকে পিছু হঠা। কমিউনিজম ক্রমশ প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে কিন্তু পুঁজিবাদী বৈভব নিজে থেকেই জঘন্য হয়ে উঠছে। এই সমস্ত কিছুই আবার পুনঃসূত্রায়িত করা হয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর পর, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে, ফুকুয়ামার হাতে, তাঁর ‘ইতিহাসের অবসান’ তত্ত্বে। তিনি সওয়াল করলেন যে উদার পুঁজিবাদের সম্ভাব্য বিকল্পগুলি এখন নির্ণায়কভাবে পরাজিত এবং পুঁজিবাদ এখন চিরস্তন বা শাশ্বত হতে চলেছে। তবে এতদসত্ত্বেও, তিনি বলেছিলেন এই বিজয়ী পুঁজিবাদ সমস্ত মানবিক আকাঙ্ক্ষাগুলিকে খর্ব করেছে নিছক সীমাহীন ভোগের লালসায়।
১৯৬০-র দশকের ইউরোপ-আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যুব বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিত ছিল। এটাই এবং বিবিধ ‘নয়া বাম' (New Left) সংগঠন যা তৈরি হয়েছিল তাদের তিনটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য পরবর্তী সময়ে উত্তর আধুনিকতাবাদের আবির্ভাবে পরিপুষ্ট হয়েছিল। প্রথম, সমস্ত ধরনের কমিউনিস্ট মতবাদের (‘পুরানো বাম’) বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ কিন্তু তাদের র্যাডিকাল এবং এমনকি বিপ্লবী দাবিও ছিল। দ্বিতীয়, এই আন্দোলনগুলি ছিল এতটাই মধ্যবিত্ততায় আকীর্ণ, বিশেষত আমেরিকায়, যে শ্রমিকশ্রেণি মোটের উপর আগ্রহশূন্য ছিল এবং ফলশ্রুতিতে তারা বৈপ্লবিক সম্ভাবনাহীনতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল। নয়া রাডিক্যালদের কাছে ‘শ্রমিক শ্রেণির মৃত্যু’-র উত্তর-আধুনিক মতবাদ জনপ্রিয়তা পেল। তৃতীয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা থেকে স্বাভাবিকভাবেই এক বিস্তৃত যুদ্ধ-বিরোধী মানসিকতার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু তা বাদ দিয়ে এই র্যাডিকালিজমের মূল ধাক্কাটা ছিল সাংস্কৃতিক, এক বিস্তৃত পরিধিব্যাপী, যৌনতা থেকে পপ মিউজিক, ড্রাগ থেকে পোশাক বিধি, জাতি-সত্তা পরিচিতি থেকে ধর্মীয় হুজুগ - বুর্জোয়া সমাজের দমনমূলক বৈশিষ্ট্যগুলির বিরুদ্ধে এক সুদূরপ্রসারী বিদ্রোহ, কিন্তু বুর্জোয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ভোগের অনুসারী এবং পরিচিতি সত্তার রাজনীতিতে ক্রমে ভেসে যাওয়া।
১৯৬০-র দশকের শেষ দিকে ফ্রান্স উত্তর-আধুনিকতাবাদের আদি গৃহে পরিণত হয়। এখানেও পটভূমির কিছু উপলব্ধি থাকা জরুরি। আমেরিকার সাথে বিসদৃশ, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় পর্যন্ত ফ্রান্স ছিল মুখ্যত কৃষিপ্ৰধান সমাজ ব্যবস্থা। কিন্তু, আমেরিকার সাথে অমিল এই যে এখানে এমন শক্তিশালী শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন ছিল যে যুদ্ধের পরে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি (পি সি এফ ) ভোটদাতাদের ২৫%-র সমর্থন নিয়ে একক বৃহত্তম পার্টি হিসাবে উত্থিত হয়। এই সমস্ত কিছুর দ্রুত পরিবর্তন হয় কারণ ফ্রান্স মূলত কৃষি প্রধান সমাজ থেকে শিল্প উৎপাদক সমাজ ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয় মাত্র দুই দশকের মধ্যে, এর জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য মার্শাল পরিকল্পনার দ্বারা যথেষ্ট রকমের আমেরিকান পুঁজি এবং প্রযুক্তি ঠেলে ঢোকানোয়। এর ফলে এক সম্পূর্ণ নতুন ধরনের বুর্জোয়া এবং মধ্যবিত্তের উত্থান ঘটে। এই প্রকাণ্ড সামাজিক রূপান্তর অনুমান করা যাবে একটি মাত্র পরিসংখ্যান থেকে। কেবলমাত্র ১৯৬০ থেকে ১৯৬৮-র মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রের সংখ্যা দুই লক্ষ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ছয় লক্ষে, এর ৪০%-র বেশি মহিলা । বামেদের চাপে, ফরাসি দক্ষিণপন্থা নিজে থেকেই সোশাল ডেমোক্রেটিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং দ্রুত পুঁজিবাদী উন্নতি এবং মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার সোশাল ডেমোক্রেটিক বৃদ্ধি এবং সামাজিক বিন্যাস অনেক চরম-বিপ্লবীকে কমিউনিস্ট উত্তরাধিকার পরিত্যাগের দিকে নিয়ে যায় এবং সেই স্বপ্নের পরিচর্চা শুরু হয় যাকে বলা যেতে পারে ‘মানবিক মুখ সম্পন্ন পুঁজিবাদ’।
ইতোমধ্যে, ১৯৫৪ এবং ১৯৬১-র মধ্যে ফ্রান্স দুটি ঔপনিবেশিক যুদ্ধে পরাস্ত হয়। বামেরা ওই যুদ্ধগুলি এবং মার্শাল পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল। এই দুই যুদ্ধে পরাজয় থেকে উদ্ভূত দক্ষিণপন্থী ক্রোধ-উন্মাদনা বামেদের নিশানা করে। দুদিকে থেকে তারা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হয় : একদিকে দক্ষিণপন্থী তীব্র প্রতিক্রিয়া, এবং অন্য দিকে ‘নয়া বামেদের’ দাবি যে তারা আরো বেশি র্যাডিকাল। ১৯৬৮-র ফরাসি বিক্ষোভ, যুদ্ধোত্তর ইউরোপের সর্ব বৃহৎ সামাজিক অভ্যুত্থান, বিস্ফোরিত হলো এই সমস্ত কিছুর মধ্য থেকে, এমন মাত্রায় যা সরকারকে এমন ঘাবড়ে দিয়েছিল যে সরকার ন্যাটো বাহিনী ডেকে আনার হুমকি দেয়। পিসিএফ-র প্রত্যয় ছিল যে ন্যাটো পশ্চিম ইউরোপের অন্যতম মুখ্য রাষ্ট্রে বৈপ্লবিক রূপান্তর অনুমোদন করবে না, এবং ফরাসি জনগণ সশস্ত্র সংঘর্ষের জন্য একেবারেই প্রস্তুত নয়। তারা সতর্কতা এবং সুশৃঙ্খল পশ্চাদপসরণের যুক্তি দিল। তাদেরকে দোষী করা হলো সংস্কারবাদে, আমলাতান্ত্রিকতা, বিশ্বাসঘাতকতায় এবং অন্যান্য এমন সমস্ত পরিভাষায়।
এই হলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেখান থেকে উত্তর-আধুনিকতাবাদ ফ্রান্সে আধিপত্য অর্জন করে। ইতোপূর্বের মার্কিন উত্তর-আধুনিকতাবাদের কাছ থেকে অনেক কিছু ধার করে ওখানকার শিক্ষা জগতের এক বিরাট সহায়তায়।
আমরা যখনই ধারণার দিকে তাকাব, এটা লক্ষ্য করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে রাজনীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতাবাদী ধারণা দাঁড়িয়ে আছে উন্নত পাশ্চাত্যের যুদ্ধোত্তর পরিবর্তনগুলি সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়ার উপর। ভারতে তাদের জনপ্রিয়তা বেমানান, এই বিবেচনায় যে এমন একটা দেশ যেখানে শিল্প বিকাশ নিজেই একটা এলোমেলো বিষয়, এবং যেখানে জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশই বাস করে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায়। এই দেশকে এই ধারণা দিয়ে বোঝা অসম্ভব। উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রস্তাবনা হলো শিল্পভিত্তিক শ্রমিক শ্রেণির আয়তনে সংকোচন হবে। ঘটনা হলো দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন হয়ে ভারত এবং মিশর থেকে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ১৯৫০-র পরবর্তী সময়ে সর্বহারার নিরঙ্কুশ প্রসার ঘটেছে, সুনির্দিষ্ট করে সেই দশকগুলিতে যখন উত্তর-আধুনিক ধারণাগুলি সূত্রায়িত হচ্ছে। ভারতে শিল্পে কর্মী-নিযুক্তি বন্ধদশায় উপনীত হয় নয়া উদারীকরণ শুরু হবার পর।
এমন কি উন্নত পশ্চিমেও, এই ধারণা যে শ্রমিকশ্রেণি এতটাই বিত্তশালী হচ্ছে যে সে ‘মধ্যবিত্তে’ পরিবর্তিত হচ্ছে, তা অবাস্তব বলে প্রমাণিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৯৭০-এ, একবার যখন এই বৈভবের কাল শেষ হয়েছে, ১৯৭১ থেকেই খোদ আমেরিকায় মজুরি চল্লিশ বছরের বন্ধদশায় এসে গেছে এবং ২০০৮-১২-র সাম্প্রতিক সঙ্কটের সময়ে নিজ গৃহের মালিকানা, সুস্থির কর্মনিযুক্তি ইত্যাদি অতিকথনের বুদবুদ ফেটে গেছে। আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য বাস্তবতা সম্পত্তি নয় বরং বিরাট অঙ্কের ব্যক্তিগত দেনা।
উত্তর-আধুনিকতাবাদের আরো কয়েকটি দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক ধারণার সার-সংক্ষেপ করার আগে একটা চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেব। কিছু মার্কিন উত্তর-আধুনিকতাবাদী আগে ট্রটস্কি-পন্থী ছিলেন কিন্তু। আমেরিকায় কখনোই মার্কসবাদ এবং কমিউনিস্ট ধারণা চর্চার শক্তিশালী কেন্দ্র ছিল না। তাই, তাঁরা উদারবাদী মূলধারার সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থান অনেক সহজে নিতে পেরেছিলেন। ফ্রান্সে মার্কসবাদ এবং কমিউনিজম শক্তিশালী ঐতিহ্য এবং প্রভাব নিয়ে ছিল। অন্যতম একটা বিষয় যা ভারতীয় পাঠকদের বিভ্রান্ত করে থাকবে, তা হলো ফরাসি উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের লেখাপত্রে অনেকটা মাত্রায় মার্কসীয় পরিভাষার ব্যবহার। যেমন, এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত দেরিদা নিজেকে বর্ণনা করেন মার্কসের ‘উত্তরসুরি’ হিসাবে।
এবার এদের কিছু দার্শনিক ধারণার দিকে নজর দেওয়া যাক। লিয়োতার যে কোন কারণেই হোক একজন প্রতিনিধি স্থানীয় ব্যক্তিত্ব কারণ তাঁর কাজ প্রাসঙ্গিক সমসাময়িক উত্তর-আধুনিকতা, মার্কসবাদ বিরোধী রাজনীতির সমস্ত মুখ্য প্রসঙ্গগুলি স্পর্শ করে গেছে। তাই, তাঁর বিষয়ে আমি অন্যান্যদের থেকে বেশি মন্তব্য করবো।
তাঁর প্রভৃত প্রভাবশালী বই ‘The Postmodern Condition (1979)’-র ভূমিকায় লিয়োতার উত্তর-আধুনিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন জ্ঞানদীপ্তির তিন মৌলিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করার প্রক্রিয়া হিসেবে। এই তিন হলো : তত্ত্ব (Dialectics- হেগেল সম্পর্কিত ), যুক্তি (Reason দেকার্ত এবং কান্ট সম্পর্কিত) এবং রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্ত সামাজিক সংগঠনের ভিত্তি এই ধারণা (মার্কস সম্পর্কিত)। জ্ঞানদীপ্তির আশাবাদকে একেবারে ফালতু ধরে নিয়ে মানবতার যে ধারণা তার নিজের বন্ধন মোচনের লক্ষ্যে কার্যকরী হয় যুক্তিগ্রাহ্য চিন্তা (কান্ট) এবং শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী কার্যক্রমের (মার্কস) মাধ্যমে, তাকেও তিনি বাতিল করেছেন। তিনি এই খারিজ করা আরও চালিয়ে যান যাকে তিনি বর্ণনা করেছেন 'ইতিহাসের একমাত্রিক অবসান এবং একমাত্র কর্তৃপদের অবসানে’। ইতিহাসের একমাত্রিক অবসান বলতে লিয়োতার বুঝিয়েছেন হেগেলীয় তত্ত্ব যে ইতিহাসের সত্যিকারের প্রবণতা হলো বিশ্বজনীন মুক্তির অনুসন্ধান। সাথে সাথে মার্কসীয় ধারণা যে প্রকৃত বিশ্ব ইতিহাসের সূচনা হতে পারে কেবলমাত্র পুঁজিবাদের উৎপাটনে এবং এর পরিবর্তে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম প্রতিষ্ঠায়। একটা কার্যকরী কর্তৃপদের ধারণা বলতে তিনি উল্লেখ করেছেন মার্কসীয় মতাদর্শ শ্রেণি সংগ্রামই ইতিহাসের চালিকাশক্তি এবং বৈপ্লবিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে সর্বহারা হলো কেন্দ্রীয় সামাজিক শ্রেণি (ইতিহাসের কর্তৃপদ)। যে কোনো পুঁজিবাদী সামাজিক বিন্যাসে পুঁজিপতি শ্রেণি হলো সামগ্রিকভাবে শাসক শ্রেণি— এই মার্কসীয় তত্ত্ব একইভাবে তিনি বাতিল করেন। এর পরিবর্তে তিনি নিয়ে এলেন।
‘শাসক শ্রেণr আছে এবং সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাসম্পন্ন শ্রেণf হিসাবে থেকে যাবে, যদিও এখন এটা আর কোন প্রথাগত রাজনৈতিক শ্রেণf হিসাবে গঠিত নয়, বরং কর্পোরেট পরিচালক, উচ্চস্তরের প্রশাসক, বিভিন্ন পেশাদারি, শ্রমিক, রাজনীতিক এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলির প্রধানগণ মিলে একটা বহুধা মিশ্র স্তর। জাতি-রাষ্ট্র, দল, পেশা, প্রতিষ্ঠান এবং চিরায়ত ঐতিহ্যগুলির মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বকারী অক্ষ তাদের আকর্ষণ হারাচ্ছে।’
নয়া শাসক শ্রেণির এই সংজ্ঞা সরাসরি নেওয়া হয়েছে ১৯৫০-র আমেরিকান রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব থেকে, কিন্তু তিনি এখানে সংযোজন করেছেন এই ধারণা যে জাতি-রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলগুলি তাদের বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে এই নতুন, উত্তর-আধুনিক ধাঁচের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় - এমন একটা ধারণা যা ব্যাপকভাবে ব্যাপ্তিলাভ করবে পরবর্তী বছরগুলিতে একদিকে বিশ্বায়নের বাগাড়ম্বরে এবং এনজিও-গুলির বিশ্বময় প্রসারে, তথাকথিত সামাজিক আন্দোলনগুলিতে, নানা ধরনের পরিচিতিসত্তার রাজনীতি এবং এরকম আরও মাধ্যমে।
লিয়োতার তাঁর বিখ্যাত বই প্রকাশ করেন ১৯৭৯-তে। সময়টা হলো পিনোশে এবং মার্গারেট থ্যাচার চিলি এবং ব্রিটেনে নয়া উদারনীতি চালু করার পর, চীনে দেঙ তাঁর সংস্কার কর্মসূচি ঠিক চালু করার মুহূর্তে, এবং রেগান ক্ষমতায় আসার ঠিক এক বছর আগে। স্যোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টিগুলির বিভিন্ন প্রজাতিগুলি, ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যত্র, শীঘ্রই শামিল হবে নয়া-উদারনীতির সমর্থনে। এই সময়ে ঘটমান পরিস্থিতির উপর লিয়োতারের সমর্থনকারী মতামত নির্দেশ করে নয়া উদারবাদী ধারণা এবং রাজনীতির পক্ষে তাঁর ক্রমবর্ধমান উদ্দীপনাকেই, ‘বিশ্ব বাজার পুনরায় খুলে যাওয়া, তেজী অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুনরাগমন, আমেরিকান পুঁজিবাদের একচ্ছত্রতার অবসান, সমাজতান্ত্রিক বিকল্পের অবক্ষয়, চীনের বাজার খুলে যাবার একটা সম্ভাবনা - এই রকম অনেকগুলি উপাদান ইতিমধ্যেই ১৯৭০-র শেষের দিকে, ১৯৩০ থেকে যে ভূমিকায় রাষ্ট্র অভ্যস্ত ছিলো তার পূর্ণমৃল্যায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। তার বদলে বিনিয়োগ বিষয়ে পথ প্রদর্শন এবং এমনকি নির্দেশনার ভূমিকা সামনে এসে যায়।’
এবং, এমনকি, আরো স্পষ্ট ভাষায়: ‘... দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল থেকে পদ্ধতি এবং প্রযুক্তি যে ভাবে মুকুলিত হয়েছে..... তাকে আরো দেখা যেতে পারে ১৯৩০-৬০ সময়কালে কেইনসবাদের রক্ষাকবচে। এর পশ্চাদপসারণের পর উন্নত উদারবাদী পুঁজিবাদের পুনর্বিন্যাসের ফলাফল হিসাবে, একটা পুনর্নবীকরণ যা অপসারিত করেছে কমিউনিস্ট বিকল্প এবং পণ্য ও পরিষেবার ব্যক্তিগত ভোগকে আরো তেজী মর্যাদা দিয়েছে।”
এই পরের অধ্যায়ের মূল শব্দটা হলো ‘পুনর্নবীকরণ’। কেইনসবাদের নিয়মাবলী পুঁজিবাদের জীবনীশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কিন্তু এখন ‘উন্নত অপর পুঁজিবাদের পুনর্বিন্যাস’ পুঁজিবাদের পুনর্নবীকরণ ঘোষণা করছে, এবং তা উৎখাত করেছে ‘কমিউনিস্ট বিকল্পের’। নয়া উদারবাদী জমানার একবারে প্রত্যুষকালে, এমনকি রেগানের ক্ষমতায় আরোহণেরও আগে থেকে একবারে সাম্প্রতিক ফরাসি উত্তর-আধুনিক দর্শন নিয়ে লিয়োতার এভাবে একজন নয়া উদারবাদী। অন্যান্য উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা আরো অন্যান্য ধারণা যোগ করেছেন। অথবা, নয়া উদারবাদের প্রশংসায় এদের কেউ কেউ যেমন দেরিদা এতো দূরে যেতে পারেননি। উত্তর আধুনিক রাজনীতির অত্যাবশ্যক কাঠামো এইরকম। তাই আমি সংক্ষেপ করবো অন্যান্য কেতাদুরস্ত নামগুলি নিয়ে।
ফ্যুকো, উদাহরণ হিসাবে, কোন অবস্থাতেই নয়া উদারবাদী ছিলেন না কিন্তু তিনি জোরের সাথে সওয়াল করেন যে ‘ ইতিহাসের কোন বর্ণনাই দাঁড় করানো সম্ভব নয় রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের যমজ অবস্থান থেকে’। এভাবে এক ঝটকায় খারিজ করে দেন ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বুনিয়াদী বিষয়গুলি। তাঁর বক্তব্য, অর্থনৈতিক ক্ষমতা হল অনেক ধরনের ক্ষমতার মধ্যে একটা এবং রাষ্ট্র হলো অনেকগুলি অন্যান্য সামাজিক কর্তার (actor) মধ্যে এক ধরনের কর্তা মাত্র। তাঁর মতে, অনেক ধরনের ‘অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (apparatuses) এবং ব্যাখ্যানমালা ( discourses) রয়েছে যৌনতা পরিচালনায়, নজরদারি এবং কারাদণ্ডে, ঔষধের, আইন ইত্যাদিতে - এবং প্রত্যেকটির প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রতিব্যবস্থা (countering)। তাই তিনি সওয়াল করেছেন সমস্যা-ভিত্তিক (issue based) অনু-রাজনীতির (micro-politics), একটা ধারণা উদাহরণ স্বরূপ যা এনজিও-দের জন্য আকর্ষণীয়। নেই কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো ইউনিয়ন, টেঁকসই সংগঠিত প্রতিরোধের কোনো অবয়ব, কোন একত্রীকরণ কেন্দ্র, কারণ এই সমস্ত অবয়বগুলি হলো প্রকৃতিগতভাবে এবং সম্ভাব্য ‘একচ্ছত্রবাদী’।
দেরিদা আরো বেশি জটিল। বাহ্যত, তিনি কখনোই মার্কসের সম্পর্ক ত্যাগ করেননি। তথাপি, তিনি কমিউনিজমের সমগ্র ইতিহাসকে নিন্দা করে গেছেন। এর বিরুদ্ধে তিনি যে মত সামনে নিয়ে এলেন তা হলো আন্তর্জাতিকের (International) একটা ধারণা, মার্কসবাদীদের চেনা আন্তর্জাতিকের ধারণা থেকে যা অনেক দূরের ‘নয়া আন্তর্জাতিক কোনো পরিচিতিপত্রহীন এবং নামহীন, একেবারে খোলা (public), ... কোন সমন্বয় নেই, রাজনৈতিক দলহীন, রাষ্ট্রহীন, কোন জাতি সম্প্রদায়হীন, ... সহ-নাগরিকত্বহীন, এক সাধারণ শ্রেণিতে অবস্থানহীন, .... প্রতিষ্ঠানহীন এক মিতালি, এই মৈত্রীবন্ধন কখনোই পার্টির রূপ নেবে না বা শ্রমজীবীদের আন্তর্জাতিকে পরিণত হবে না, বরং .... সমালোচক হবে আন্তর্জাতিক আইনের, রাষ্ট্রের ও জাতিসত্তার ধারণার এবং আরো কিছুর ।’
এই সুত্রায়নের ইঙ্গিত হলো চূড়ান্ত ধরনের এক নৈরাজ্য, বর্তমান সময়ে বিশ্ব সামাজিক ফোরামে, বিভিন্ন ধরনের পরিচিতিসত্তার রাজনীতিতে, এনজিও-দের নেটওয়ার্কে, সামাজিক আন্দোলনগুলিতে এই রাজনীতির নমুনা পাওয়া যাচ্ছে।
ভারতে প্রভাব
প্রথমে আমেরিকায় এবং পরে ফ্রান্সে ও ইউরোপের অন্যত্র রমরমা হলেও স্বাধীনতার পরের প্রথম তিন দশকে উত্তর-আধুনিকতাবাদের কোনো প্রভাব ভারতে ছিল না। এর মুখ্য কারণ হলো জরুরি অবস্থা জারির পূর্ব কাল পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এং পুঁজিবাদের অনুদ্বিগ্ন বিকাশের জন্য ভারতের এই মডেলটি তখন পরিচালিত হতো প্রধানত অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের লক্ষ্যে, আন্তর্জাতিক বাজারের এবং বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে গ্রন্থিত হবার জন্যে নয়। অর্থনৈতিক কাঠামোর ও রাজনৈতিক বিন্যাসের এই আপেক্ষিক স্বাধিকারের পূর্ণ প্রতিফলন দেখা গেছে দেশের বৌদ্ধিক জীবনের আপেক্ষিক স্বাধিকারে।
পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদ, মূলত কৃষিনির্ভর এক দেশ যা সদ্য ঔপনিবেশিক শোষণ মুক্ত হয়েছে, এমন একটা পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক ভাবনায় নেহরুবাদী চিন্তায় রাষ্ট্রের নেতৃত্বে উন্নয়ন ছিল ‘ফ্যাবিয়ান সমাজতান্ত্রিক’, ‘কেইনসবাদী’ এবং ‘স্যোসাল ডেমোক্রেটিক’। সমাজ বিজ্ঞানের বিচারে, ভারতবর্ষ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ রাষ্ট্র, যেটা আমাদের ঐশ্বর্যবান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে, কিন্তু সাথে সাথে তা ভিতর থেকে টুকরো টুকরো করতে আভ্যন্তরীণ এবং বহিস্থ শত্রুভাবাপন্ন শক্তির লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে। এটাই ছিল পরিপ্রেক্ষিত যার কারণে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতিগত ন্যায় (caste justice) এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোটনিরপেক্ষতা সূচনার বছরগুলিতে ভারতীয় আধুনিকতা নির্মাণ প্রকল্পে রাষ্ট্রের আদর্শগত সুত্রায়নের একেবারে কেন্দ্রস্থল দখল করে ছিল। এখানে অপরিহার্য ধারণা ছিল জাতীয়তার ধারণা। এর অর্থ হলো, প্রথমত, জাতীয় ঐক্যের ধারণা অধিকন্ত অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য, ধর্মনিরপেক্ষতাকে সবার উপরে রাখা হলো প্রাথমিক নাগরিক মূল্যবোধ হিসাবে, সমস্ত ধরনের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে। নির্বাচনী পরিসরে প্রধান রাজনৈতিক বিন্যাস - কংগ্রেস প্রধান্যকারী পার্টি, কিছু রয়েছে কমিউনিস্টরা, আর এস এস তাদের রাজনৈতিক ফ্রন্টের মাধ্যমে ইত্যাদি, এদের পারস্পরিক পার্থক্য স্পষ্ট ছিল তাদের মতাদর্শগত অবস্থানে। ভোটের গণতন্ত্র তুচ্ছ প্রথামাফিক ছিল না, যেমনটা আজকাল মোটামুটি হয়ে গেছে, এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু ছিল।
এটাকে বিবেচনা করা যেতে পারে সুস্পষ্ট প্রকল্প হিসাবে। বিশেষত ভারতীয় বুর্জোয়া আধুনিকতার, কিছু অংশ তখনো সম্পর্কিত প্রায় ৪৭ স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন আন্দোলন সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষার সাথে। এই কারণে ভারত রাষ্ট্রের এবং অর্থনৈতিক সংস্থানের ওই পর্বতে নিয়মিত নিন্দা বা সম্মান করছে ভারতের সেই সমস্ত মূল ধারার আমেরিকান বৃত্তিপ্রাপকরা, সাধারণভাবে নয়া উদারবাদীরা (পশ্চিমী এবং সমানভাবে ভারতীয়), হিন্দু সাম্প্রদায়িকরা (যারা এমনকি গান্ধীজীর কিছু অংশ মেনে নিতে পারে কিন্তু ঐ সময়ের ধর্মনিরপেক্ষতা, বাম ঘেঁষা আধুনিকতা নৈব নৈব চ), এবং ভারতীয় উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা (নিম্নবর্গ-মতবাদীরা, আশিস নন্দী প্রমুখ)। অবশ্যই বুর্জোয়া আধুনিকতার এই নমুনা বিষয়ে কমিউনিস্টদের সমালোচনা আছে, সেটা বহাল রাখতে হবে এবং উন্নত করতে হবে, কিন্তু ওই কমিউনিস্ট সমালোচকদের নিম্নবর্গ-মতবাদী, সাম্প্রদায়িকতাবাদী এবং অন্যান্য দক্ষিণপন্থী সমালোচকদের থেকে পরিষ্কারভাবে সীমানা টেনে পৃথক করতে হবে।
ভারতীয় আধুনিকতার ঐ ধারণা স্বাধীনতার পরের সিকি শতাব্দী পর্যন্ত আধিপত্য করেছে। পরবর্তী ২৫ বছরে, মোটামুটি ১৯৭৫ থেকে ২০০০, এটা পরিত্যক্ত হয়। এই বিরাট পরিবর্তনের দিক নির্দেশ করে তিনটি বিভাজিকা নির্দেশক ঘটনায় : (১) জরুরি অবস্থার পরে, জনতা সরকারের মাধ্যমে আর এস এস-র সরকার পরিচালনায় নাটকীয় প্রবেশ (২) ১৯৯০-র দশকের সূচনায় মনোহনের নয়া-উদারনৈতিক সংস্কার, এবং (৩) ১৯৯০-র শেষদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী শাসক দল হিসাবে বিজেপি-র উত্থান। এই শেষের পর্বে পশ্চিমী এবং দেশজাত উত্তর-আধুনিক ধারণাগুলি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। দার্শনিক ভাবনার দিক থেকে, ভারতীয় উত্তর-আধুনিকতাবাদের স্বকীয়তা একেবারে শূন্য, এটা একেবারে পশ্চিমী আভা গার্দ (নব্যপন্থী আন্দোলনকারীদের অগ্রবাহিনী)-দের থেকে ধার করা, যুক্তিবোধ সম্পর্কিত জ্ঞাননীতির ধারণা, বিশ্বজনীনতা, প্রগতি এবং আরো সতর্কতার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে এদের বিদ্রোহ। রাজনৈতিক তত্ত্বে, একই ভাবে আমলাতান্ত্রিক যন্ত্র আখ্যা দিয়ে খারিজ করা হচ্ছে রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোয় রাজনৈতিক দলগুলি, ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ, সংসদীয় গণতন্ত্রকে। সামনে আসছে স্থানীয়, সমস্যা-ভিত্তিক, গোষ্ঠী-ভিত্তিক সংগঠন, পারস্পরিক সম্পর্কের কাঠামোগুচ্ছ। যদি পশ্চিমী উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা কমিউনিজমকে নস্যাৎ করে ‘একচ্ছত্রবাদী’ অপবাদে, ভারতীয় উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা একে নস্যাৎ করে স্বৈরতান্ত্রিক এবং স্তালিনবাদী অপবাদে। আধুনিকতাকে এই ভাবে খারিজ করতে থাকা প্রায়শই নিয়ে যায়। প্রাক-আধুনিক কল্পনা বিলাসিতায় জাতি সংক্রান্ত বিষয়ে, পরম্পরায়, ধর্মীয় আচরণবিধিতে যেন এগুলিই ‘প্রামাণ্য’। উদাহরণ হিসাবে, যদি ফুকো ইরানের ধর্মীয় পুরোহিতদের স্তুতি করে প্রবন্ধ লেখেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, নিম্নবর্গীয়-চর্চাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার আধুনিক ধারণাগুলির বিরুদ্ধে প্রাক-আধুনিক সম্প্রদায়গুলির কল্পিত ‘ধর্মীয় সহিষ্ণুতা’র পক্ষে লেখেন; তিনি এর পর সওয়াল করতে শুরু করেন স্ব-নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয়-সম্প্রদায়গুলির ধারণা বিষয়ে, যা সমতানুসারী ধর্মনিরপেক্ষতার জাতি-রাষ্ট্রীয় ধারণার বিরুদ্ধে যায়।
ভারতে এই উত্তর-আধুনিক রাজনৈতিক ধরন স্বভাবগত ভাবে আকার নেয় ‘সামাজিক আন্দোলনে’ (social movements), ‘নাগরিক সমাজ সংগঠনে’ (civil society organizations ) এবং অনুদান প্রাপক এনজিও-তে। এই পরিভাষাগুলি অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরোধিতা করা হচ্ছে ‘সামাজিক আন্দোলন’ দিয়ে। রাজনীতি রাষ্ট্র ক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়গুলি চর্চা করে, কিন্তু যদি যে কোন ধরনেরই রাষ্ট্রকে নস্যাৎ করা হয় দুর্নীতির জগৎ এবং আমলাতান্ত্রিক ধান্দাবাজির যুক্তি দেখিয়ে, তখন সমস্ত প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, এমনকি বামপন্থী দলগুলিকেও দুর্নীতির অংশ এবং পৃথক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসাবে দেখানো যায়। তখন ‘রাজনৈতিক’ বিষয়টা ‘সামাজিক’ বিষয় দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়; তারপরে অভীষ্ট হল ভিন্ন ধরনের কোন রাষ্ট্র ক্ষমতার লক্ষ্যে কাজ না করা, পরবর্তীতে, তাদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে ব্যক্তি, স্থানীয় গোষ্ঠী এবং সামাজিক গ্রুপগুলির ক্ষমতায়নই লক্ষ্য। একই বিষয় প্রয়োগ করা হয় ‘নাগরিক সমাজ’ সংগঠনে এবং ‘পিপলস মুভমেন্টে’। ‘নাগরিক সমাজ’-কে জনগণের সাথে সমার্থক করে দেখানো হচ্ছে, এবং পৃথক করা হচ্ছে ‘রাষ্ট্র’-র সাথে। ‘জনগণ' পরিভাষাটি ব্যবহার করা হচ্ছে শ্রেণি বিভাগকে অতিক্রম করতে, শ্রেণিকে বলা হচ্ছে সঙ্কীর্ণ এবং বিচ্ছেদ সৃষ্টিকারক বিষয়। যদিও ‘জনগণ’ নিজেই একটা ছাতার মতো পরিভাষা যা উপেক্ষা করে একক-সমস্যা পরিচিতি গ্রুপ গঠনে। প্রত্যেক গ্রুপের তখন থাকবে তার নিজস্ব সামাজিক আন্দোলন এবং সমস্ত স্বতন্ত্র সামাজিক আন্দোলনগুলি চেষ্টা করতে পারবে এবং সমন্বয় করতে পারবে তাদের সক্রিয়-কর্মীদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে, কোন রকমের সাংগঠনিক বা আদর্শগত কেন্দ্র ছাড়াই। এসব সহজসাধ্য করে আর্থিক উৎসের এক জটিল সম্পর্কজাল; বৈদেশিক অনুদান (বিশ্ব ব্যাঙ্ক, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, স্ক্যানডিনাভিয়ান সরকার, জার্মান ফাউন্ডেশন ইত্যাদি), ভারতীয় কর্পোরেটদের অকাতর দান এবং বাস্তবিক অর্থে রাষ্ট্রীয় তহবিল প্রবাহিত হচ্ছে এন জিওদের দিকে। যেহেতু নয়া উদারবাদী রাষ্ট্র অগ্রসর হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রের সমস্ত দিকগুলি উঠিয়ে দিতে, অসংখ্য এনজিও এগিয়ে আসছে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে। পরিণতিতে সরকারের নিজের কাজগুলি বেসরকারিকৃত হচ্ছে। অধিক থেকে অধিকতর কাজ চুক্তিতে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, স্বল্প এবং অতি স্বল্প মানুষকে স্থায়ী সরকারি চাকুরি দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় স্তরে সামাজিক কাজ এবং রাজনৈতিক সমাবেশ ১৯ শতকের পুরানো সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সময় থেকেই হয়ে আসছে। সমস্ত রাজনৈতিক দলই এই ধরনের কাজগুলি করে, বিশেষত বামপন্থী দলগুলি। এই যুগে এনজিও এবং সামাজিক আন্দোলন ইত্যাদির মধ্যে নতুন কি আছে? যা করা হচ্ছে তা হলো সমষ্টিগত প্রতিনিধিত্বের ঐতিহাসিক ধরন যেমন পার্টি এবং ইউনিয়নের বিপরীতে রাখা হচ্ছে স্থানীয়কে, এবং ‘সমাজ’-কে মুখ্যতা দেওয়া হচ্ছে রাজনীতির উপরে।
ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে উত্তর-আধুনিক ভাবনা সঞ্চারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের পাশ্চাত্য প্রশিক্ষণ, প্রাথমিকভাবে মার্কিনী ধরনের জ্ঞান। বুদ্ধিজীবীদের উপরের স্তর প্রশিক্ষিত হচ্ছে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে, একই ভাবে নিচের স্তরের প্রশিক্ষণ হচ্ছে ঐ পথ ধরে ভারতের মধ্যেই, প্রায়শই মহানগরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রশিক্ষিত অধ্যাপকদের দ্বারা। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে, যখন বিদেশি এজেন্সিগুলি সরাসরি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভাগগুলিকে অর্থ সাহায্য দিতে শুরু করেছে, এই বরাদ্দ প্রায়শ ব্যবহার করা হচ্ছে উত্তর-আধুনিকতাবাদী গতিমুখ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদ্ধতিগুলি অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রমের কাঠামো পুনর্বিন্যাসে। উদাহরণ হিসাবে, এখন উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রধান ধারণাগত ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে নয়া সম্মানবাহী পঠন-পাঠন কার্যক্রমগুলি সংগঠিত হচ্ছে - যেমন মানবী চৰ্চা (Women's Studies), লিঙ্গ চর্চা (Gender Studies), দলিতচর্চা (Dalit Studies), এমনকি পরিবেশ চর্চা (Environmental Studies)। এই সমস্ত বিষয়গুলিতে নিম্নবর্গীয় চর্চা গ্রুপ অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছে উত্তর-আধুনিক ধারণা বিস্তারে, কেবলমাত্র ইতিহাস বিভাগেই নয়, এমনকি সমাজ বিজ্ঞান বিভাগেও।
এই গোষ্ঠীর জটিল ইতিহাস বিস্তারিত চর্চা করার এটা জায়গা নয়। কয়েকটা মন্তব্যই যথেষ্ট হবে। এই গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৮২-তে এবং অতি দ্রুত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জোটে। এর ঠিক চার বছর পরে, ১৯৮৬-তে, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোনাল্ড ইন্ডেন লিখছেন: “উপনিবেশে পরিণত হবার পর সম্ভবত এই প্রথম ভারতীয়রা তাদের নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস টিকিয়ে রাখার মতো ইঙ্গিত দিতে পেরেছে।" এর প্রায় এক যুগ পরে, ১৯৯৫-তে তাঁর বিখ্যাত বই ‘ওরিয়েন্টালাইজম’-এর নয়া সংস্করণের উত্তরকথনে এডওয়ার্ড সইদ নিম্নবর্গবাদীদের চিহ্নিত করেন এই বলে যে তাদের নিজস্ব উত্তরাধিকার তাদেরই বহন করে চলতে হবে। এর সূচনার দিনগুলিতে, এই প্রকল্প নিজেকে চিহ্নিত করেছিল মার্কস, গ্রামশির অনুগামী হিসেবে। যেইমাত্র এর খ্যাতি আন্তর্জাতিক এবং মার্কিনী হলো, মার্কসবাদের সাথে এর বিচ্ছেদ প্রকাশ্যে এলো এবং ইউরো-আমেরিকান উত্তর-আধুনিকতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা স্বীকৃতি আরো বেশি করে ঘোষিত হল। (এডওয়ার্ড সইদ নির্দিষ্টভাবে রণজিৎ গুহকে উত্তর কাঠামোবাদী বলে উল্লেখ করেছেন)। তার পর ১৯৯০-র দশকে, যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হল এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে বিজেপি-র দ্রুত উত্থান ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় অবস্থানে সাম্প্রদায়িকতাকে নিয়ে এলো, এই গোষ্ঠীর দুই মুখ্য সদস্য, পার্থ চ্যাটার্জি এবং জ্ঞান পাণ্ডে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে ভারতীয় সমাজ বিজ্ঞানের ইতিহাসে কমিউনিস্ট বিদ্বেষী এবং নয়া-প্রাচীনপন্থীদের সুপরিচিত বৃত্তে ঢুকে গেলেন, যে গোষ্ঠীর বিখ্যাত দুই ব্যক্তিত্ব হলেন আশিস নদী এবং টি এন মদন।
নিম্নবর্গ-চর্চা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা গুহ এই গোষ্ঠীর স্বকীয়তা ব্যক্ত করতে গিয়ে এক লম্বা দাবি রেখেছেন: ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাস রচনার বিষয়টা দীর্ঘকাল ধরে আভিজাত্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে - ঔপনিবেশবাদী আভিজাত্য এবং বুর্জোয়া-জাতীয়তাবাদী আভিজাত্য’। এবং: ‘ভারতীয় ইতিহাস চর্চা বিষয়ে কখনোই কোনো ঘরানা বা ঝোঁক ছিল না যা ঔপনিবেশিক বিষয়বস্তু নিয়ে ব্রিটিশ রচনাবলির উদার ধারণার অংশীদার হয়নি। এই মূল্যায়নের ধাক্কা ( গুহের আবির্ভাবের পূর্বে এমনকি একটা ঝোঁকও ছিল না) খুব কম করে বললেও খুবই উল্লেখযোগ্য। যদিও গুহ এবং তাঁর সহকর্মীরা কখনোই আক্রমণ বা এমনকি আলোচনাও করেননি মার্কসবাদী ঐতিহাসিকদের কাজ সম্পর্কে, এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো ভারতের ইতিহাস বিষয়ে কমিউনিস্ট উপলব্ধি এবং বুর্জোয়া উপলব্ধির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যদিও বুদ্ধিগ্রাহ্য ধারণাগত পার্থক্য আছে।
রণজিৎ গুহ এবং তাঁর সহযোগীরা সমগ্র ভারতীয় সমাজকে বিভক্ত করেছেন ‘অভিজাত’ (elite) এবং ‘নিম্নবর্গীয় অংশ’ (subaltern strata) এই দুই ভাগে, এর জন্য এড়িয়ে গেছেন শ্রেণীবিভক্ত সমাজ সম্পর্কে মার্কসবাদী উপলব্ধি, পরিবর্তে তাঁরা নিয়েছেন বুর্জোয়া সমাজতত্ত্বের অস্বচ্ছ পরিভাষা। পরবর্তী পদক্ষেপে, এটা বলা হল যে পরিবেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলি অভিজাত বা নিম্নবর্গীয় হতে পারে : উদাহরণ হিসাবে, গ্রামাঞ্চলে দরিদ্রতর অংশগুলির বিচারে জমির মালিক কৃষক অভিজাতের অংশ, আবার বৃহৎ জমি মালিক বা বুর্জোয়াদের বিচারে এরা নিম্নবর্গীয়। চূড়ান্ত পদক্ষেপে বলা হল ভারতীয় রাজনীতিতে দুটি ক্ষেত্র বা গণ্ডী (domain) আছে, অভিজাতদের গণ্ডী এবং নিম্নবর্গীয়দের গণ্ডী। নিম্নবর্গীয় গণ্ডীকে বলা হয়েছে স্বশাসিত (autonomous) যেখানে নিম্নবর্গীয় অংশের নিজস্ব চেতনা এবং সক্রিয়তার ধরন আছে। ইতিহাস রচনা চর্চার এই নয়া ঘরানা এই অন্য ধরনের গণ্ডীতে বসবাসকারী মানুষের ইতিহাস রচনা করতে উদ্যোগী হয়েছে। এটা একেবারেই পরিষ্কার নয় যে কর্মসূচিগুলি ট্রেড ইউনিয়ন বা কিষাণ সভাগুলি বা কমিউনিস্ট পার্টি বা অন্যান্য গণসংগঠনগুলি নিয়েছিল তা নিম্নবর্গীদের এই গণ্ডীর অংশ কি না। এই ধরনের সূত্রায়নে, শ্রেণি এবং সংগঠন বিষয়ে উত্তর-আধুনিক চরিত্রসুলভ উপেক্ষা কাজ করেছে।
১৯৯৩-তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে দীপেশ চক্রবর্তী আদি নিম্নবর্গীয়বাদী প্রকল্পের অন্তঃস্থ চরিত্রের এই বড় আকারের পরিবর্তনের স্বীকৃতি দেন এবং এই পরিবর্তনের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন, তাঁর ভাষায়, যে আগ্রহ গায়ত্রী স্পিভাক এবং তাঁর পরে এডোয়ার্ড সইদ এই প্রকল্পে নিয়েছেন, তার কারণেই। এর প্রভাবে চক্রবর্তীর মতে, নিম্নবর্গীয়বাদ খারিজ করে মার্কসবাদের দুই বুনিয়াদী দিক : এর “শুধু অর্থনীতি নির্ভর শ্রেণি খণ্ডতাবাদ" এবং এর "বিশ্বজনীনতা”। শ্রেণী রাজনীতি এবং বিশ্বজনীনতাবাদী মূল্যবোধের এই অস্বীকৃতি এবং আধুনিকতার যুক্তিবাদ বিরোধী উত্তর-আধুনিক সমালোচনা গ্রহণ, এই গোষ্ঠীর কিছু সদস্যকে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে অন্ধ গলিতে নিয়ে ফেলেছে। সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী জন সমাবেশ সংগঠন প্রকল্পের সমালোচনা করতে গিয়ে জ্ঞান পাণ্ডে মন্তব্য করেন যে "জাতীয়তাবাদী এবং ঔপনিবেশিকতাবাদী উভয় অবস্থানেরই উৎপত্তি একই উদার মতাদর্শ থেকে যেখানে যুক্তিবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ক্রিয়াশীল হয় চিন্তার সংলগ্ন উপাদান হিসাবে।"। তিনি বলেন, ১৯৬০ থেকে একের পর এক গবেষণার পিছনে সেই ‘কারণ’ ও ‘যুক্তির’ অনুসন্ধানই চলছে... ঐতিহাসিকদের মধ্যে সর্বসম্মতি আছে যে রাজনীতি ও দ্বন্দ্বের পিছনে বুদ্ধিহীন অর্থনৈতিক যুক্তিই কাজ করছে।‘ ‘যুক্তিবোধের’ প্রয়াস এবং মৌলিকত্বের ঘাটতির কারণে পাণ্ডে যাঁদের বাতিল করেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রোমিলা থাপার, হরবনশ মুখিয়া, বিপান চন্দ্র, তণিকা সরকার, আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ার, ঊমা চক্রবর্তী, নন্দিতা হাকসার এবং আরো অনেকে। তাছাড়া, তাঁর ভাষায় ‘অসংখ্য নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী এবং নাগরিকদের অনুসন্ধান কমিটি’ তো খারিজ হচ্ছেই। নিম্নবর্গীয়বাদীরা ছাড়াও দুই জন লেখককে চিহ্নিত করে অধ্যাপক পাণ্ডে সমস্ত যুক্তিগুলির উপসংহারে বলেন তিনি প্রগাঢ় একাত্মতা অনুভব করেন দুই জনের সাথে : আশিস নন্দী এবং টি এন মদন। নন্দীর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘একটি ধর্ম-নিরপেক্ষতা বিরোধী ইশতেহার’ (An Anti-Secularist Manifesto) বিশেষ প্রশংসা পায়।
বস্তুত, পাণ্ডে সাম্প্রদায়িকতার বহিঃপ্রকাশের কারণ হিসাবে দায়ী করেন ধর্মনিরপেক্ষতাকে। ‘এটা আরো সম্ভব যে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ভারতীয় নাগরিকদের জন্য একটা ভিন্ন ধরনের (ধর্মনিরপেক্ষ) ঐতিহাসিক পরম্পরা তৈরি করায় আরো সংকীর্ণ সম্প্রদায়গত (বিশেষত ধর্মীয় সম্প্রদায়গত) দৃষ্টিতে ভারতের অতীতকে নির্মাণ করার পাল্টা কাঠামো গড়ে ওঠে।
এভাবে, তাঁর মত অনুযায়ী, এটা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বানানোর একটা উদ্যোগ যেটা সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামির ‘বিপরীত-নির্মাণ’ -এর পথে নিয়ে যায়, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হাত বাড়ানো ছিল বুনিয়াদি ভুল, সাম্প্রদায়িকতা একটা প্রতিক্রিয়া মাত্র। এটা আশ্চর্যের যে একজন ঐতিহাসিক এরকম কথা বলতে পারেন। সমস্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্ম বিকশিত হয়েছে প্রতিক্রিয়া হিসাবে তাত্ত্বিক এবং বাস্তবিক প্রতিক্রিয়া - সাম্প্রদায়িক কলহের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে। বাস্তবে পাণ্ডে আরো অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছেন এবং বলেছেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল একটা নতুন ধর্মমত যা ভারতে শুরু হয় ১৯২০-তে, এবং যে কোন ধর্মমতেরই মতো এটাও লড়াই করার জন্য একটা রাক্ষস বা দানব ঠিক করে নেয়। সাম্প্রদায়িকতা ছিল এই দানব যার আবিষ্কার হয়েছে ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদীদের যৌথ প্রয়াসে। একই ধরনের যুক্তি পাওয়া যাবে পার্থ চ্যাটার্জির লেখায়। এই যুক্তিগুলির হেঁয়ালি হলো পাণ্ডে বা চ্যাটার্জি কারোর বিরুদ্ধেই ব্যক্তিগত স্তরেও সম্ভবত সামান্যতম সাম্প্রদায়িক ঝোঁক আছে বলে অভিযোগ করা যাবে না। উভয়েই শৃঙ্খলাপরায়ণ কমিউনিস্ট বা মার্কসবাদীদের মতো ‘হিন্দুত্বের রাজনীতির’ বিরোধী। ধর্মনিরপেক্ষতার সমস্যায় যা তাঁদের ধারণার কানাগলিতে নিয়ে ফেলেছে, তা হলো বিশ্বজনীনতা, আলোকপ্রাপ্ত যুক্তিবোধের আগাম অস্বীকৃতি। ‘রাষ্ট্রবাদের ধুয়ো তুলে আরো খারিজ করা হয়েছে, জাতি, জাতীয়তাবাদ ও জাতি রাষ্ট্রের ধারণাকে, যা পাণ্ডের ভাষায় হতে পারে ফালতু অভিজাত প্রকল্প এবং যুক্তির যুগের শিল্পকর্ম। এখানে এবিষয়ে আরো গভীরে যাওয়ার অবকাশ নেই। শেষ করতে গিয়ে, এটা বলাই যথেষ্ট, ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর-আধুনিক ধারণা এবং রাজনৈতিক ধরন প্রবর্তনের প্রভাব কল্যাণদায়ক হয়নি।
প্রকাশের তারিখ: ২২-নভেম্বর-২০২২ |