|
এক পা এগোনোশান্তনু দে |
ঠিকই, এক পা এগোনো গিয়েছে। খানিক স্বস্তি। কিন্তু রয়ে গিয়েছে বিপদ। মোদীর অশ্বমেধের ঘোড়ায় ধাক্কা দেওয়া গিয়েছে। লাগাম পরানো যায়নি। হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আঁতাত কিছুটা পিছু হটলেও, অচিরেই নিজেদের পুনর্সংগঠিত করবে। পুঁজিবাদ পালন করবে তার ভূমিকা। নেবে শ্রমিক-বিরোধী, কৃষক-বিরোধী, দেশ-বিরোধী পদক্ষেপ। যেমন টেক-গুরু চন্দ্রবাবু আসতেই শেয়ার বাজার ফিরেছে নিজের ছন্দে। শেয়ার বাজার মানে লগ্নী পুঁজির প্রত্যাশার সূচক। সেকারণে কোনও মোহ নয়। জারি রাখতে হবে লড়াই। ভোট পণ্ডিতদের চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজি। দুর্বল বিজেপি এবং নীতিশ-নাইডুর সমর্থনে এনডিএ’র প্রতি লগ্নী পুঁজি হবে আরও আগ্রাসী। ভারতীয় সংস্থার সিইও-রা যেমন চেয়েছে। নতুন সরকার জারি রাখুক তার অর্থনৈতিক সংস্কার, যে নীতি নিয়ে চলছে, থাকুক তার ধারাবাহিকতা। এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ভারতের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন। পুঁজির আধিপত্যের মোকাবিলায় আরও প্রত্যয় নিয়ে চালিয়ে যেতে হবে জঙ্গী সংগ্রাম। |
মোদীর অশ্বমেধের ঘোড়ায় ধাক্কা। মন্দির-মসজিদ-মেরুকরণ নয়। জিতেছে প্রকৃত ইস্যু। আমজনতার রুটি-রুজির লড়াই। গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার শপথ। মুখ থুবড়ে পড়েছে আবকি বার ৪০০ পার। ৩৭০ তো দূরঅস্ত, তিনশ’ পর্যন্ত পেরতে পারেনি বিজেপি। এমনকি ২৭২-ও নয়। বিজেপি এককভাবে পায়নি গরিষ্ঠতা। পাঁচবছর আগের তুলনায় ৬৩টি আসন কম পেয়ে থেমে গিয়েছে ২৪০-এ। আসন সংখ্যা কমেছে ২১ শতাংশ। ২০১৪ এবং ২০১৯। পরপর দু’বার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এবার হারিয়েছে গরিষ্ঠতা। এটিই সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এনডিএ জিতেছে ২৯৩ আসনে। ইন্ডিয়া মঞ্চ ২৩৪ আসনে। দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা (৩৬২) থেকে বহু দূরে এনডিএ। দশবছর পর, আবকি বার মোদীর নিরঙ্কুশ আধিপত্য নয়। আবকি বার জোট সরকার। নীতিশ কুমার আর চন্দ্রবাবু নাইডুর সমর্থনে। কে না জানে দু’জনেই পদ্মপাতায় জলের মতো। টলমলে। এই আছি, এই নেই। সেকারণে ২০১৪, ২০১৯-র মোদী আর ২০২৪-র মোদী এক নন। মোদীকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছিল যে ‘অপারেজয়’ ভাবমূর্তি, এই নির্বাচন তাতে এক বিরাট আঘাত। দাপুটে মোদী-মিডিয়ার পরাজয়। দালাল স্ট্রিট নয়। নির্ণায়ক আমজনতার রাস্তা। জনাদেশে স্পষ্ট, কেউ পরমাত্মার পাঠানো দূত নয়। গণতন্ত্রে গণদেবতাই মুখ্য। এই রায় আসলেই গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষায় দেশের জনগণের এক নির্ভীক দৃপ্ত ঘোষণা। এবারের ভোটে ছিল না সবার জন্য সমান সুযোগ। শুরু থেকেই তার কোনও ব্যবস্থা রাখেনি নির্বাচন কমিশন। গোটা নির্বাচন পর্বে কমিশনের ভূমিকা ছিল দৃশ্যতই একপেশে। কমিশন ছিল মোদী-শাহ’র নিজের লোকে ভরা। বড় রকমের নির্বাচনী বিধিভঙ্গ হলেও, তা রোখার মতো ছিল না তাদের মেরুদণ্ড। যথারীতি প্রধানমন্ত্রী তাঁর মুসলিম-বিদ্বেষী ঘৃণা-ভাষণে ছিলেন বেপরোয়া। নেওয়া হয়নি কোনও পদক্ষেপ। নির্বাচনের তথ্য-পরিসংখ্যান নিয়েও কমিশন বজায় রাখতে পারেনি কোনও স্বচ্ছতা। তৈরি হয়েছে সন্দেহ, অবিশ্বাসের পরিবেশ। যা, এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ফেলে দিয়েছে প্রশ্নের মুখে। সেইসঙ্গেই বিরোধীদের ওপর চলেছে সংগঠিত আক্রমণ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে দু’জন মুখ্যমন্ত্রীকে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বিরোধীদল কংগ্রেস এবং সিপিআই(এম)-র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বিরোধী নেতাদের। হাজার হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ডের ভাণ্ডার নিয়ে নির্বাচন লড়েছে বিজেপি। এতসবের পরেও এই কর্তৃত্ববাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন দেশের মানুষ। মোদীকে যোগ্য জবাব দিয়েছেন। মানতে চাননি তানাশাহী। কাজ করেনি রাম মন্দিরের আবেগ। অযোধ্যার রামমন্দির যে লোকসভা কেন্দ্রের আওতায়, সেই ফৈজাবাদেই হেরেছে বিজেপি। জিতেছেন সমাজবাদী পার্টির অবধেশ প্রসাদ, জাতে দলিত। অ-সংরক্ষিত আসনে দলিত প্রার্থী দেওয়া, উত্তরপ্রদেশ, বিহারের মতো রাজ্যে রীতিমতো ‘রাডিকাল’ ব্যাপার। পাসি সম্প্রদায়ের সেই দলিত প্রার্থী শুধু জেতেননি, সবক’টি বিধানসভায় হেরেছে বিজেপি। এই প্রথম, ফৈজাবাদ সংসদে পাঠালো কোনও দলিত প্রার্থীকে। বিজেপির বহুচর্চিত স্লোগান অযোধ্যা তো ঝাঁকি হ্যায়, মথুরা-কাশী বাকি হ্যায়-র পালটা সমাজবাদী পার্টির স্লোগান ছিল: না মথুরা, না কাশী, আবকি বার অবধেশ পাসি। মানুষ তা গ্রহণ করেছেন। যে রাজ্যে রামন্দির, সেই উত্তরপ্রদেশেই হেরেছেন মোদীর ছ’-ছ’জন মন্ত্রী। শুধু মোদীর ছয় মন্ত্রী নন, হেরেছেন যোগীর দুই মন্ত্রীও। এই নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও রাজ্যের ১৬ জন মন্ত্রী রাখতে পারেননি তাঁদের বিধানসভা। ডাবল ইঞ্জিন-ই বেলাইন! বারাণসীতে মোদীর ব্যবধান গতবারের পৌনে পাঁচ লাখ থেকে কমে এসে দাঁড়িয়েছে দেড় লাখে। রাজ্যের মোট ৮০ আসনের মধ্য পঁচাত্তর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজেপি জিততে পেরেছে সাকুল্য ৩৩ আসনে (শরিকরা পেয়েছে মাত্র একটি, বিপরীতে ইন্ডিয়া মঞ্চ জিতেছে ৪৩ আসনে)। যেখানে গত লেকসভায় বিজেপি পেয়েছিল ৬২টি আসন, ২০১৪-তে ৭১টি আসন। উত্তরপ্রদেশকে বিজেপি মনে করে হিন্দুত্বের গড়। রামমন্দিরের নামে চলেছে উগ্র হিন্দুত্বের কর্মসূচী। এহেন রাজ্যেই বিজেপি-র ভোট কমেছে ৯ শতাংশ। অযোধ্যা অঞ্চলে ন’টি লোকসভার মধ্যে বিজেপি হেরেছে পাঁচটিতে। গতবার যেখানে জিতেছিল সাতটি আসনে। শুধু অযোধ্যা নয়, হেরেছে বারাণসী অঞ্চলেও। বারোটি কেন্দ্রের মধ্যে বিজেপি জিতেছে মাত্র তিনটি আসনে। হেরেছে ৯টি আসনে। অযোধ্যা, বারাণসী– হিন্দুত্বের খাসতালুকেই জমি হারিয়েছে বিজেপি। নির্বাচন-পরবর্তী লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষায় দেখাচ্ছে, ব্রাহ্মণ, রাজপুত ও বৈশ্য ভোটাররা যেখানে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, সোখানে ওবিসি, তফসিলি জাতি এবং মুসলিমরা বেছে নিয়েছেন ইন্ডিয়া মঞ্চকে। জাতভ-সহ তাঁর মূল সমর্থন ঘাঁটিতে জমি হারিয়েছে বিএসপি। মায়াবতীর দলের এই ভোট প্রচুর পরিমাণে পেয়েছে ইন্ডিয়া মঞ্চ। আসলে বেকারত্ব, কৃষি সংকটে কৃষকদের ক্ষোভ, মূল্যবৃদ্ধি, অগ্নিবীর প্রকল্প নিয়ে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ তৈরি করেছে পালটা ভাষ্য। কাউন্টার ন্যারেটিভ। এই প্রতি-ভাষ্যই পরাস্ত করেছে হিন্দুত্বের ভাষ্যকে। বুঝেছিলেন মোদীও। চেয়েছিলেন রুজিরুটির সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে। মুসলিমদের বেশি সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য দুষে, তাঁদের অনুপ্রবেশকারী বলে বিদ্বেষ ছড়াতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে হিন্দুদের মঙ্গলসূত্র থেকে সম্পত্তি, সব কেড়ে নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে বিলি করে দেবে বলে আতঙ্কও তৈরি করতে চেয়েছিলেন। লাভ হয়নি। উলটে সংবিধান খতর মে বলে তৈরি হয়েছিল আতঙ্ক। আর এই আতঙ্কের খেসারত দিতে হয়েছে মোদীকে। সাভারকারের দাওয়াই কাজ করেনি। জিতেছেন অম্বেদকার। সংবিধান বদলে গেলে সংরক্ষণ উঠে যাবে বলে আতঙ্কিত দলিতদের ভোটের এক বড় অংশ গিয়েছে বিরোধীদের ঝুলিতে। পাঁচবছর আগে, হিন্দি বলয়ের দশ রাজ্যে মোট ২২৫ আসনের মধ্যে বিজেপি একাই জিতেছিল ১৭৭ আসনে। স্ট্রাইক রেট ছিল ৭৮.৬৬ শতাংশ। হিন্দি বলয় মানে বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, দিল্লি আর রাজস্থান। এর মধ্যে হরিয়ানার দশটি আসনের সবক’টিতেই জিতেছিল বিজেপি। স্ট্রাইক রেট একেবারে একশ শতাংশ। যেমন জিতেছিল দিল্লির সাতটি, হিমাচলের চারটি এবং উত্তরাখণ্ডের পাঁচটি আসনের সবক’টিতে। রাজস্থানে পঁচিশের মধ্যে পেয়েছিল চব্বিশটি আসন। মধ্যপ্রদেশে উনত্রিশের মধ্যে আঠাশ। ছত্তিশগড়ে এগারোর মধ্যে নয়। ঝাড়খণ্ডে চোদ্দর মধ্যে এগারো। বিহারে চল্লিশের মধ্যে সতেরো। এবং উত্তরপ্রদেশে আশিটির মধ্যে বাষট্টি’টি আসন। এবারে, হিন্দি-বলয়ে এনডিএ পেয়েছে সাকুল্যে ১৩০টি আসন, সমর্থনের হার ৪৮.৩ শতাংশ। যেখানে ইন্ডিয়া মঞ্চ পেয়েছে ৭২টি আসন, সমর্থনের হার ৪০.১ শতাংশ। অন্যান্যরা ২৩টি আসন, সমর্থনের হার ১১.৬ শতাংশ। যেখানে পাঁচবছর আগে এনডিএ পেয়েছিল ১৯৬টি আসন, সমর্থনের হার ছিল ৫৩.৯ শতাংশ। ইন্ডিয়া মঞ্চ পেয়েছিল সাকুল্যে ১৩টি আসন, সমর্থনের হার ২৯.৭ শতাংশ। অন্যান্যরা ১৬টি আসন, সমর্থনের হার ১৬.৫ শতাংশ। বিজেপি এবারে একা পেয়েছে ১২৭টি আসন। স্ট্রাইক রেট কমে হয়েছে ৫৬.৪৪ শতাংশ। হরিয়ানায় এবারে বিজেপি জিতেছে পাঁচটি আসনে। স্ট্রাইক রেট অর্ধেক কমে হয়েছে ৫০ শতাংশ। রাজস্থানে দশটি আসন কমে হয়েছে ১৪। বিহারে সতেরো থেকে কমে ১২। ঝাড়খণ্ডে এগারো থেকে নেমে আট। হিন্দি বলয়ে এখন বিজেপি একা না, ইন্ডিয়া মঞ্চ-ও আছে! দেশের শহরাঞ্চলের (বড় শহর) কেন্দ্রগুলিতে এনডিএ-র ভোট বাড়লেও, কমেছে আধা-শহর (পুরো শহরের চরিত্র নয়), আধা-গ্রাম (পুরো গ্রামের চরিত্র নয়) এবং গ্রামীন কেন্দ্রগুলিতে। দেশের শহরাঞ্চলের (বড় শহর) কেন্দ্রগুলিতে এবারে এনডিএ-র ভোটের ভাগের হার ৫২.৮ শতাংশ, যেখানে পাঁচবছর আগে ছিল ৪৮ শতাংশ। অন্যদিকে আধা-শহর কেন্দ্রগুলিতে তা ৪২.৫ শতাংশ থেকে কমে এবারে হয়েছে ৩৯.৯ শতাংশ। আধা-গ্রাম কেন্দ্রগুলিতে ৪২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৩৭.৩ শতাংশ। আর গ্রামীন কেন্দ্রগুলিতে ৪৪.৯ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪৪.১ শতাংশ। ইঙ্গিত স্পষ্ট, মফস্বলে জমি হারাচ্ছে বিজেপি। আবকি বার– ছিল না কোনও ‘ওয়েভ’। কোনও একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে দেশজুড়ে ওঠেনি আবেগের তরঙ্গ। কাজ করেনি কোনও ব্র্যান্ড-ম্যজিক। ছিল না কোনও হাওয়া। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ছিল না কোনও সাধারণ জাতীয় ভাষ্য। কিংবা সংখ্যালঘুদের নিয়ে ভয় দেখানো বা আতঙ্ক তৈরির জাতীয় অনুরণন। কর্পোরেটের হাজারো চেষ্টার পরেও জনচিত্তে তোলা যায়নি মোদীকে নিয়ে উন্মাদনার লহর। অযোধ্যার মহাসমারোহ! ঘোর বিশ্বাস ছিল রামলালা ভোটের বাক্স উপচে দেবে। মোদী মিডিয়ার পূর্বাভাস ছিল বিপুল তরঙ্গে ভেসে যাবে বিরোধীরা। প্রথম দফাতে পৌঁছেই দেখা যায় সেই ধারণার সঙ্গে মিলছে না বাস্তব অভিজ্ঞতা। মেয়াদ ফুরিয়েছে ‘মোদী কি গ্যারান্টি’র দাওয়াই। শেষে এসে ‘মঙ্গলসূত্র’ বেহাত হয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়েও লাভ হয়নি। প্রথম দফা ভোটের দিনই আমরা বলেছিলাম: যতই মিডিয়ার পক্ষ থেকে ‘আয়েগা তো মোদী-হি’র ঢাক বাজানো হোক, ভোটারের মন পড়ে আছে বেরোজগারিতে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতিই এবারে মূল ইস্যু। বলেছিলাম, ঠিকই মোদী আছেন সর্বত্র। তবে তা আর কার্পেটের নীচে থাকা প্রতিটি ইস্যুকে চেপে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। ব্র্যান্ড-মোদীর ক্যারিশমা মলিন হতে শুরু করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষায় প্রশ্ন ছিল: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখতে চান? ৩৬ শতাংশ বলেছে রাহুল গান্ধীকে। মাত্র ৩২ শতাংশ বলেছে তাদের পছন্দ নরেন্দ্র মোদী। চার জুন। বদলে দিয়েছে অনেক কিছু। ফিরেছে সাহস। ফিরেছে প্রত্যয়। ফিরেছে আস্থা। দু’দিন বাদে চণ্ডীগড় বিমানবন্দরে তারই প্রকাশ। কঙ্গনা রানাউতকে সপাটে চড় সিআইএসএফ জওয়ান কুলবিন্দর কৌরের। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। কৃষক-কন্যা কুলবিন্দর বিলক্ষণ জানতেন পরিণতি কী হতে পারে! তবুও পরোয়া করেননি। বিজেপি-র টিকিটে মাণ্ডি থেকে নির্বাচিত সাংসদ কঙ্গনা। দিল্লি-চণ্ডীগড় যাতায়াতের জন্য এর আগেও একাধিকবার এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন। কুলবিন্দর তখনও ছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন। মনে রেখে দিয়েছেন দিল্লির কৃষক বিক্ষোভকে গিরে কঙ্গনার সেই মন্তব্য: ১০০ টাকার জন্য ওখানে গিয়ে বসেছেন কৃষকরা! কুলবিন্দর ভুলতে পারেননি সেই অপমান। ভোলার কথাও নয়। অকপটে বলেওছেন সেকথা। ইসনে (কঙ্গনা) বোলা থা না শো শো রুপিয়াকে লিয়ে ব্যাঠতি হ্যায় উহা পে, মেরি মা ব্যাঠতি থি। আমার মা-ও সেখানে ছিলেন। কিন্তু ক্ষোভ চেপে রেখেছিলেন। চার জুনের সাহস সেই অসন্তোষকে উসকে দিয়েছে। চার জুন। এক অদ্ভুতুড়ে দিন। জয়ের পরেও মানুষ শোকে বিহ্বল। অন্যদিকে পরাজয়ের পরেও মানুষ বিজয় উৎসবে। সংখ্যার হিসেবে এনডিএ-র ২৯২, ইন্ডিয়া মঞ্চের ২৩৪-র চেয়ে বড়। তবে কেন পরাজিতরা বিজয় উৎসবে? কারন, মোদীকে রুখে দেওয়া গিয়েছে। এই ফল মানুষকে ভয়ের পরিবেশ থেকে দিয়েছে মুক্তির আশ্বাস। মোদীকে হারানো যায় এই আত্মবিশ্বাস। ঠিকই, এক পা এগোনো গিয়েছে। খানিক স্বস্তি। কিন্তু রয়ে গিয়েছে বিপদ। মোদীর অশ্বমেধের ঘোড়ায় ধাক্কা দেওয়া গিয়েছে। লাগাম পরানো যায়নি। হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আঁতাত কিছুটা পিছু হটলেও, অচিরেই নিজেদের পুনর্সংগঠিত করবে। পুঁজিবাদ পালন করবে তার ভূমিকা। নেবে শ্রমিক-বিরোধী, কৃষক-বিরোধী, দেশ-বিরোধী পদক্ষেপ। যেমন টেক-গুরু চন্দ্রবাবু আসতেই শেয়ার বাজার ফিরেছে নিজের ছন্দে। শেয়ার বাজার মানে লগ্নী পুঁজির প্রত্যাশার সূচক। সেকারণে কোনও মোহ নয়। জারি রাখতে হবে লড়াই। ভোট পণ্ডিতদের চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজি। দুর্বল বিজেপি এবং নীতিশ-নাইডুর সমর্থনে এনডিএ’র প্রতি লগ্নী পুঁজি হবে আরও আগ্রাসী। ভারতীয় সংস্থার সিইও-রা যেমন চেয়েছে। নতুন সরকার জারি রাখুক তার অর্থনৈতিক সংস্কার, যে নীতি নিয়ে চলছে, থাকুক তার ধারাবাহিকতা। এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ভারতের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন। পুঁজির আধিপত্যের মোকাবিলায় আরও প্রত্যয় নিয়ে চালিয়ে যেতে হবে জঙ্গী সংগ্রাম। এই নির্বাচনে বামপন্থীদের সামান্য উন্নতি হয়েছে। পাঁচটি আসন থেকে বেড়ে হয়েছে আট। ভবিষ্যতের দিনগুলিতে শক্তিশালী বামপন্থা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আঁতাতের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তীব্র করার জন্য এটা জরুরি। প্রকাশের তারিখ: ০৯-জুন-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |