আমার পঁয়তাল্লিশ বছরের সাথী

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ
বীরভূম জেলার  কির্নাহারের নিকটবর্তী শরডাঙ্গা গ্রাম আব্দুল হালিমের  জন্মস্থান। থানার নাম নান্নুর। চেষ্টা করে হালিমের  সঠিক জন্মদিবস পাওয়া গেছে। শরডাঙ্গা গ্রামের জিল্লুর রহমান সাহেব যেদিন জন্মেছিলেন সেদিন আব্দুল হালিম ও জন্মেছিল। জিল্লুর রহমান সাহেবদের পরিবারে জন্ম-মৃত্যুর পারিবারিক রেজিস্টার রক্ষিত আছে। তা থেকে জানা যাচ্ছে যে, ১৩০৮ বঙ্গাব্দের ২০শে অগ্রহায়ণ, শুক্রবার অপরাহ্ন ২টার সময় জিল্লুর রহমান ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তার চার ঘণ্টা পরে ওই দিনই ভূমিষ্ঠ হয়েছিল আব্দুল হালিমও। খ্রীষ্টীয় সনের হিসাবে এই তারিখটি ছিল ১৯০১ সালের ৬ই ডিসেম্বর। কাজেই ১৯০৫ সালে হালিমের  জন্মাবার কথা যে কাগজে ছাপা হয়েছে তা ভুল।

২৮শে এপ্রিল (১৯৬৬) রাত্রিবেলা আমি দমদম সেন্ট্রাল জেলে পুলিসের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ আফিস হতে সেন্সর হয়ে আসা একখানা পত্র পাই। ২৩ শে এপ্রিল তারিখের এই পত্রখানা ছিল আমাকে লেখা আব্দুল হালিমের শেষ পত্র। তাতে সে আমায় জানিয়েছিল যে ১৮ই এপ্রিল, রাত্রিবেলা সে কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল হতে মুক্তি পেয়ে বাসায় ফিরেছে এবং “আমরা প্রত্যেক দিনই আপনাদের মুক্তির প্রতীক্ষা করছি।” ২৯ শে এপ্রিল (১৯৬৬) সকাল বেলা চা খাওয়ার পরে আমরা দৈনিক খবরের কাগজ পড়া শেষ করেছি, আমাদের কোনো কোনো সহবন্দী স্নান করতে গেছেন, – এমন সময়ে জেল অফিস হতে হঠাৎ বজ্রাঘাতের মতো দুঃসংবাদ এলো যে আব্দুল হালিম আর নেই। সেদিন ভোরে আকস্মিকভাবে তার হৃদয়ের স্পন্দন থেমে গেছে। শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছে আব্দুল হালিম – আমার পঁয়তাল্লিশ বছরের কাজের সাথী। আর সে জেগে উঠবে না। আমার মনের অবস্থা কী রকম যে হয়ে গেল তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। মনে হচ্ছিল আমার সমস্ত শরীর যেন অবশ-অবসন্ন হয়ে যাচ্ছে। যদিও আমি মুখ খুলে কাউকে কোনো কথা বলিনি তবুও কমরেডরা আমার অবস্থা বুঝলেন। দেখলাম আমাদের তরুণ কমরেড মহাদেব বন্দ্যোপাধ্যায় আমায় ছেড়ে কোথাও যাচ্ছেন না। সব সময়ে আমার কাছে কাছে থাকছেন। আমার চেয়ে কমপক্ষে বারো বছরের ছোট আব্দুল হালিমের  মৃত্যু-সংবাদ যে আমায় শুনতে হবে এমন কথা স্বপ্নেও আগে কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি। আমি মরে গেলে আমাকে সমাহিত করার ব্যবস্থা তো হালিমের ই করার কথা ছিল।

জেল কর্তৃপক্ষ আরও খবর দিলেন যে হালিমের  মৃতদেহকে শেষ সম্মান জানাতে যাওয়ার জন্যে গভর্নমেন্ট কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত ও আমাকে পুলিস হিফাজতে এক ঘণ্টার ছুটি মঞ্জুর করেছেন। বাইরে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। শেষ পর্যন্ত পুলিসরা এলেন একখানা ভাঙা গাড়ি নিয়ে। এই গাড়িতে আমরা কোনোরকমে ৩২-জি, ইলিয়ট রোডে হালিমের  বাসা পর্যন্ত গেলাম বটে, কিন্তু গাড়িখানা আর কিছুতেই চলতে রাজি নয়, অথচ বাড়ির গেটে আমাদের অপেক্ষায় থাকা পুলিস অফিসাররা আমাদের জানালেন যে মৃতদেহ ৩৩ নম্বর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা যখন আমাদের গার্ডদের বললাম যে অন্তত ট্যাক্সি ভাড়া করে আমাদের আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে নিয়ে চলুন তখন সাদা পোশাক পরা একজন পুলিস অফিসার তাঁর প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে এগিয়ে এলেন, এবং আমাদের তাঁর গাড়িতে যেতে বললেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই আমাদের আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে পৌঁছিয়ে দিলেন।

সেই বাড়িটি তখন লোকারণ্য। দোতলায় উঠতে আমার কষ্ট হয়। আমাকে একরকম শূন্যে তুলে ধরেই সকলে দোতলায় নিয়ে গেলেন। হলঘরে হালিমের  মৃতদেহ রাখা হয়েছিল। আমার মনে হলো গভীর নিদ্রায় সে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মৃত্যুর কোনো চিহ্ন নেই তার চেহারায়। হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাঁদের মৃত্যু হয় তাঁদের এই রকমই দেখায়।

আমার কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। মনে হচ্ছিল খানিকটা কেঁদে নিতে পারলে আমার বুকটা কিছু হালকা হতো। এই সময়ে হালিমের  মেয়ে তানিয়া ও ছেলে বিপ্লব এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার কান্নার বেগ আমি অতি কষ্টে সংবরণ করলাম। মনে হলো এই হতভাগ্য ছেলে-মেয়ে দু'টির যে অপরিমেয় শোক, তার সঙ্গে কি আর কারুর শোকের তুলনা হয়? কোন্ শৈশবে তারা মাকে হারিয়েছে। তাঁর কথা তাদের ভালো করে মনেও নেই। আব্দুল হালিমই ছিল একাধারে তাদের মা ও বাবা দু-ই। কী অনাথই না হলো তাদের দু'টিতে সেদিন!

এত দুঃসহ শোকের মধ্যেও আমি কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা পেয়েছিলাম মনে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব তাঁদের কর্তব্য সঙ্গে সঙ্গেই স্থির ক'রে ফেলেছিলেন। গত পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে আব্দুল হালিম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়েছে। তাঁর স্ত্রী অশ্রুকণাও পার্টির সব সময়ের কর্মী ছিলেন। পার্টি নেতৃত্ব এটাই স্থির করেছেন, অশ্রু ও হালিমের  ছেলে-মেয়েকে পার্টি একথাই বুঝতে দিবে যে তারা অনাথ নয়। তাদের মা-বাবা যখন পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন তখন ধরতে গেলে পার্টির কোলেই তো তারা মানুষ হয়েছে। অনাথ কেন হতে যাবে তারা?

আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে পৌঁছে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে আমাদের ২৯শে এপ্রিলের ছুটি দু'ঘণ্টার – এক ঘণ্টার নয়। তা'ছাড়া, ৩০শে এপ্রিল তারিখেও পুলিস হিফাজতে আমাদের আরও তিন ঘণ্টার ছুটি মঞ্জুর হয়েছে। সেদিন হালিমের  মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হবে।

বীরভূম জেলার  কির্নাহারের নিকটবর্তী শরডাঙ্গা গ্রাম আব্দুল হালিমের  জন্মস্থান। থানার নাম নান্নুর। চেষ্টা করে হালিমের  সঠিক জন্মদিবস পাওয়া গেছে। শরডাঙ্গা গ্রামের জিল্লুর রহমান সাহেব যেদিন জন্মেছিলেন সেদিন আব্দুল হালিম ও জন্মেছিল। জিল্লুর রহমান সাহেবদের পরিবারে জন্ম-মৃত্যুর পারিবারিক রেজিস্টার রক্ষিত আছে। তা থেকে জানা যাচ্ছে যে, ১৩০৮ বঙ্গাব্দের ২০শে অগ্রহায়ণ, শুক্রবার অপরাহ্ন ২টার সময় জিল্লুর রহমান ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তার চার ঘণ্টা পরে ওই দিনই ভূমিষ্ঠ হয়েছিল আব্দুল হালিমও। খ্রীষ্টীয় সনের হিসাবে এই তারিখটি ছিল ১৯০১ সালের ৬ই ডিসেম্বর। কাজেই ১৯০৫ সালে হালিমের  জন্মাবার কথা যে কাগজে ছাপা হয়েছে তা ভুল।

হালিমদের পৈতৃক নিবাস ছিল বর্ধমান জিলার কাটোয়া মহকুমার অধীন কেউবুড়ী গ্রামে। হালিমের  পিতামহ মুন্সী আব্দুল বাসেত সেকালের কলকাতা পুলিসের সার্কল ইন্সপেক্টর ছিলেন। তিনি স্টিমারে কলকাতা হতে কাটোয়া পর্যন্ত এসে (তখনও রেলপথ হয়নি) ঘোড়ায় চড়ে নিজের গ্রামে যাওয়ার পথে ঘোড়া হতে পড়ে গিয়ে মারা যান। হালিমের  পিতা আবুল হুসয়ন সাহেব কেউবুড়ী থাকার সময়েই প্রথম বিয়ে করেন। তাঁর সেই স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে তিনি শরডাঙ্গা গ্রামে ঘরজামাই হয়ে আসেন। হালিমের  সব ভাই-বোন এই দ্বিতীয়া স্ত্রীর গর্ভজাত। আবুল হুসয়ন সাহেব কির্নাহারের সরকার জমিদারদের ইস্টেটে চাকরি করতেন। হালিমের  খুব ছোট বয়সে তার মা মারা যান। তার বাবা যখন মারা গেলেন তখনও তার বয়স বেশি হয়নি।

মাতৃপিতৃহীন আব্দুল হালিম ও তাঁর ছোট ভাই আবুল কাসিমের প্রতিপালন ও শিক্ষার ভার পড়েছিল তাদের জ্যেষ্ঠ সহোদর শামসুদ্দিন হুসয়নের উপরে। তিনি সুশিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করে তিনি বৃত্তি পেয়েছিলেন। আমি সঠিক খবর জানিনা, শুনেছি আই এ পরীক্ষা পাসের পরেও তিনি বৃত্তি লাভ করেছিলেন। কিন্তু ভালো ছাত্র হয়েও তিনি কেন যে বি এ পাস করলেন না তা জানিনে। কেউ কেউ বলেন, ধর্মাবমাননার অপরাধে কলেজ হতে তাঁর নাম কেটে দেওয়া হয়েছিল। শামসুদ্দিন সাহেব একদিন আমাদের কয়েকজনকে কথায় কথায় বলেছিলেন যে অধ্যাপক গিলক্রাইস্ট কলেজে তাঁর শিক্ষক ছিলেন। তা থেকে বোঝা যায় যে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন। তখনকার দিনের একজন বৃত্তি পাওয়া মুসলিম ছাত্রের প্রেসিডেন্সি কলেজেই তো পড়ার কথা। শামসুদ্দিন সাহেব টাকি গবর্নমেন্ট হাই স্কুলে, রামপুরহাট হাই স্কুলে ও কির্নাহারের শিবচন্দ্র হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলেন। শেষোক্ত দু'টি স্কুলে আব্দুল হালিমও তাঁর কাছে পড়াশুনা করেছে। শামসুদ্দিন সাহেব রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনেও শিক্ষকতা করেছেন। আরও অনেক অনেক কাজ করেছেন তিনি।

আব্দুল হালিমের  পাঠ্যজীবনে শিবচন্দ্র হাই স্কুলই শেষ স্কুল। এই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষা পাস করে সে নবম শ্রেণীতে সবে উঠেছিল, এই সময়ে জ্যেষ্ঠ সহোদর শামসুদ্দিন হুসয়ন সাহেবের ব্যবহারে বিক্ষুব্ধ হয়ে সে পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। পরিবারে দারিদ্র্যের যন্ত্রণা তো ছিলই, অন্য কোনো আকর্ষণও ছিল না তার। তাই, জীবিকার সন্ধানে ঘরের বা’র হয়ে সে কলকাতায় এলো। আব্দুল হালিম যে পরে বাঙলা ও ইংরেজি লিখতে শিখেছিল সেটা ছিল অখণ্ড মনোযোগ সহকারে নিজে নিজে তার পুঁথি-পুস্তক অধ্যয়নের ফল। এই অধ্যয়ন ছিল তার নেশার মতো। তার পুস্তক-সংগ্রহ দেখলে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কলকাতায় এসে (এটা ১৯১৮-১৯ সালের কথা) আব্দুল হালিম প্রথমে হ্যারিসন লাইনের জাহাজে একটি অস্থায়ী টালি ক্লার্কের কাজ পায়। তার অল্প দিন পরেই অস্থায়ী টালি ক্লার্কেরই কাজ পেল সে এলাম্যান সিটি লাইনের জাহাজ কোম্পানিতে। তখন কলকাতার মেসার্স গ্লাডস্টোন ওয়েলী কোম্পানি ছিল এই লাইনের এজেন্ট। এই কোম্পানির অধীনেই ছিল হালিমের  চাকরি। সে দু'বছর একাজ করেছিল। খুব পরিশ্রমের হলেও এই কাজে টাকা রোজগার ভালোই ছিল। চাকরির দু'বছরে হালিম নানা লোককে নানারূপে সাহায্য করেছে। শামসুদ্দিন সাহেবের পরবর্তী তার বড় ভাই আখতার হুসয়নের টেলরিং শপ (দর্জির দোকান) ছিল। ঘর ছেড়ে কলকাতায় আসার সময়ে তিনি তাকে ক'টি টাকা দিয়েছিলেন। চাকরির সময়ে তাঁকেও হালিম কিছু টাকা পাঠিয়েছিল।

দেশে মজুর আন্দোলন আর খিলাফৎ-অসহযোগ আন্দোলন তুমুল হয়ে উঠেছিল। হালিম ক্রমে ক্রমে এই শেষোক্ত আন্দোলনের দ্বারা এত বেশি আকৃষ্ট হলো যে ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে সে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কংগ্রেস অফিসে গিয়ে ভলান্টিয়ারের খাতায় নাম লিখিয়ে আসল। ১০ই ডিসেম্বর তারিখে চিত্তরঞ্জন দাশ যখন গ্রেপ্তার হলেন তখন হালিমেরাও বহু সংখ্যক ভলান্টিয়ারসহ ধরা পড়লেন। হালিম ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিল। ১৯২২ সালে চৌরিচৌরার ঘটনার (থানা জ্বালিয়ে পুলিসকে পুড়িয়ে মারার) পরে আন্দোলনের একচ্ছত্র নেতা গান্ধীজী আন্দোলন তুলে নিলেন। ১৯২২ সালের বসন্তকালে জেল হতে মুক্তি পেয়ে অন্য শত শত ভলান্টিয়ারের মতো হাতকাটা শার্ট গায়ে দিয়ে হালিমও ঘুরে বেড়াতে লাগল।

কলকাতা, বত্রিশ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের বাড়ির দোতলায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিস ছিল আমার একটি আড্ডা। প্রতিদিন আমি ওখানে যেতামই। আব্দুল হালিম এখানে সাহিত্য সমিতির পাঠাগারে প্রায় রোজই পড়তে আসত। এখানেই তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। এটা ১৯২২ সালের জুন-জুলাই মাসের কথা। অপরকে নিজের রাজনীতিতে আনার কাজে আমি তখনও তেমন অভিজ্ঞ হইনি। তাছাড়া, টানবো তো তাকে মার্কসবাদ- লেনিনবাদের পথে। তাতেও আমি তখন দড় হয়ে উঠিনি। তবুও আলাপ করছি তার সঙ্গে। এই সময়ে একদিন আমি আমহার্স্ট স্ট্রিট আর মির্জাপুর স্ট্রিটের (এখনকার সূর্যসেন স্ট্রিটের) সঙ্গমস্থলে দাঁড়িয়ে আবদুর রজ্জাক খানের সঙ্গে কথা বলছিলাম। হালিম তখন ওইপথে হ্যারিসন রোডের (এখনকার মহাত্মা গান্ধী রোডের) দিকে যাচ্ছিল। যাওয়ার সময় সে আমাদের অভিবাদন জানিয়ে গেল। খান সাহেব বললেন, “আমি এই ছেলেটির সঙ্গে খিদিরপুর ক্যাম্প জেলে ছিলেম। ভালোই মনে হয়েছিল ছেলেটিকে। আপনি তার সঙ্গে রাজনীতিক আলোচনা করুন।” আমি খান সাহেবকে জানালাম যে তার সঙ্গে আমার দেখা হয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির পাঠাগারে। যাক, এই পরিচয়ের ভিতর দিয়ে হালিম এলো আমাদের পথে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রচারকে, ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজকে জীবনের মহান কাজ বলে সে গ্রহণ করে নিল। আর কোনদিন সে পেছনের দিকে ফিরে তাকায়নি। বিপদ ও কারাবরণ তাকে আপন বিপ্লবী কর্তব্য হতে কোনো দিন তো দূরে সরিয়ে নিতে পারেইনি, অনশন-অর্ধাশনও তাকে দমাতে পারেনি। এখানে অনশন-অর্ধাশন কথার প্রয়োগ শুধু ভাষার উচ্ছ্বাস নয়, সত্য সত্যই আমাদের সেই প্রথম যুগের বহু কর্মীকে অনাহারেও দিন কাটাতে হয়েছে। যাঁরা রটিয়ে বেড়াতেন যে আমরা বলশেভিকদের নিকট হতে সোনা পাচ্ছি তাঁরা যদি একবারটি আমাদের উপোস করা দেখতেন।

আব্দুল হালিমের  সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার আগেও অনেকে আমাদের সঙ্গে আমাদের পথে কাজ করতে এসেছিলেন। পুরো ১৯২২ সাল ও ১৯২৩ সালেরও কয়েক মাস আমরা একত্র থেকেছি, যদিও বিপদের ঝুঁকি বরাবর আমিই নিয়েছি। তাঁদের কথা আমি অন্য জায়গায় বলবো। এখানে আমি শুধু এতটুকু বলবো যে পরে তাঁরা তাঁদের পুরনো পথে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু আব্দুল হালিম যে একবার মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পথে এসেছিল সে পথ সে কোনো দিন ছেড়ে দিয়ে পেছনে ফিরে যায়নি। এটা হচ্ছে আব্দুল হালিমের  পক্ষে সবচেয়ে বড় কথা।

এক এক সময় প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেছে আব্দুল হালিমের  মাথার ওপর দিয়ে। দৃঢ়তার সহিত সে সেই ঝড়ের প্রতিরোধ করেছে। ১৯২২ সাল হতেই পুলিসের নজর পড়েছিল আমাদের ওপরে। বিদেশ হতে চিঠিপত্র ও নানারকম কাগজ ইত্যাদি আসত ডাকযোগে। নানান পোস্ট অফিস হতে সে সবের অনেকই পুলিস নিয়ে যেতো। ১৯২৩ সালের মার্চ মাস হতে পুলিস খোলাখুলিভাবে আমায় অনুসরণ করতে লাগল। অনুসরণকারীরা শুধু ওয়াচার কনস্টেবল নয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টরও নয়, কলকাতা পুলিসের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাব ইনস্পেক্টররাও (যেমন মুরশিদ সাহেব প্রভৃতি) থাকতে লাগলেন ওয়াচারদের সঙ্গে। আমার সব যোগাযোগ সকলের সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমি সারাদিন ৭ নম্বর মৌলবী লেনে বন্ধু কুতবুদ্দিন আহমদের বাড়িতে বসে থাকি। এ সময়েও বিপদ অগ্রাহ্য করে হালিম কিছু কিছু যোগাযোগ ঘটিয়ে দিত, কিছু কিছু ডাকও সংগ্রহ ক'রে আনত।

১৯২৩ সালের মে মাসের ঠিক কত তারিখ ছিল আমার তা মনে নেই, সম্ভবত ১৭ই মে হবে, – স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার মিস্টার কিড এসে কুতবুদ্দিন সাহেবের বাড়ি হতে আমায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলেন। কয়েকদিন পরে ১৮১৮ সালের তিন নম্বর রেগুলেশন (The Bengal State Prisoners Act of 1818) অনুসারে আমি স্টেট প্রিজনার হলাম। আমার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই, কী করে হালিম দিন কাটাবে? পারবে কি সে টিকে থাকতে তার কাজে?

১৯২৪ সালের মার্চ মাসে কানপুরে আমাদের ক'জনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মোকদ্দমা (কানপুর “বলশেভিক” ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা, ১৯২৪ ) চালু হলো। হালিম কানপুরে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলো এবং মোকদ্দমার কিছু কিছু তদবীরও করলো। আমার মন ধন্য ধন্য করে উঠল। নিদারুণ দুঃখ কষ্টের ভিতরে থেকেও ভেঙে পড়েনি আব্দুল হালিম। পার্টির পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে সে।

আমার অনুপস্থিতির সময়ে শচীন্দ্রনাথ সান্ন্যালের ও তাঁর দলের লোকেদের সহিত হালিমের  পরিচয় হয়েছিল। শুনেছি সান্ন্যাল মশায় টেররিজম ও কমিউনিজমের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একখানা লাল ইশতেহার প্রচার করেছিলেন। এরজন্য বন্ধু কুতবুদ্দিন সাহেব তাকে কিছু আর্থিক সাহায্যও করেছিলেন। শ্রী সান্ন্যাল প্রভৃতির সঙ্গে পরিচয়ের ফলে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া হালিমের  পক্ষে অসম্ভব ছিল না, কিন্তু তার মার্কসীয় সাহিত্যের অধ্যয়ন তাকে বাঁচিয়েছে। ইতোমধ্যে সে বেশকিছু মার্কসীয় সাহিত্য পড়ে ফেলেছিল। কলেজ স্কোয়ারের বুক কোম্পানি অন্যান্য পুস্তকের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু মার্কসীয় সাহিত্যেরও আমদানি করতেন। কুতবুদ্দিন সাহেব সেই দোকান থেকে মার্কসীয় সাহিত্য কিনতেন।

এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো। হালিমের  মৃত্যুর পরে খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল যে হালিম তার জ্যেষ্ঠ সহোদর শামসুদ্দিন হুসয়ন সাহেবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছিল। ওপরে হালিমের  সঙ্গে আমার পরিচয় ও তার পার্টিতে আসা সম্বন্ধে আমি যা লিখেছি তা থেকে সকলেই বুঝতে পারবেন যে এ তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। হালিমের  পরিবারে হালিমই প্রথম রাজনীতিতে এসেছিল এবং অসহযোগ আন্দোলনে জেল খেটেছিল। শামসুদ্দিন সাহেব অন্য ধরনের লোক ছিলেন। কংগ্রেসীরা যাকে গঠনমূলক কাজ বলে সেইরকম কাজের দিকেই তার ঝোঁক ছিল। এই জন্যে তিনি কো-অপারেটিভ আন্দোলনের অনারারি প্রচারক হয়েছিলেন। সোস্যাল সার্ভিস লিগেও কাজ নিয়েছিলেন। ১৯২৩ সালে যে তিনি আমাদের দিকে ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হলেন সেটা ছোট ভাই আব্দুল হালিমের  প্রভাবে। ১৯২৩ সালে আমার জেলে যাওয়ার আগে এটা ঘটেছিল। ১৯২৫ সালে “লেবার স্বরাজ পার্টি অফ দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস” (The Labour Swaraj Party of the Indian National Congress) নামক পার্টি গঠনের প্রধান উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন শামসুদ্দিন সাহেব। এই পার্টি হতেই কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় “লাঙল” নামক বাঙলা সাপ্তাহিক পত্রিকা বার হয়েছিল এবং এই পার্টিরই নাম পরিবর্তিত হয়ে পরে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টি (Workers and Peasants Party of Bengal) হয়েছিল। ১৯২৬ সালের ২৯ শে অক্টোবর তারিখে শামসুদ্দিন সাহেব মারা গেছেন। মরবার আগে কমিউনিস্ট মতবাদ তিনি নিশ্চয় গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য তিনি হননি। বেঁচে থাকলে কমিউনিস্ট পার্টির নিয়মিত সভ্যও যে তিনি হতেন তাতে সন্দেহ নেই।

আব্দুল হালিমের  সম্বন্ধে ও উনিশশ'ত্রিশের দশকের কমিউনিস্টদের সম্বন্ধে কোনো কথা বলতে হলে একচল্লিশ নম্বর জাকারিয়া স্ট্রিটের কথা উল্লেখ করতেই হবে। ১৯৩১ সালে হালিম বড় শোচনীয় অবস্থার সম্মুখীন হয়। খাওয়া জুটুক আর না জুটুক রাত্রিবেলা শোয়ার জন্যে খানিকটা স্থানের তো দরকার। হালিম আর তার কয়েকজন সহকর্মীর সেই স্থানই ছিল না। তাঁদের অবস্থা হয়ে দাঁড়ালো ফুটপাথে রাত্রিবাসের মতো। পার্টির ক'জন মোক্ষম কর্মীর এইরকম দুরবস্থার ফলে পার্টির অস্তিত্বই প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ল। এই সময়ে তিনজন ছাত্র সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তাঁদের দু'জন ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের, আর একজন ছিলেন ইউনিভার্সিটি ল'কলেজের। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র দুজনের নাম ছিল নূর মুহম্মদ ও অতুলচন্দ্র চন্দ। ল'কলেজের ছাত্রের নাম ছিল হাতিম আলি খান।

৪১ নম্বর জাকারিয়া স্ট্রিটের (বাড়ির নাম ঢাকা হাউস) সিঁড়ি দিয়ে তেতলায় উঠে ডান পাশের তিনখানা ঘর এই ছাত্ররা ভাড়া নিয়েছিলেন। তার মাঝের কামরাখানা (২৫ নম্বর রুম) তাঁরা হালিমদের ছেড়ে দিলেন। নূর মুহম্মদ ছিলেন শান্তিপুরের এক ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে। অতুলচন্দ্র চন্দ বাকেরগঞ্জ জিলার লোক হলেও তাঁর বাবা ছিলেন দিল্লিতে ভারত গবর্নমেন্ট প্রেসের সুপারিন্টেডেন্ট। হাতিম আলি খানও ময়মনসিংহ জেলার এক সম্পন্ন পরিবারের ছেলে ছিলেন। এই তিনজন ছাত্রই মার্কসবাদ-লেনিনবাদ পড়েছিলেন। তার মধ্যে নূর মুহম্মদ ও অতুলচন্দ্র চন্দ বেশি। তাঁরা শুধু হালিমদের ঘরই ছেড়ে দেননি, তাঁদের আর্থিক সাহায্যও করেছেন। মেডিক্যাল ছাত্ররা সাধারণত বাড়ি থেকে বেশি টাকা পেতেন। নূর মুহম্মদ ও অতুল চন্দ পার্টির অন্য কাজও করতেন। এই ছাত্রদের টাকাতেই হালীমেরা “মজুর-চাষী”নাম দিয়ে সাপ্তাহিক কাগজ বা'র করেছিল। ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মেনেনজাইটিস রোগে নূর মুহম্মদ মারা যান। তার আগে হাতিম আলি খান পার্টির নিকট হতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কোনো পাত্তা পাওয়া যায়নি আর। আজ শুধু ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে ডাক্তার অতুলচন্দ্র চন্দ বেঁচে আছেন – মেডিক্যাল কলেজের ডেন্টাল ডিপার্টমেন্টে ভিজিটিং সার্জন। কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যদের অনেকেই ডাক্তার চন্দকে দিয়ে তাদের দাঁত পরীক্ষা করিয়েছেন। কিন্তু তাদের ভিতরে কম কমরেডই জানেন কিভাবে একসময় ডাক্তার চন্দ ও নূর মুহম্মদ কমিউনিস্ট পার্টিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। একচল্লিশ নম্বর জাকারিয়া স্ট্রিটের পঁচিশ নম্বর রুম একসময়ে শুধু আব্দুল হালিম প্রভৃতি কমরেডের বাসস্থান ছিল না, তা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির অ-বিজ্ঞাপিত অফিসও। আবার হালিমের  গণশক্তি পাবলিশিং হাউসের অফিসরূপেও এই পঁচিশ নম্বর কামরাখানা ছিল দেশে-বিদেশে পরিচিত।

কোনো কোনো সংবাদপত্র লিখেছেন যে বাংলা দেশে আব্দুল হালিম কমিউনিস্ট সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ছিল। আমার মনে হয় তাঁরা ভুল লেখেননি। উনিশশ'বিশের দশকে “মজদুর”নাম দিয়ে কুতবুদ্দিন আহমদ সাহেবের সম্পাদনা ও পরিচালনায় একখানা উর্দু সাপ্তাহিকের কয়েক সংখ্যা মাত্র বার হয়েছিল। ১৯২৫ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর তারিখে বাংলা সাপ্তাহিক “লাঙল”-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। খুব বেশি হয়তো নয়, তবুও হালিমের  তাতে সহযোগিতা ছিল। কিন্তু ১৯২৩ সালের মে মাসে আমি যে জেলে গিয়েছিলাম তারপরে তখনও আমি কলকাতায় ফিরে আসিনি। আমি ফিরেছিলাম ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ২রা তারিখে। আমার ফেরার পরে “লাঙলে”র সম্পাদনা ও পরিচালনা ধীরে ধীরে আমার হাতে চলে আসে। তারপরে “লাঙলে'র নাম বদলে যখন “গণবাণী” হলো তখনও আমি তার সম্পাদনা করি। এই উভয় ক্ষেত্রেই হালিম ছিল আমার নিকটতম সহযোগী। কিন্তু কমিউনিস্ট সাংবাদিকতার প্রকৃত প্রচেষ্টা চলেছিল উনিশশ'ত্রিশের দশকে। এই প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা ছিল আব্দুল হালিমের । আর কাগজ একখানা তো নয়, অনেকগুলি। “মজুর-চাষী”, “মার্কসবাদী”, “মার্কসপন্থী” ও “গণশক্তি” প্রভৃতি কত কি নাম। উনিশ শ' ত্রিশের দশকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে দৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে কি চেষ্টাই না করেছে আব্দুল হালিম।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংগঠকরূপে আব্দুল হালিম বারে বারে কারাবরণ করেছে। আদালতে দণ্ডিত হয়ে সে যেমন জেলে গেছে, আবার বিনা বিচারের বন্দীরূপেও তাকে জেলে যেতে হয়েছে। বিচারাধীন ও দণ্ডিত বন্দীদের মধ্যে শ্রেণীবিভাগ প্রচলিত হওয়ার পরেও আব্দুল হালিম ও আরও অনেক কমিউনিস্ট তৃতীয় শ্রেণীর দণ্ডিত বন্দীরূপে কয়েদ খেটেছেন। উনিশ শত ত্রিশের দশকের শেষাশেষিতে হালিম বিনা বিচারের বন্দী থেকেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেও সে বিনা বিচারে বন্দী হয়েছে। তখন প্রেসিডেন্সি জেলে অনশন ধর্মঘট করে সে প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল। সে সময়ে মেডিক্যাল কলেজ হসপিট্যালে ট্রান্সফার করায় তার জীবন রক্ষা পায়। তারপরে তাকে হিজলি ডিটেনশন জেলে পাঠানো হয়। ১৯৪৮ সালের ২৬শে মার্চের দিনগত রাত্রে পুলিস ৭৪/১ নম্বর লোয়ার সার্কুলার রোডের বিরাট বাড়ির চার দিক ঘিরে ফেলে। আমরা অনেকেই তখন সে বাড়িতে থাকতাম। একমাত্র আব্দুল হালিমই সেদিন পুলিসের ব্যূহ ভেদ করে পেছনের দেওয়াল ডিঙিয়ে সরে পড়তে পেরেছিল। ১৯৬২ সালের নভেম্বর মাসেও আব্দুল হালিম ডেটেনিউ (বিনা বিচারে বন্দী) হয়েছিল। আবার ১৯৬৫ সালের ২৯ শে জুলাই তারিখেও ট্রামওয়ে আন্দোলনের কিছু আগে তাকে ডেটেনিউ করে কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়। মৃত্যুর দশ দিন আগে মাত্র তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

উনিশ শ' ত্রিশের দশকের শুরু হতেই বিভিন্ন জেলের ও ডিটেনশন ক্যাম্পের সন্ত্রাসবাদী বন্দীরা (দণ্ডিত ও বিনা বিচারে বন্দী উভয়েই) নূতন করে চিন্তা করা আরম্ভ করেন। তাঁদের মধ্যে হতে ধার্মিক ভাবটা কমে যায়। তাঁরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পড়াশুনা আরম্ভ করে দেন। মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার বন্দীদের বিবৃতির প্রভাব যে তাঁদের ওপরে পড়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। আব্দুল হালিম ও সরোজ মুখার্জি প্রভৃতি কমরেডদেরও কিছু অবদান তাতে ছিল। তাঁরা বারে বারে জেলে গিয়েছেন। কিন্তু এই ব্যাপারে আব্দুল হালিমের  বিশেষ অবদান এই ছিল যে বন্দীশালায় পড়াশোনার ভিতর দিয়ে যাঁরা কমিউনিস্ট মতবাদ গ্রহণ করলেন তাঁদের সে সংহতি (Communist Consolidation) ও শৃঙ্খলার ভিতরে নিয়ে এল। বন্দীশালায় পার্টি সভ্যপদ দেওয়া হয়নি, পার্টি ব্রাঞ্চও সেখানে স্থাপন করা হলো না, কিন্তু কমিউনিস্ট সংহতিসমূহের গঠন সেই কাজই দিল। এটা শুধু যে দেশের ভিতরে করা হয়েছিল তা নয়, সাগরপারের আন্দামানেও এই পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছিল। বন্দীশালাসমূহের কমিউনিস্ট সংহতিগুলি আমাদের পার্টির সাংগঠনিক জীবনে কমরেড আব্দুল হালিমের  একটি মহান অবদান। এই অবদানের কথা কখনও ভুলবার নয়।

১৯২৯ সালের ২০ শে মার্চ তারিখে ২/১, ইউরোপিয়ান এসাইলাম লেনের দোতলার একটি ফ্ল্যাট হতে ফিলিপ স্প্রাট, অযোধ্যাপ্রসাদ, শামসুল হুদা ও আমি মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সংস্রবে গ্রেপ্তার হই। এটা ছিল ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টির অফিস। আমরা চলে যাওয়ার পরে এই পার্টির অফিস ওই বাড়ি হতে তুলে নিয়ে যেতে হয়। অনেক কষ্টে হালিম চিত্তরঞ্জন এভেনিউস্থিত চৌধুরী বিল্ডিংসে (কেন্ডারডাইন লেনের জংশনে) অফিসের জন্যে ঘর পেয়ে যায়। ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টির প্রেসিডেন্ট শ্রীঅতুলচন্দ্র গুপ্ত (হাইকোর্টের বিখ্যাত অ্যাডভোকেট) তাকে এই কাজে আর্থিক সাহায্য করেন। শ্রীগুপ্ত হালিমের  কাজকে বরাবর প্রশংসার চোখে দেখেছেন। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি তাকে সব সময় সাহায্য করেছেন। 

উনিশ শ' ত্রিশের দশকে জেলের বাইরে থাকলে হালিমকে বরাবর কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে এবং তাকে কাজ করতে হয়েছে নানান রকম প্রতিবন্ধকের বিরুদ্ধে। তা সত্ত্বেও যাতায়াতের ভাড়ার যোগাড় হলে ও সময় করতে পারলে সে মীরাটে ছুটে গেছে আমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে। একবার তো আমরা দু'মাসের বেশি সময় মীরাটে তাকে রেখেও দিয়েছিলাম। তখন আদালতে আমাদের বিবৃতি দেওয়া শুরু হয়েছিল। ইউনাইটেড প্রেস তাঁদের রিপোর্টার তুলে নিয়েছিলেন। আর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের রিপোর্টার যিনি ছিলেন রয়টারের ভারও তাঁর ওপরে ছিল। তিনি পলিটিক্যাল রিপোর্টিং করতে পারতেন না। কোনো কোনো সময় আমাদের নিজেদের লোক রাখতে হয়েছিল। একাজে বোম্বের যে দু'জন কমরেড ছিলেন তাঁরা যখন একে একে চলে গেলেন তখন হালিম ইউনাইটেড প্রেস অফ ইন্ডিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের নিদর্শন পত্রধারী রিপোর্টার নিযুক্ত হয়ে এলো। মীরাট হতেই সে সোজাসুজি নানাদিকে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিত। আমাদের তো জানা থাকত কোন দিন কি বিবৃতি হবে। তাই আগে হতেই আমরা জেলের ভিতরে বসে রিপোর্ট তৈরি করে রাখতাম। আমাদের নিকটে টাইপ রাইটার ছিল। এই বিশেষ ব্যবস্থা আমরা আমাদের জেনারেল স্টেটমেন্টের (General Statement) ব্যাপারে করেছিলেম।

সেশনস জজ্ মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার রায় (Judgement) লেখার জন্যে পাঁচ মাস সময় নিয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি তারিখে তিনি তাঁর রায় শোনালেন। সে দিন নানাস্থান হতে আমাদের কিছু কিছু বন্ধু কোর্টে এসেছিলেন। হালিমও এসেছিল সেদিন কলকাতা হতে। সকলে যা ভেবেছিলেন তার চেয়েও অনেক বেশি সাজা আমাদের দিলেন জজ। আমার হলো চরম সাজা – যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। শিবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মুক্তি পেলেন। তাঁর সঙ্গে আমার কোনোদিন রাজনৈতিক মতৈক্য ছিল না। আমার চরম সাজায় তিনিও সেদিন খানিকটা বিচলিত হয়েছিলেন। নিকটে এসে আমাকে সালাম করলেন তিনি। হালিমের  দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমার চরম সাজার জন্যে তো বটেই একসঙ্গে তার এতসব সহকর্মীর লম্বা লম্বা সাজাও তখন তার নিকটে দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। তাই সে নিজেকে সামলাতে পারেনি।

এলাহাবাদেও সে আমাদের আপিলের সময়ে ছুটাছুটি করেছে।

এই আব্দুল হালিম আর নেই। মাত্র চৌষট্টি বছর বয়সে সে আমাদের ছেড়ে গেল! আমি মনে মনে ভাবি আমরা কতটা জেনেছিলেম তাকে। তার আকস্মিক মৃত্যুতে আমাদের পার্টি সভ্যরা শোকাভিভূত হয়েছিলেন। সম্মান জানিয়েছেন তাঁরা তার মৃতদেহকে। কিন্তু তাঁরাও কি হালিমকে পুরোপুরি চিনেছিলেন? গত পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে সে যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জন্যে তিলে তিলে আত্মদান করে গেছে, পার্টির বাইরে সে যে নিজের কোনই অস্তিত্ব রাখেনি, — তার স্ত্রীকে সে পার্টিতে এনেছিল, তার সন্তানদেরও যে পার্টির বাইরে কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই, এসব যদি আমাদের পার্টি সভ্যরা উপলব্ধি ক'রে থাকেন তবে অন্তত আমার মনে আর কোনো খেদ থাকবে না।

আব্দুল হালিম কখনও আত্মপ্রচার করত না। তা সত্ত্বেও একজন ত্যাগী রাজনীতিক কর্মীরূপে পার্টির বাইরের লোকেরাও তাকে জেনেছিলেন ও ভালোবেসেছিলেন। শত শত লোক এসে যে নীরবে তার মৃতদেহের প্রতি সম্মান জানিয়ে গেলেন, তার শববাহী মিছিলে যে আরও বেশি লোক যোগ দিলেন তা থেকে বোঝা গেছে যে যাঁরা কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য নন তাঁরাও ভালোবাসতেন হালিমকে।

 

লেখাটি নেওয়া ন্যাশনাল বুক এজেন্সি কর্তৃক প্রকাশিত আব্দুল হালিমের  স্মারক গ্রন্থ “নবজীবনের পথে” (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৬) থেকে। পরবর্তী সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাঃ) হুগলী জেলা কমিটি “জীবনের সংগ্রামে কমরেড আব্দুল হালিম” নামে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করে অরুন চৌধুরীর সম্পাদনায় ২০০২ সালে। লেখাটি সেখানেও প্রকাশিত হয়। 


প্রকাশের তারিখ: ২৯-এপ্রিল-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org