মার্কসের নোটবুক ও উনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গসমাজ

সৌভিক ঘোষ
মার্কসের নোটবইতে তৎকালীন বাংলার ভূগোল সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। ডেল্টা (ব-আকারের) এলাকা হিসাবে অবিভক্ত বঙ্গদেশকে চিনেছেন তিনি- উত্তরে লাল মাটির এলাকা, দক্ষিনে সুন্দরবন, ঢাকা, পাবনা হয়ে মুর্শিদাবাদের নামও পাওয়া যায়। কৃষিই গ্রাম বাংলার প্রধান কাজ, বিস্তীর্ণ চাষের জমি, পাকা সড়ক খুবই কম। রায়ত আছে, জমিদার আছে। গাছের তলায় জড়ো হয়ে পাঠশালা পরিচালনার উল্লেখও আছে। তৎকালীন গ্রাম বাংলায় সম্পন্ন চাষিদের ঘরবাড়ি, গৃহস্থের দালান, উঠোন ও বৈঠকখানা তার নজর এড়ায়নি। জমিদার-মহাজনী ব্যবস্থার সারাংশ হিসাবে কৃষিজমির মোট ছয় রকম প্রকারভেদ লিখে রেখেছেন।

১)

১৯৩৩ সাল। জার্মানি থেকে কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক। টানা পাঁচ মাস রাতের অন্ধকারে একটি ছোট নৌকায় করে কয়েকটি কাগজের খাম আসছে। ডেনমার্কের তীরে কয়েকজন অপেক্ষা করছেন- তাদেরই হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে সেইসব খাম। সাধারণ মোড়কের কাগজে তৈরি। রাতের অন্ধকারে নৌকায় চাপিয়ে পাচার করতে হচ্ছে কেন? কী রয়েছে তার ভিতরে? কার্ল মার্কস ও ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের হাতে লেখা দলিল, চিঠিপত্র, পাণ্ডুলিপি- মুলত অপ্রকাশিত যা কিছু। 

ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের মৃত্যুর পরে তাঁর ও মার্কসের অপ্রকাশিত চিঠিপত্র, দলিল সবই জার্মানিতে ছিল। অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরেই এস এস (Schutzstaffel) বাহিনী কার্ল লিবনেখটের বাড়িতে হানা দিল। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির সদর দপ্তর ছিল সেই বাড়িটি। জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আর্কাইভের দায়িত্বে তখন জোহান হাইনরিখ। মার্কস ও এঙ্গেলসের অপ্রকাশিত দলিলগুলির বেশিরভাগই এই মানুষটির সতর্কতায় রক্ষা পায়। তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন আর অপেক্ষা করলে অমুল্য দলিল-দস্তাবেজগুলি নাৎসিদের দখলে চলে যাবে। জোহানের পরামর্শেই সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান অটো ওয়েলস এক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করেন। সেই বন্ধুটির সেই অর্থে কোনও রাজনৈতিক পরিচিতি ছিল না- তিনি ওয়াল পেপারের ব্যবসা করতেন। বাক্স-প্যাঁটরার মোড়ক হিসাবে কাজে লাগে এমন কাগজের খামে ভরে মার্কস-এঙ্গেলসের লেখাপত্র যা ছিল সবটাই পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেই ব্যবসায়ীর দোকানে। বেশিদিন এই বন্দোবস্ত টিকবে না আন্দাজ করে খামগুলির দায়িত্ব নেন ডেভিড সলোমন। শেষ অবধি জার্মানি থেকে সেই খামগুলি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া গেল ডেনমার্কে। 

১৯৩৩’র জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে বেশিরভাগ দলিলই ডেনমার্কে নিয়ে আসেন এক শ্রমিক তথা ফ্লেন্সবার্গের স্থানীয় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সভাপতি। তার নাম জিলহেল্ম পিনিহ্যাল। 

দলিল-দস্তাবেজগুলির সংরক্ষণের জন্য ডেনমার্ক থেকে দুজায়গায় যোগাযোগ করা হয়। একটি আমস্টার্ডামের ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল হিস্টরি (আইআইএসএইচ), আরেকটি মস্কোর মার্কস-এঙ্গেলস ইন্সটিটিউটে। ততদিনে মস্কো থেকে মার্কস-এঙ্গেলসের সংগৃহীত রচনাবলীর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। সেই ইন্সটিটিউটেরই দায়িত্বে ছিলেন ডেভিড রিয়াজনভ। মস্কোর সাথে প্রাথমিক কথাবার্তা অনেকদূর এগিয়েছিল। দলিল, চিঠিপত্র এবং হাতে লেখা যা কিছু আছে সেইসব সংরক্ষণ করবে সোভিয়েত ইউনিয়ন- উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বয়ং স্তালিন। মস্কোর তরফে কাজটির দায়িত্বে ছিলেন নিকোলাই বুখারিন। কিন্তু শেষ অবধি তা হয়নি, পাণ্ডুলিপি বলশেভিকদের হাতে পৌঁছায়নি। সেই সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয় ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল হিস্টরি (আইআইএসএইচ)। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে মস্কো ও জার্মানির মার্কস-লেনিন ইন্সটিটিউট উভয়েই আমস্টার্ডামে সংরক্ষিত আর্কাইভটি ব্যবহার করে- সিদ্ধান্ত হয় তারিখ অনুযায়ী মার্কস ও এঙ্গেলসের সম্পূর্ণ রচনাবলী প্রকাশ করা হবে। সেই পরিকল্পনারই নাম মেগা (জার্মান ভাষায়- MEGA)। এই রচনাবলীর কাজ এখনও শেষ হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিপর্যয় তার একটি অন্যতম কারণ। কাজ শেষ না হলেও বিচ্ছিন্নভাবে মার্কসের কিছু নোটবুক ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়। এগুলির মধ্যে গণিত, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং নৃতত্ত্ব সংক্রান্ত নোটবুকগুলিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। 

এই লেখায় আমরা মার্কসের এথনোলজিক্যাল নোটবুকস প্রসঙ্গেই আলোচনা করব। সেই নোটবুকই আমাদের জানায় অবিভক্ত বাংলার সমাজজীবন, ইতিহাস,সংস্কৃতি সম্পর্কে মার্কস রীতিমত পড়াশোনা করছিলেন, একাধিক টীকা-টিপ্পনী লিখেছিলেন। 

২)

মার্কসের এথনোলজিক্যাল নোটবুকস ইংরেজিতে অনুবাদ করেন লরেন্স ক্রেডার- ১৯৭২ সালে। নেদারল্যান্ডস’র ভ্যান গরকাম সংস্থা সেই বইটির প্রকাশক। বইয়ের মুখবন্ধও লেখেন ক্রেডার নিজেই। উৎসর্গ করা হয় প্রখ্যাত মার্কসবাদী কার্ল কর্ষ’কে। ১৯৭৪ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আমাদের লেখার সূত্র সেই দ্বিতীয় সংস্করণটি। 

নৃতত্ত্ব সম্পর্কে হেনরি ল্যুইস মর্গান (এনশিয়েন্ট সোসাইটি), জন বুড ফিয়ার (এরিয়ান ভিলেজ ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সিলোন), হেনরি সাম্নার মেইনে (লেকচারস অন আর্লি হিস্টোরি অফ ইন্সটিটিউশন্স) এবং জন লুবক (দ্য অরিজিন অফ সিভিলাইজেশন)- এদের লেখাজোখাই মার্কস তথ্যসূত্র হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। ১৮৮০ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল এরিয়ান ভিলেজ ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সিলোন। বইটি লেখেন জন বুড ফিয়ার (১৮২৫-১৯০৫)। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জন গণিত শাস্ত্রে ট্রাইপস বৃত্তিধারী ছিলেন। ১৮৫৪ অবধি সেখানেই গণিত শিক্ষকের কাজ করেছিলেন, ১৮৬৪ সালে হাইকোর্টের জজ হয়ে কলকাতায় আসেন। ব্রিটিশ শাসনে অত্যাচারিত ভারতীয়দের সম্পর্কে বিশেষ দুর্বলতা ছিল তার। সেই দুর্বলতাই তৎকালীন বাংলার (অবিভক্ত) ভূগোল, ইতিহাস ও সমাজকে চিনতে-জানতে তাকে আকর্ষিত করে। কলকাতা হাইকোর্টের জজ হিসাবে কাজ করার সাথেই তিনি যুক্ত হন বেঙ্গল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, বেথুন সোসাইটি এবং এশিয়াটিক সোসাইটিতে। ১৮৭০-৭১ নাগাদ তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। তারই লেখা বই থেকে মার্কস বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা সংক্রান্ত নোট সংগ্রহ করেছিলেন। 

৩)

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহকে কার্ল মার্কসই প্রথম, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে চিহ্নিত করেন। ইদানিং আরএসএসের পক্ষে এই কৃতিত্ব বিনায়ক দামোদর সাভারকরের বলে ঢাক পেটানো হলেও ব্যাপারটা মিথ্যা ছাড়া কিছু নয়। ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৯ সাল অবধি পরিবারের সংস্থানে জেরবার মার্কস নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউনে সাংবাদিক হিসাবে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এশিয় সমাজের নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পর্কে তার বিখ্যাত সুত্রায়ন (এশিয়াটিক মোড অফ প্রোডাকশন) ততদিনে প্রকাশিত হয়েছে। এশিয়া তথা ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় জমির উপরে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রধানত অনুপস্থিত লিখেছিলেন মার্কস ও এঙ্গেলস দুজনেই। আ কনট্রিবিউশন টু দ্য ক্রিটিক অফ পলিটিক্যাল ইকোনমিতে মার্কস লিখলেন – ‘Mankind thus inevitably sets itself only such tasks as it is able to solve, since closer examination will always show that the problem itself arises only when the material conditions for its solution are already present or at least in the course of formation. In broad outline, the Asiatic, ancient, feudal and modern bourgeois modes of production may be designated as epochs marking progress in the economic development of society. The bourgeois mode of production is the last antagonistic form of the social process of production – antagonistic not in the sense of individual antagonism but of an antagonism that emanates from the individuals' social conditions of existence – but the productive forces developing within bourgeois society create also the material conditions for a solution of this antagonism. The prehistory of human society accordingly closes with this social formation.’ ভারতে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামগুলি থেকে বিধিপূর্বক পূর্বনির্দিষ্ট হারে কর আদায় করেই শহর ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা কায়েম রয়েছে- এই ছিল তাদের মত। শহরাঞ্চলগুলিতে প্রাথমিক পর্যায়ের পুঁজিবাদী বাজারের অস্তিত্বও তাদের ঐ পর্বের লেখায় পাওয়া যায়। 

মার্কস কিসের খোঁজ করছিলেন?

প্রাক্ পুঁজিবাদী সমাজের সাথে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংঘাতের ফলাফলই ছিল তাঁর গবেষণার লক্ষ্য। দুনিয়ার সর্বত্র পুঁজিবাদ একই কায়দায় গড়ে ওঠেনি, মার্কসের সময়েও পুঁজিবাদী দুনিয়ার সবজায়গায় একই চেহারা ছিল না। কোথাও পুঁজিবাদ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিল আগেকার ব্যবস্থাকে সমূলে উচ্ছেদ করে (যেমন ইংল্যান্ড- এই কারনেই মার্কস রাজনৈতিক অর্থনীতির চর্চায় ইংল্যান্ডকে মুখ্য  হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন), আবার কোথাও পূর্বেকার কিছু কিছু বন্দোবস্তের সাথে সমঝোতা করে (যেমন ফ্রান্স)। ল্যুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার লিখতে বসে মার্কসের ব্যজস্তুতি- ‘এবারের সমাজ বিপ্লবকে নিজের ঘাড় থেকে অতীতের ভূত নামাতেই হবে। অতীতের সমস্ত ঐতিহ্যকে একেবারে বাতিল না করা অবধি এই বিপ্লব নিজেকে নতুন একটি ব্যবস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। গত বিপ্লবে মুক্তির মূল ধারনাই তার পক্ষে প্রচারের মুখ্য বাণী হয়ে দাঁড়ায়, এইবার প্রচারটাই হল আসল, শাঁস বলে আর কিছুই নেই’। জার্মানিতেও বিপ্লবের সম্ভাবনায় তাঁরা দুজনেই (মার্কস-এঙ্গেলস) উদ্বেল হয়ে ওঠেন, যদিও সেই বিপ্লব শেষ অবধি পূর্ণতা পায়নি। সমাজ বিপ্লবের সাফল্যে প্রাকশর্ত হিসাবে ইতিহাসে বস্তুবাদী চেতনার সম্যক গুরুত্ব বোঝাতে ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস লেখেন ‘রোল অফ ফোর্স ইন হিস্ট্রি’। ইউরোপের বাইরে বিভিন্ন দেশে প্রাক পুঁজিবাদী সমাজকে পুঁজিবাদ কিভাবে গ্রাস করছে তা বুঝতেই মার্কস ভারত সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।    
  

৪)

স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ ব্যবস্থার জন্যই একের পর এক বৈদেশিক আক্রমন স্বত্বেও গ্রাম ভারতের নিস্ক্রিয়তা’কে ব্যখ্যা করেছিলেন কার্ল মার্কস। রাজত্বের পালাবদলে অর্থনীতি তথা সমাজব্যবস্থার উপরে কোনও প্রভাব পড়েনি- তা ছিল মূলত অনড়, অবিচলিত। এমন বন্দোবস্ত (ওরিয়েন্টাল ডেসপটিক) নিজে থেকে উচ্ছেদ হতে পারে না, বাইরে থেকে প্রযুক্ত লুটেরা শক্তির প্রয়োজন হয়- হেগেলের লেখায় সেই ইঙ্গিত ছিল। প্রাক্ পুঁজিবাদী ইউরোপে বিভিন্ন অংশের সমাজব্যবস্থায় উদ্ভুত সংকট প্রসঙ্গেই হেগেল এমন মন্তব্য করেছিলেন। একসময়ের একনিষ্ঠ হেগেলিয়ান কার্ল মার্কস এশিয়াটিক মোড অফ প্রোডাকশনের উচ্ছেদে জরুরী সেই বহিঃশক্তির সন্ধানেই ব্রতী ছিলেন। মুঘল শাসনের অবসান ঘটিয়ে জাঁকিয়ে বসা ব্রিটিশ শাসনই দীর্ঘকাল ব্যাপী সেই সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। মার্কস একদিকে যেমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে বর্বর শোষণ বলেছিলেন তেমনই এই শাসনের ফলেই যে ভারতীয় সমাজে এক বৈপ্লবিক রুপান্তর ঘটতে চলেছে তার দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পূর্বতন সমাজে জমির উপরে ব্যক্তি মালিকানা না থাকলেও শোষণ ছিল, সেই শোষণ কায়েম হয়েছিল অনড় জাতি বিভেদের নামে চিরস্থায়ী শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে। ইংরেজ তার জায়গায় জমির মালিকানায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম করে, কৃষিভিত্তিক সমাজ উপড়ে ওঠে- পরিণত হয় জমিদারের অধীনে খাজনা দেওয়া শ্রমজীবীতে। জমিদার একদিকে যেমন ব্রিটিশদের লুঠের কারবারে যোগানদার আরেকদিকে জমি থেকে উচ্ছেদেরও অধিকারী। সেই বর্বর শোষণের ফলেই গ্রাম ভারতে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। ব্রিটিশ শাসন ভারতের গ্রামীণ ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করেছিল- সেই ব্যবস্থা যা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ তাকেই উৎখাত করে কেন্দ্রীভূত উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা কায়েম হল। ১৮৫৩ সালে মার্কসের লেখা বই ‘ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়াতে’ এমনই পর্যালোচনা ছিল। পরে অবশ্য মার্কস ও এঙ্গেলস এশীয় সমাজ সম্পর্কে নিজেদের মতামতকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান- সেইসব লেখা সেভাবে প্রকাশিত হয়নি। মার্কস নিজের জীবনের শেষ পর্যায়ে (১৮৮০-৮৩) রাশিয়ায় কমিউন ভিত্তিক কৃষিকাজ ও সংশ্লিষ্ট সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন, একইসাথে ভারতীয় সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থার কাঠামো প্রসঙ্গেও কাজ শুরু করছিলেন। সেই কাজেই তাকে রসদ যুগিয়েছিল জন বুডের বইটি। 

৫)

মার্কসের নোটবইতে তৎকালীন বাংলার ভূগোল সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। ডেল্টা (ব-আকারের) এলাকা হিসাবে অবিভক্ত বঙ্গদেশকে চিনেছেন তিনি- উত্তরে লাল মাটির এলাকা, দক্ষিনে সুন্দরবন, ঢাকা, পাবনা হয়ে মুর্শিদাবাদের নামও পাওয়া যায়। কৃষিই গ্রাম বাংলার প্রধান কাজ, বিস্তীর্ণ চাষের জমি, পাকা সড়ক খুবই কম। রায়ত আছে, জমিদার আছে। গাছের তলায় জড়ো হয়ে পাঠশালা পরিচালনার উল্লেখও আছে। তৎকালীন গ্রাম বাংলায় সম্পন্ন চাষিদের ঘরবাড়ি, গৃহস্থের দালান, উঠোন ও বৈঠকখানা তার নজর এড়ায়নি। জমিদার-মহাজনী ব্যবস্থার সারাংশ হিসাবে কৃষিজমির মোট ছয় রকম প্রকারভেদ লিখে রেখেছেন-

১) সালি জমি – বৃষ্টির জলে নির্ভরশীল আবাদ জমি। 

২) নাদকি জমি – বিঘা প্রতি খাজনা দেওয়া হয় এমন জমি। 

৩) ভাওলি জমি – এই জমি থেকে প্রাপ্ত ফসলে খাজনা দেওয়া হয়, ঈশ্বরের খাতে কিছু কাঁচা পয়সার খাজনাও চলে। 

৪) ভিটা জমি- বাড়িঘর রয়েছে এমন জমি। 

৫) খুদকস্ত জমি – খুদকস্ত কথাটি মুঘল শাসনে প্রাপ্ত, এ হল সেই জমি যা সম্রাটের ফরমানে কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে চাষিকে দেওয়া হয়েছে। একমাত্র গ্রামের বাসিন্দারাই এই জমিতে চাষ করার অধিকারী। 

৬) পাহিকস্ত জমি- এক্ষেত্রেও নামটি মুঘল শাসনের সময়কার। গ্রামের বাইরে থেকে আসা কৃষকরাও চাষ করতে পারবে এমন জমি।

রায়তদের থেকে আদায় হওয়া একবছরের খাজনার তালিকাও মার্কস নিজের খাতায় লিখে রাখেন। টাকা, আনা ও পয়সা তিনরকম মুদ্রাই সেই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। কাচেরি (কাছারি) ঘরে জমিদারের হিসাব রাখা হত বিভিন্ন খাতায়, জমির অধিকারীর নাম সহ সেই খাতাই হল ‘খতিয়ান’। হিসাব রক্ষণের পদ্ধতি ‘জমা-বন্দি’। আবাদি জমির উৎকর্ষ অনুযায়ী বিভিন্ন জমির ক্ষেত্রে নানা হারে একাধিক কিস্তিতে খাজনার মোট পরিমাণ নির্দিষ্ট হত। জমিদারের হিসাবে থাকতো তিনটি কলাম- একটিতে মোট পাওনা, আরেকটিতে জমার পরিমাণ এবং শেষে বাড়তি আদায়- আধুনিক ভাষায় যাকে এরিয়ার বলে। 

উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ইতিহাসের শ্রেণীবিভাজনের আবিস্কারক মার্কস অবিভক্ত বাংলার সাধারণ কৃষকসমাজে ব্যবহৃত প্রাচীন যন্ত্রগুলির বিবরণ কিভাবে এড়িয়ে যেতেন! জন বুড ফিয়ারের লেখনি থেকে তিনি সযত্নে সংগ্রহ করেছেন কিভাবে ঢেঁকীর আঘাতে নিখুঁত পেষাইয়ের কাজ চলে। লাঙলের ফলা থেকে শুরু করে হিন্দু গৃহস্থের উঠোনে নির্মিত তুলসিতলার পাশ দিয়ে এগিয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন মুসলমান প্রজার ধানের গোলা অবধি। 

জনের বই থেকেই তিনি জেনেছেন চৈতন্যের কথা, ৩০০ বছর আগে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সেই মানুষটি যার ভক্তিগীতির অভিঘাতে হয়ত প্রথমবার এদেশের মাটিতে উঁচু-নিচু জাতিবিভেদের অভিশাপ ভুলে বাংলার মানুষ ইশ্বর অর্চনার অধিকার পেয়েছিল। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী বিশ্ববিক্ষায় গোটা দুনিয়ার পরিবর্তন সাধনকেই যিনি দার্শনিক সাফল্যের পরাকাষ্ঠা চিহ্নিত করেছিলেন সেই কার্ল হাইনরিখ মার্কস নোট নিচ্ছেন ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত বাংলার সামাজিক ইতিহাসে ঘটে যাওয়া এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের- আরও কিছু বছর বেঁচে থাকলে ‘অন রিলিজিয়ন’ প্রসঙ্গে হয়ত আমরা চৈতন্যের উল্লেখ খুঁজে পেতেও পারতাম। 

৬)

প্রাক্-পুঁজিবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে রূপান্তর ঘটিয়েছিল যে বিপ্লব তার প্রগতিশীল চরিত্রকে মার্কস কখনো আড়াল করেননি। কিন্তু সেই বিপ্লবের অভিঘাতেই নষ্ট হয়েছে ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত সমস্ত সুপ্রাচীন মানবিক মূল্যবোধ- মানুষে মানুষে সমস্ত সম্পর্কের মাঝে ভিত্তি হয়েছে অর্থ- টাকাপয়সা। এহেন সমাজে লাগামহীন মুনাফার স্পৃহা মানুষকে ভুলিয়ে দিয়েছে এই পৃথিবীতে একক আত্মপরিচিতির যে গর্ববোধ পুঁজিবাদী সংস্কৃতির প্রাণভোমরা তা আসলে সামাজিক অস্তিত্বে অন্যের শ্রমের উপরে নির্ভর করে বেঁচে থাকার চিরায়ত সত্যকেই গায়ের জোরে নাকচ করার ঝুটা তত্ত্ব। আসলে কৌম যাপনের অনেক আগেই প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতার কারনেই মানুষের মাথায় গেঁথে গেছে এককের চেতনা সমৃদ্ধ অনুভব। সেই অনুভবেই সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মানুষ (যারা আসলে সমাজের উচ্চ শ্রেণীতে থাকার জোরে শ্রমসম্পর্ককে সহজাত অধিকার বলে মনে করে) বারে বারে নিজেকে একা বলে খুঁজে পায়- সেই একক অনুভবের শিকড় রয়েছে পরিবারের মাথা হিসাবে স্বয়ংক্রিয় ব্যক্তিত্বের ইতিহাসে। প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিক যৌথবদ্ধতার কারনেই সামাজিক ন্যায়, সমানাধিকারের ধারণা নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠীজীবন, নিরন্তর এগিয়ে চলা সামাজিক শ্রমবিভাজন শ্রেণীবিভেদের ভিত গড়ে দেয়। বাড়তি উৎপাদনের উপরে মালিকানার অনেক আগে পরিবারের সদস্যদের উপরে যে মানবিক সত্ত্বা হুকুম জারী করতো সেই আসলে দুনিয়াতে প্রথম ‘একা মানুষ’। এই ছিল নৃতত্ত্ব প্রসঙ্গে মার্কসের মুল কথা। 

তাই সংকীর্ণ অর্থে ‘ডাউট এভরিথিং’ বললেই মার্কসের সবটা বোঝা যায় না। তার সাথেই মনে রাখতে হয় মেয়ে জেনির ডায়েরির পাতায় লেখাটিও- নীতিবাক্য হিসাবে নিজের জীবনে সর্বদা একটি কথাই মার্কস মেনে চলেছেন- মানবিক কোনোকিছুই তাঁর কাছে কখনো অনাত্মীয় ছিল না; সেই জন্যই ‘নাথিং হিউম্যান ইস অ্যালিয়েন টু মি’। 

* লেখায় অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার থেকে উল্লিখিত অংশবিশেষের বাংলা ভাষান্তর বর্তমান লেখকের


তথ্যসূত্রঃ 

১) জন বুড ফিয়ার – আরিয়ান ভিলেজ ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সায়লন, লন্ডন

২) দ্য এথনোলজিক্যাল নোটবুকস অফ কার্ল মার্কস- সম্পাদনা ও ভাষান্তরঃ লরেন্স ক্রেডার

৩) দ্য এথনোলজিক্যাল নোটবুকস অফ কার্ল মার্কস- সাম মেথডোলজিক্যাল রিফ্লেকশন্সঃ অর্চনা প্রসাদ

৪) এইট্টিন্থ ব্রুমেয়ার অফ্ ল্যুই বোনাপার্ট – কার্ল মার্কস

৫) আ কনট্রিবিউশন টু দ্য ক্রিটিক অফ্ পলিটিক্যাল ইকোনমি – কার্ল মার্কস

৬) ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া – কার্ল মার্কস

৭) ওরিয়েন্টাল ডেসপটিজমঃ কার্ল অগাস্ট উইটফোগেল, ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস 


প্রকাশের তারিখ: ০২-মে-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org