ভারত প্রসঙ্গে লেনিন

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
আর এই সময়েই ভারতে কম্যুনিস্টদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভায় গৃহীত (কাবুলে) শুভেচ্ছাবাণীর উত্তরে লেনিন 'ভারতের বিপ্লবী অ্যাসোসিয়েশনের' উদ্দেশে একটি অভিনন্দনবার্তা পাঠান। সেটি রেডিও মারফত প্রচারিত হয়। যার মধ্যে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা (ভারতে) মুসলিম ও অ-মুসলিম জনগণের ঐক্যকে অভিনন্দন জানাই। পূর্ব-দুনিয়ার সমস্ত দেশে এই ঐক্য প্রসারিত হোক। যখন ভারতীয়, চীনা, কোরিয়া, জাপানী, পারসীয় ও তুর্কীর শ্রমিক ও কৃষক হাতে হাত মিলিয়ে মুক্তির একই লক্ষ্যে অগ্রসর হবে তখনই শোষকদের বিরুদ্ধে নিশ্চিত জয় সম্ভব হবে। মুক্ত এশিয়া দীর্ঘজীবী হোক।”

মার্কসবাদকে বিকশিত করেন লেনিন। লেনিনবাদ হল সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারার বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। লেনিন শুধু বিশ্বের প্রথম সর্বহারা বিপ্লবের রূপকার নন, তিনি বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মনীতি ও কর্মকৌশল রচনায় এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। লেনিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র বিশ্লেষণ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মুক্তিসংগ্রামের কর্মকৌশল রচনা। এই প্রসঙ্গেই লেনিন উপনিবেশ ও পদানত দেশগুলির মুক্তিসংগ্রাম সম্পর্কে বার বার তাঁর মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ভারত সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছড়িয়ে আছে তারই অজস্র রচনায়। বর্তমান প্রবন্ধে ভারত সম্পর্কে লেনিনের বিভিন্ন রচনার একটি সাধারণ পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। লেখাটি বিশ্লেষণাত্মক নয়, কালানুসারে তাঁরই রচনার সংকলন বলা যেতে পারে।

(এক)

'দি ওয়র ইন চায়না' রচনাটি ১৯০০ সালের। এই রচনাতে সাম্রাজ্যবাদ ও পরাধীন দেশগুলির অবস্থা সম্পর্কে একটি মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিন তার থিসিস রচনার বহুপূর্বেই এই রচনাটিতে মন্তব্য করেছিলেন যে দ্রুত বিকাশশীল পুঁজিবাদী দেশগুলি উপনিবেশ খুঁজছে এবং অনুন্নত দেশগুলিকে তাদের পদানত করছে উচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য। এই কারণেই পুঁজিবাদী দেশগুলি উপনিবেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে, যুদ্ধ করছে। উপনিবেশে বিদ্রোহ বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে। এই প্রবন্ধেই লেনিন প্রথম স্মরণ করেছেন ভারতের জনগণের বিদ্রোহের কথা আর ব্যুয়র যুদ্ধের কথা।

(দুই)

মহান নভেম্বর বিপ্লবের আগেই ও সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে তাঁর মূল সূত্র রচনার আগেই লেনিন উপনিবেশ ও পদানত দেশগুলির ঘটনাবলী সম্পর্কে যেমন সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন, তেমনি এই দেশগুলির সংগ্রাম সম্পর্কেও কর্মনীতিগত দিকনির্দেশও তাঁর প্রাক-বিপ্লব রচনাগুলির মধ্যেও পাওয়া যায়। ইউরোপের উন্নত পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকশ্রেণির কাছে অবশ্যকর্তব্য হল উপনিবেশের স্বাধীনতা। সংগ্রামকে সমর্থন করা, কারণ- “বুর্জোয়া-জাতীয়তাবাদ সে যে কোনও পদানত দেশেরই হোক তার মর্মবস্তু গণতান্ত্রিক, কারণ পরাধীনতার বিরুদ্ধেই তা পরিচালিত এবং এই কারণেই আমরাও তাদের নিঃশর্ত সমর্থন জানাই।" (সংগৃহীত রচনাবলী খণ্ড ২০ পৃ- ৪১২)

(তিন)

ব্রিটিশ বুর্জোয়াশ্রেণির সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিভিন্ন কলাকৌশল ও ব্রিটিশ শ্রমিকশ্রেণিকে অধঃপতিত করার কৌশল সম্পর্কে লেনিন বার বার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। এরকম দুটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা 'দি ইন্টারন্যাশনাল সোস্যালিস্ট কংগ্রেস ইন স্ট্রাটগার্ট' ও 'কনফারেন্স অব দি ব্রিটিশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি।' স্ট্রাটগার্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯০৭ সালের আগস্ট ১৮ থেকে ২৪ পর্যন্ত। এই কংগ্রেসে অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল উপনিবেশিক প্রশ্ন। লেনিন এই কংগ্রেসের উদ্দেশ্যেই বক্তব্য রেখেছিলেন যে- “ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা ইংরেজ শ্রমিকদের চেয়ে ভারত ও অন্যান্য উপনিবেশের লক্ষ লক্ষ জনগণের থেকেই বেশি মুনাফা অর্জন করছে।” এই মুনাফা থেকেই ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা দেশের শ্রমিকশ্রেণিকে অন্ধ জাতীয়তাবাদে আচ্ছন্ন করছে। ১৯৯১ সালে লেখা উল্লিখিত দ্বিতীয় প্রবন্ধে (কনফারেন্স অব দি ব্রিটিশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি) লেনিন লিখেছেন- “ব্রিটিশ নৌ-বাজেট সীমাহীনভাবে বেড়েই চলেছে, তারা সাম্রাজ্য রক্ষা করছে। তার মধ্যে ভারতও আছে। যার জনসংখ্যা ৩০ কোটি, আর যে-দেশটিকে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র লুঠ করছে, ধ্বংস করছে যেখানে 'জ্ঞানদীপ্ত' কিছু, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ উদার নীতিবাদী বা 'র‍্যাডিকাল' মোর্লের মতন লোক সেই দেশের মানুষকে রাজনৈতিক অপরাধে নির্বাসনে পাঠাচ্ছে বা গুরুতর শাস্তি দিচ্ছে।”

(চার)

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সোস্যালিস্ট ব্যুরোর সদস্য হিসাবে (১৯০৫ সালের নভেম্বর থেকে) লেনিন উপনিবেশ ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর সাধারণ মনোভাব আর একটি প্রবন্ধের মধ্যে ব্যক্ত করেছিলেন, সেটি হলো-'দি এওয়েকনিং অব এশিয়া'। যার মধ্যে পদানত প্রাচ্যের দেশগুলিতে ১৯০৫-এর রাশিয়ার বিপ্লবের ফলাফল সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ আছে।

(পাঁচ)

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার এদেশের বিকাশমান গণ-আন্দোলনকে দমন করার জন্য 'সংবাদপত্র আইন' পাশ করে। চারপাশে দমননীতি শুরু হয়। এই আইনের আওতায় জাতীয় নেতা বালগঙ্গাধর তিলককে গ্রেপ্তার করা হয়।  আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তিলক যে বিবৃতিটি দেন তা দেশে-বিদেশে বিপুল সাড়া জাগায়। তা সত্ত্বেও তিলক অর্থদণ্ডসহ ছ-বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২৩শে জুলাই থেকে রাজনৈতিক ধর্মঘট শুরু হয় এর প্রতিবাদে। বোম্বাই-এর শ্রমিকশ্রেণি বিপুলভাবে অংশগ্রহণ করে। ছদিন ধরে ধর্মঘট চলে। সমস্ত স্তরের জনগণ এগিয়ে আসেন। লেনিন এই ঘটনাবলীর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে লিখেছিলেন- 'স্বাধীন ব্রিটেনের সেরা উদারনৈতিক ও র‍্যাডিক্যাল প্রতিনিধিবর্গ, রুশ ও অরুশ ক্যাডেটদের আদর্শ', 'প্রগতিশীল' সাংবাদিকতার জ্যোতিষ্কস্বরূপ (আসলে পুঁজিতন্ত্রের তল্পিবাহক) জন মর্লির (ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রসচিব-লেখক) মতো মানুষেরাও ভারত শাসনের দায়িত্ব পেলে রীতিমতো চেঙ্গিস খাঁ হয়ে ওঠেন। নিজেদের অধীনস্থ জনগণকে শান্ত করার জন্য সম্ভাব্য যে কোনও পন্থার, এমন কি রাজনৈতিক প্রতিবাদীদের জন্য বেত্রাঘাত অনুমোদনেও দ্বিধা করেন না।' এটা পরিস্থিতির একদিক, অপরদিক সম্পর্কে ও লেনিন সম্পূর্ণ আশাবাদী ছিলেন। তিনি লিখলেন- 'ভারতীয় গণতন্ত্রী তিলকের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ শৃগালেরা যে জঘন্য দণ্ডাদেশ দেয়— দীর্ঘমেয়াদী নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত হন তিনি এবং এই সেদিন ব্রিটিশ কমন্সসভার এক প্রশ্নে প্রকাশ পেল যে ভারতীয় জুরিরা মুক্তির সপক্ষে ছিলেন আর দণ্ডাদেশটি পাশ হয় ব্রিটিশ জুরিদের ভোটে। গণতন্ত্রীদের ওপর টাকার থলির সেবাদাসদের এই প্রতিহিংসায় বোম্বাইয়ে দেখা দেয় শোভাযাত্রা ও ধর্মঘট। ভারতেও সর্বহারারা ইতিমধ্যেই সচেতন রাজনৈতিক গণ-আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং এই পটভূমিতে ভারতের রুশি ধরনের ব্রিটিশ সরকারের নিশ্চিত পতন ঘটবে।' ('ইনফ্লেমেবল্ মেটেরিয়াল ইন ওয়ালর্ড পলিটিক্স')

(ছয়)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন (১৯১৪-১৯১৮) পরিস্থিতিতেই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধিতার পাশাপাশি পরাধীন উপনিবেশগুলি ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের সমর্থনে লেনিন এগিয়ে আসেন। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও উপনিবেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত সীমারেখাটিও তিনি উপস্থিত করেন। এই সময়ে একাধিক প্রবন্ধে 'দি ইউরোপীয়ন ওয়র অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সোস্যালিজম' (নোটস্) 'সোস্যালিজম অ্যান্ড ওয়র', 'এ ক্যারিকেচার অব মার্কসইজম অ্যান্ড ইমপিরিয়ালিস্ট ইকনমিজম' প্রভৃতি প্রবন্ধে ও বহু চিঠিতে তুর্কী, পারস্য, চীন ও ভারতের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেন। এই সময় একটি চিঠিতে (আলেকজান্দ্রা কোলনতাই/১৯১৫) তিনি লেখেন-"আমি মনে করি তত্ত্বগতভাবে এটা বিভ্রান্তিকর ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক দুই ধরনের যুদ্ধের পার্থক্য বুঝতে না-পারা। জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা আমাদের কাজ নয়। বর্তমান যুগের প্রধান ঘটনা হল বৃহৎ শক্তিগুলির লড়াই উপনিবেশের ভাগবাটোয়ারার জন্য ও ছোটো শক্তিগুলিকে বশে আনার জন্য। ভারতের, পারস্যের, চীনের ও অন্যান্য দেশের সংগ্রাম ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, রুশের বিরুদ্ধে? আমরা কি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতের পক্ষে নয়?"

(সাত)

'ইমপিরিয়ালিজম অ্যান্ড দি রাইট অব নেশানস্ টু সেল্ফ ডিটারমিনেশান' প্রবন্ধে লেনিন বার বার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রসঙ্গগুলি উত্থাপন করেছেন। যার মধ্যে দৃপ্ত ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছিল— “সমাজতন্ত্রীদের জনগণের কাছে পরিষ্কার করে বলা দরকার যে, ইংরেজ সমাজতন্ত্রীরা আয়ারল্যান্ড বা ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে না, তারা মুখেই সমাজতন্ত্রী ও আন্তর্জাতিকতাবাদী আসলে তারা উগ্র জাতীয়তাবাদী ও পররাজ্য লুণ্ঠনকারী।”

(আট)

সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থের রচনার প্রস্তুতিতে লেনিন কঠিন পরিশ্রমসাধ্য পদ্ধতিতে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-মতাদর্শগত অবস্থানকে বিশ্লেষণ করার জন্য জার্মান, ইংরাজি, রুশ প্রভৃতি বহু ভাষায় লিখিত সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে পুস্তক, প্রবন্ধ, পত্রিকা অধ্যয়ন করেছিলেন। (প্রায় ১৪৮টি বই, ২৩২টি প্রবন্ধ, ৪৯টি পত্রিকা) বিজ্ঞানের গবেষকের মতনই এই পর্যায়ে তাঁর নোটগুলির মধ্যে দুটি এখানে উল্লেখযোগ্য। জে এ হবসন লিখিত ইম্পিরিয়ালিজম ও জি ওয়েগনার লিখিত ইন্ডিয়া টুডে। প্রথম গ্রন্থটির মধ্য থেকে লেনিন ভারতের কৃষকের নিদারুণ দারিদ্র্যের বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহ দেখান। দ্বিতীয় প্রবন্ধে লেনিন সাম্রাজ্যবাদী শাসনে ভারতের সাধারণ অবস্থার একটি ছবি নিজের মন্তব্য সহ টুকে রাখেন। একটি উদাহরণ, ভারতে ইংরেজ পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থার ফল হিসাবে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর আবির্ভাবে লেখকের (ওয়েগনার) মন্তব্য- "বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ভুক্ত এই সর্বহারারা খুবই নিকৃষ্ট ধরনের এবং রাজনৈতিকভাবেও খুব বেয়াড়া গোছের।" এই উদ্ধৃতির পাশেই লেনিনের মন্তব্য— “লেখকটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল স্কাউন্ড্রেল”।

(নয়)

মহান নভেম্বর বিপ্লবের তোপধ্বনি সমস্ত পদানত জাতিকেই জাগ্রত ও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় করে তোলে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। কমরেড লেনিনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ও পরামর্শের জন্য বহু ভারতীয় বিপ্লবী সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন। লেনিনও প্রথম সর্বহারা বিপ্লবের নেতা হিসাবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম জাতীয়তাবাদী সভায় রুশ বিপ্লবকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয় ও সাত্তার ও জব্বার এই খৈরী ভ্রাতৃদ্বয় এই প্রস্তাব নিয়ে মস্কো যান। এই প্রতিনিধিদের লেনিন অভ্যর্থনা জানান। ১৯১৮ সালে অস্থায়ী ভারত সরকারের (কাবুল) রাষ্ট্রপতি মহেন্দ্রপ্রতাপ ও পরে বরকতউল্লাহ মস্কো যান। লেনিন এই দলটিকে অভ্যর্থনা জানান। এ ছাড়াও বিভিন্ন মতাবলম্বী ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, যুদ্ধফেরৎ সৈনিক, প্রবাসী ভারতীয় সেদিন রাশিয়ায় গিয়ে লেনিনের নেতৃত্বে প্রথম সর্বহারার রাষ্ট্রের বিপুল কর্মকাণ্ড দেখে এসেছিলেন যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে পড়েছিল।

(দশ)

সোভিয়েত বিপ্লবের পরবর্তীতে লেনিন তার বিভিন্ন রচনায়, বক্তৃতায়, সাক্ষাৎকারে এশিয়ার পদানত দেশগুলির ও ভারতের আন্দোলন সম্পর্কে সোভিয়েত কমিউনিস্টদের মনোভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সময়কার একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা— 'এড্রেস্ টু দি সেকেন্ড অল রাশিয়া কংগ্রেস অব কম্যুনিস্ট অর্গানাইজেশনস্ অব্ পিপলস্ অব দি ইস্ট।' যেখানে দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করা হয় “সোভিয়েত সাধারণতন্ত্র পূর্ব-দুনিয়ার সমস্ত জাগ্রত জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সংগ্রাম করবে।”

আর এই সময়েই ভারতে কম্যুনিস্টদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভায় গৃহীত (কাবুলে) শুভেচ্ছাবাণীর উত্তরে লেনিন 'ভারতের বিপ্লবী অ্যাসোসিয়েশনের' উদ্দেশে একটি অভিনন্দনবার্তা পাঠান। সেটি রেডিও মারফত প্রচারিত হয়। যার মধ্যে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা (ভারতে) মুসলিম ও অ-মুসলিম জনগণের ঐক্যকে অভিনন্দন জানাই। পূর্ব-দুনিয়ার সমস্ত দেশে এই ঐক্য প্রসারিত হোক। যখন ভারতীয়, চীনা, কোরিয়া, জাপানী, পারসীয় ও তুর্কীর শ্রমিক ও কৃষক হাতে হাত মিলিয়ে মুক্তির একই লক্ষ্যে অগ্রসর হবে তখনই শোষকদের বিরুদ্ধে নিশ্চিত জয় সম্ভব হবে। মুক্ত এশিয়া দীর্ঘজীবী হোক।”

(এগারো)

কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯২০ সালের ১৯শে জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত। এই কংগ্রেসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন। এই সম্পর্কিত কমিশনের রিপোর্ট ও গৃহীত মূল দলিলটি রচনায় লেনিন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই কংগ্রেসে ভারতের প্রতিনিধি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ভারতের জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণির চরিত্র, তাদের মতবাদ (গান্ধীবাদ), স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ও প্রভাব সম্পর্কে রায়ের বক্তব্য ছিল একপেশে ও সংকীর্ণতাবাদী দোষে দুষ্ট। লেনিন এই সংকীর্ণ মনোভাবের বিরোধিতা করেন এবং রায়ের থিসিসটি প্রতিনিধিদের অনুমোদন নিয়ে সংশোধন করে দেন। স্বতন্ত্রভাবে সর্বহারার পার্টি, সর্বহারার আন্দোলন ও সর্বহারার নেতৃত্ব প্রচেষ্টার উদ্যোগের পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ব্যাপক মঞ্চেও অংশগ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। শ্রীরায়ের আর একটি ভ্রান্ত তত্ত্ব ছিল যে, ভারতে প্রধান সংগ্রাম ভারতের বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে কারণ ভারতের বুর্জোয়াশ্রেণি স্বাধীনভাবে বিকশিত হচ্ছে এবং হবে। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ তার ঔপনিবেশিক শাসন এদের হাতেই ছেড়ে দেবে (ডিকলোনাইজেশন)। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক লেনিনের নেতৃত্বে এই তত্ত্বের বিরুদ্ধেও ভারতের উপনিবেশবাদ-বিরোধী মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্বকে সঠিক পথনির্দেশ পেতে সাহায্য করে। যার অন্যতম রূপকার ছিলেন লেনিন। ভারতের কমিউনিস্টদের স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মনীতি ও কর্মকৌশল রচনায় তা বিপুলভাবে অনুপ্রেরণা দেয়।

(বারো)

১৯২১ সালের ২২শে জুন থেকে ১২ই জুলাই কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তৃতীয় কংগ্রেসেও লেনিন উপনিবেশগুলির সংগ্রাম সম্বন্ধে তাঁর ভাষণে উল্লেখ [আলোচনা] করেন। ভারতের প্রসঙ্গও সেখানে আসে। তখন এদেশ জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস ঘটনায় অগ্নিগর্ভ। লেনিন পাঞ্জাবের ঘটনা ঘনিষ্ঠভাবে [গভীরভাবে] অনুসরণ করে লিখেছিলেন— “ব্রিটিশ ভারত এই সব দেশের মাথা। যেখানে একদিকে বিপ্লব পরিপক্ক হয়ে উঠছে। শিল্প ও প্রলেতারিয়েতের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ব্রিটিশরা বর্বর সন্ত্রাসের মাত্রাও বৃদ্ধি করছে; তারা সর্বকালের তুলনায় ঘন ঘন গণহত্যা (অমৃতসর) ও জনগণকে চাবুক চালানোর আশ্রয় নিচ্ছে।”

(তেরো)

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রগতিশীল নেতা ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কিত একটি থিসিস লেনিনকে দিয়েছিলেন ১৯২১ সালে। লেনিন সেটি পড়েন ও শ্রীদত্তকে তার উত্তর দেন। যাতে ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্তগুলিকেই অনুসরণ করার জন্য লেনিন অনুরোধ করেন এবং ভারতের কৃষক আন্দোলনের গুরুত্ব সম্পর্কেও লেনিনের মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি এদেশের কৃষক সংগঠনের রিপোর্টও শ্রী দত্তকে পাঠাতে অনুরোধ করেন।

(চৌদ্দ)

সেই সময়কার অন্যতম কমিউনিস্ট নেতা অবনী মুখার্জি মালাবার অঞ্চলের কৃষক অভ্যুত্থানের ঘটনা সম্বলিত একটি প্রবন্ধ পাঠান (১৯২১) লেনিনকে। লেনিন প্রবন্ধটি পড়েন ও কমরেড বুখারিনকে (প্রাভদা-র সম্পাদক) পাঠান ও এই ধরনের আরও প্রবন্ধ ভারত থেকে আমন্ত্রণের আহ্বান জানানোর জন্য বুখারিনকে অনুরোধ করেন। লেনিনের উদ্দেশ্য ছিল ভারত সম্পর্কে আরও খবর সংগ্রহ করা ও ভারতের কমরেডদের আরও উৎসাহিত করা।

(পনেরো)

জীবনের শেষ অধ্যায়ের বিভিন্ন রচনায় তিনি পদানত দেশ ও ভারত সম্পর্কে বহু উল্লেখ ও বিশ্লেষণ করেছেন। প্রাভদা পত্রিকার দশম বার্ষিকী অনুষ্ঠানের (১৯২২/মে) বক্তৃতাটিও এর সাক্ষ্য। এই সম্পর্কে সম্ভবত তাঁর শেষ রচনা 'বরং কম কিন্তু ভালো করে' প্রবন্ধটি। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন— “রাশিয়া, ভারত, চীন ইত্যাদি দেশগুলি পৃথিবীর বৃহত্তম জনসংখ্যার অধিকারী হওয়ার ঘটনাই সংগ্রামের ফলাফল নির্ধারণ করবে। গত কয়েক বছরে এই সংখ্যাগরিষ্ঠরাই অতি দ্রুত মুক্তিসংগ্রামের শরিক হতে শুরু করেছে।”...... (১৯২৩/মার্চ)



মার্কসবাদী পথ-এর এই সংখ্যাটি সংগ্রহ করতে পারেন আমাদের ওয়েবসাইটের আর্কাইভ সেকশান থেকে: মার্কসবাদী পথ, ১৯৮৩ সাল, অগাস্ট সংখ্যা 


প্রকাশের তারিখ: ২০-আগস্ট-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org