হরেকৃষ্ণ কোঙার

সৈয়দ শাহেদুল্লা
১৯৪১ সালে হিটলার কর্তৃক সোভিয়েত আক্রান্ত হবার পর অবস্থার এক বিরাট পরিবর্তন ঘটল। সারা বিশ্বে ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ মুক্তির যুদ্ধে পরিণত হল। আর.পি.ডি.- র (রজনী পাম দত্তের) সে সময়কার লেখার ভাষার, থার্মোমিটার সব অবস্থাতেই একই পরিমাপ দেয় না। সুতরাং পার্টির নীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে হল এবং ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ যাতে সার্থক হয় তার সহায়ক নীতি কর্মসূচী গৃহীত হল। পরিবর্তিত অবস্থার স্বীকৃতিতে এবং ভারত ও বিশ্বের জনমতের দাবিতে পার্টির উপর থেকে "বে-আইনি” ঘোষণার শৃঙ্খল তুলে নিতে হল। পার্টি আইনসঙ্গত উপায়ে কাজ করার অধিকার অর্জন করল। কমরেড হরেকেষ্ট জেল থেকে বেরিয়ে এসে প্রকাশ্যেই কাজে নামলেন।

১৯৩০ সাল। জাতীয় আন্দোলনের এক উত্তাল তরঙ্গ শুরু হয়েছে। অবশ্য গান্ধীজীর নেতৃত্বে। সত্যাগ্রহের অন্যান্য কর্মসূচী ছাড়া লবণ সত্যাগ্রহ এর প্রধান কর্মসূচী। বর্ধমান জেলা কংগ্রেস দপ্তরে যোগদানেচ্ছু ছেলেদের জমায়েত। ১৫/১৬ বৎসরের একটি ছেলে জেলা কংগ্রেসের ঘরের সামনে বারান্দার থাম ধরে আটকে থাকছে এবং তার অভিভাবক (পিতা) তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানা হ্যাঁচড়া করছেন। এই অবস্থায় প্রথম তাকে দেখলেন বিনয় চৌধুরী — ঐ আন্দোলনে বর্ধমান জেলা কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত নায়ক। কংগ্রেসের মুরুব্বিস্থানীয় অন্যান্য নেতারা ঐ কিশোরকে সেদিনকার মতো বাড়ি যেতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু যাকে আটকানোর নয় তাকে কে আটকাবে? নির্দিষ্ট সময়ে তার ঈপ্সিত কর্মসূচী সে পালন করল। ১৯৩০ সালের সত্যাগ্রহে তার জেল হল। সে সময়ে সে মেমারি স্কুলের উচ্চ শ্রেণির ছাত্র। ঐ কিশোরের নামই হরেকৃষ্ণ কোঙার। এইভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ হল ।

বলা বাহুল্য, গান্ধীজীর কর্মসূচী তাঁর আগ্রহ ও উদ্দীপনার সন্তোষ সাধন করতে পারেনি। জেলায় তখন কমরেড বিনয় চৌধুরীর নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদী দল গড়ে উঠেছিল। সহজেই হল তাঁর সঙ্গে সংযোগ। এবার নব-গৃহীত কার্যক্রমের ফলে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি গ্রেপ্তার হন। তখন তিনি বঙ্গবাসী কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। ছাত্রবাস ছিল স্কট লেনের ক্যানিং হোস্টেল। শেষ পর্যন্ত ৬ বৎসর কারাদণ্ড হল এবং আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হলেন। এই সময় জেলায় তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে অনেকে ডেটিনিউ (বিনা বিচারে বন্দি) হলেন। পৃথক কেসে কমরেড বিনয় চৌধুরীর কারাদণ্ড হল। সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে যাঁরা কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকেছিলেন তাঁরা জেলের মধ্যে পার্টির নির্দেশে মার্কসবাদের তত্ত্ব, পার্টির কর্মসূচী ইত্যাদির অধ্যয়ন-অনুশীলনের জন্য উপযোগী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। একে বলা হত কমিউনিস্ট কনসলিডেশন। কমরেড হরেকৃষ্ণ এর অন্তর্ভুক্ত হন। এই পদক্ষেপ তাঁর পক্ষে সহজ ও সঙ্গত ছিল। কারণ বর্ধমানের তাঁর সহকর্মী যাঁরা, তাঁরা বিভিন্ন জেলে, ডিটেনশন ক্যাম্পে এবং বাইরে—সবাই কমিউনিজমের পথেই পা বাড়িয়েছিলেন।

মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার প্রচার ও প্রভাব ছাড়া এ বিষয়ে বর্ধমানের ক্ষেত্রে প্রধান অবদান ছিল কমরেড বঙ্কিম মুখার্জির। তিনি প্রত্যক্ষ সংযোগের মাধ্যমে ও ১৯৩১ সালে বর্ধমান যুব সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে বর্ধমানের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনা করে দিয়েছিলেন। ডাক্তার ভূপেন্দ্রনাথ দত্তেরও অবদান ছিল। তিনিও বিভিন্ন সভা-সম্মেলনে যোগদান করে বর্ধমানের কর্মীদের কমিউনিজমের দিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাছাড়া কমরেড সরোজ মুখার্জির সঙ্গে বর্ধমানের সূত্রে ঘনিষ্ঠতা থাকায় ১৯৩২ সালের গ্রেপ্তারের অব্যবহিত পূর্বেই তাঁর মাধ্যমে কমরেড হরেকৃষ্ণর সঙ্গে কমরেড আবদুল হালিমেরও যোগাযোগ হয়েছিল।

১৯৩৮ সালের প্রথমার্ধে কমরেড হরেকৃষ্ণ জেল থেকে মুক্ত হলেন। আজ স্মরণ করলে কেমন মনে হয় সেদিনও সেই ১৯৩০ সালের মতো একই দৃশ্য। বর্ধমান জেলা কৃষক সমিতির বয়স তখন পাঁচ বৎসর। ইতিমধ্যে শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। প্রায় বছর দুই ধরে শহরের বুকে তার অফিসও দেখা দিয়েছে প্রধান সড়ক বি.সি. রোডের উপর মাত্র ৬/৭ হাত লম্বা-চওড়া ঘর। সেই ঘরেই দপ্তর। জেল থেকে বের হয়ে কংগ্রেস অফিসে খবর নিয়ে কমরেড হরেকৃষ্ণ এলেন সোজা সেই দপ্তরে। পিতা জেল গেট থেকেই তাঁর সঙ্গে আছেন, ঘরে নিয়ে যাবেন। কিন্তু কমরেড হরেকৃষ্ণ সকলের সঙ্গে আলাপ না করে যাবেন না। অগত্যা পিতাকে সঙ্গে থাকেত হচ্ছে। পরিচিত কর্মীদের সঙ্গে তিনি জেলের বাইরের (বিশেষ করে জেলার) এতদিনের রাজনীতির খবর, কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের খবর নিতে লাগলেন। পিতা বার বার বাড়ি যাবার জন্য তাগিদ করছেন, কিন্তু যাই যাই করেও আটকে থাকছেন। শেষে সহকর্মীরা তাঁকে জোর করে বাড়ি রওয়ানা করালেন।

ঠিক এমনিই দেখলাম ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরের শেষে তিনি ও আমি দু-জনেই একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন জেল থেকে মুক্ত হয়েছি এবং প্রায় একই সময় নিজ নিজ বাসায় রাত দশটা নাগাদ পৌঁছেছি। কলকাতায় একই পাড়ায় বাসা। আমি ঘরে ঢোকার পরেই কয়েক মিনিট বাদে শুনি দরজায় হরেকেষ্টর ডাক। খুলে হাসতে হাসতে বললাম—ত্বর সইল না? শেষে অনেক রাত পর্যন্ত ভবিষ্যৎ কাজকর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করে তবে বাসায় ফিরলেন। 

প্রথমে কমরেড হরেকৃষ্ণ কলকাতায় থেকে হাওড়া অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়নের কাজ শুরু করেন। ১৯৩৮-এর অক্টোবরে বিনয়-দা বেরিয়ে আসার পর তিনি তাঁকে বর্ধমান আসতে বলেন। বলা বাহুল্য, আমিও সেইমতো অনুরোধ করতে থাকি। পার্টির জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে তখনও আমি ছাড়া পাইনি। তাঁর মুক্তির পর স্বভাবতই মোটামুটি নেতৃত্বে প্রধানের দায়িত্ব বিনয়-দারই থাকে। সম্পাদকের পদ গ্রহণে তাঁকে বৎসরাধিককাল পর রাজি করতে পারি। আমাদের জেলার অন্যান্য সহকর্মীদের অনুরোধে কমরেড হরেকৃষ্ণ বর্ধমানে এলেন। তখন জেলার দুই প্রান্তে শক্তিশালী আন্দোলন—বর্ধমানের কৃষক আন্দোলন; শহীদ সুকুমার-এর (সুকুমার ব্যানার্জির) নেতৃত্বে যে ছাত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেও ছিল জোরদার; ওদিকে আসানসোল এলাকার কলিয়ারিতে ও রানিগঞ্জ কাগজকলে শ্রমিক আন্দোলন। কাগজকলে ধর্মঘট উপলক্ষেই সুকুমারকে আত্মদান করতে হল। পিকেট লাইনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ইউরোপিয়ান অফিসার নৃশংসভাবে লরির চাকায় পিষে তাঁকে হত্যা করল। তখন থেকে প্রাদেশিক দপ্তরে নেতৃত্বের দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত জেলাই ছিল কমরেড হরেকেষ্টর কর্মকেন্দ্র।

জেলায় তখন প্রথম ক্যানেল আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে সংগঠনের যে গুরুদায়িত্ব এসেছে তাই নিয়ে কর্মীরা ব্যস্ত। জমিদারদের বিরুদ্ধেও কয়েক জায়গায় জোর আন্দোলন চলেছে। মন্তেশ্বরে কনই গাঁয়ে জমিদার বিরোধী আন্দোলনের জন্যই পরে কালনা মহকুমা থেকে কমরেড বিপদবারণ রায় ও শিবপ্রসাদ দত্ত বিতাড়িত হন। অন্যদিকে চকদিঘির জমিদারদের বিরুদ্ধ রায়নার আদমপুরের প্রবল আন্দোলন চলছিল। উক্ত আন্দোলনেও কমরেড হরেকৃষ্ণ সক্রিয় অংশ নিয়ে থাকেন। তাছাড়া তখন কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও কর্মসূচী নেওয়া হয়েছিল। এর জন্যও কমরেড হরেকৃষ্ণকে প্রচুর খাটতে হয়েছিল। সদর মহকুমা কংগ্রেস কমিটির নির্বাচনে দক্ষিণপন্থীদের পরাজিত করে বামপন্থী বন্ধু-বান্ধব সহ আমরাই জয়ী হই এবং কমরেড হরেকৃষ্ণকে মহকুমা কংগ্রেসের সম্পাদক হতে হয়।

যুদ্ধ বাধল। তখন এর চরিত্র সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। এর বিরোধিতাই আমাদের উদ্দেশ্য। ব্রিটিশ সরকারও বসে থাকল না। জেলা থেকে আমাদের অনেক কর্মীকে বহিষ্কার করল; সব নাম দিতে গেলে দীর্ঘ তালিকা হবে এবং বিষয়ান্তরে যেতে হবে। যাই হোক, কমরেড হরেকেষ্টও তাঁদের অন্যতম। তাঁর উপর নোটিসটি সার্ভ করতে পেরেছিল। জেলা থেকে এইরূপ বহিষ্কৃত অবস্থাতেই তাঁর বিবাহ স্থির হয়। আমাদের অর্থাৎ জেলা কমিটির অনুমতি চাইলে আমরা সানন্দেই অনুমতি দিই। অবশ্য গৃহে থাকা অসম্ভব হবে একথা তখন আমরা ভাবিনি।

তাঁর পিতা ছিলেন ব্যবসায়ী। জেল থেকে বেরোবার পর, তিনি স্বভাবতই আশা করেছিলেন, ছেলে তাঁর কাজে যোগ দিবে। মনে বোধ হয় একটা পরিকল্পনাও করে রেখেছিলেন। কিছুতেই যখন ছেলেকে ঘরে বসাতে পারছেন না তখন ভাবলেন, বিয়ে দিলে বোধ হয় তাকে সংসারী করা সম্ভব হবে। তাঁকে হতাশ হতে হল; পিতাপুত্রে বিচ্ছেদ ঘটাল। (পিতার জীবনের শেষ কয় বৎসর অবশ্য সে বিচ্ছেদ থাকেনি) যাই হোক, তখন বাড়িতে থাকা অসম্ভব হল। বাইরের রাজনীতিতেও তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে যাবার প্রয়োজনীয়তা হয়ে পড়েছে। সুতরাং স্থির হল বিনয়দা ও হরেকৃষ্ণ তাঁর স্ত্রীসহ আন্ডারগ্রাউন্ডে যাবেন। বাইরের দায়িত্ব থাকবে সহকর্মীদের; কল্যাণীয়া ভগিনী বিভাকে বিবাহের তিন মাসের মধ্যেই স্বামীর সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হল। তিনি সাগ্রহেই তা বরণ করলেন।

ইতিমধ্যে একটি ব্যাপারে আমাদের কার্যসূচীতে বিঘ্ন উপস্থিত হল। বিনয়দা ও হরেকেষ্ট সীতারামপুর স্টশনে নামার পর পুলিশের নজরে আসেন ও ধৃত হন। বিনয়দাকে বহিষ্কারের নোটিস সার্ভ করে বিদায় দেওয়া হয়। কিন্তু হরেকেষ্টর নোটিস সার্ভ হয়ে থাকায়, জেলার মধ্যেই ধরা পড়া অপরাধ হয়ে দাঁড়ালো এবং কয়েক মাসের জেল হল।

১৯৪১ সালে হিটলার কর্তৃক সোভিয়েত আক্রান্ত হবার পর অবস্থার এক বিরাট পরিবর্তন ঘটল। সারা বিশ্বে ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ মুক্তির যুদ্ধে পরিণত হল। আর.পি.ডি.- র (রজনী পাম দত্তের) সে সময়কার লেখার ভাষার, থার্মোমিটার সব অবস্থাতেই একই পরিমাপ দেয় না। সুতরাং পার্টির নীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে হল এবং ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ যাতে সার্থক হয় তার সহায়ক নীতি কর্মসূচী গৃহীত হল। পরিবর্তিত অবস্থার স্বীকৃতিতে এবং ভারত ও বিশ্বের জনমতের দাবিতে পার্টির উপর থেকে "বে-আইনি” ঘোষণার শৃঙ্খল তুলে নিতে হল। পার্টি আইনসঙ্গত উপায়ে কাজ করার অধিকার অর্জন করল। কমরেড হরেকেষ্ট জেল থেকে বেরিয়ে এসে প্রকাশ্যেই কাজে নামলেন।

১৯৪২ সালের ৯ই আগস্ট থেকে কিছুকাল আমাদের কি আসুবিধা হয়েছিল তা সবারই জানা। যে-যুদ্ধ দেশের স্বাধীনতা ও জনসাধারণের মুক্তির স্বার্থে আমাদের সাহায্য করা উচিত বলে মনে করছিলাম সে-যুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে সোভিয়েতের সঙ্গে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টও যুদ্ধে রত। যুদ্ধকালে এক রিলিফের ব্যাপার ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারেই ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বরং ব্রিটিশ সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে চিরন্তন দাবি-দাওয়া আদায়ের চেষ্টা—এই ছিল কর্মসূচীর প্রধান অঙ্গ। এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা অবশ্য এখানে সম্ভব নয়। শুধু এইটুকু বোঝা দরকার যে এই সময় জনগণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যাতে বিচ্ছিন্ন না হয় এবং জনগণকে দেশের স্বার্থে প্রকৃত পথে আমাদের সঙ্গে রাখতে পারি তার জন্য বিরতিহীন আন্দোলন পরিচালনা ব্যাপারে মহল্লায় মহল্লায় সভা করতে হয়। এ সময় সারা দেশব্যাপী কমিউনিস্ট কর্মীগণকে এই কাজে এবং দুর্ভিক্ষ ও অনাচারে বিপন্ন জনগণের সাহায্যে অকাতরে পরিশ্রম করতে হয়। দেশের রাজনীতিক চেতনাসম্পন্ন এক বড় অংশকে আমরা প্রকৃতপক্ষে আমাদের সঙ্গে রাখতে পারি।

ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের হৃদয়হীন নীতি এবং জোতদার ও চোরাকারবারিদের নৃশংস লালসার ফলে ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের কথাও সবারই জানা। বিস্তৃত বিবরণ প্রয়োজন নেই। এই সময় প্রতিটি কমিউনিস্টের কর্তব্য দাঁড়ায় জনগণকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা, খাদ্য ও রিলিফ আন্দোলন, গভর্নমেন্টের অনিচ্ছুক হাত থেকে রিলিফ আদায় ও বিতরণ এবং জোতদার ও গ্রামের অপেক্ষাকৃত সৌভাগ্যবানদের ঋণে ও সস্তা দরে ধান ছাড়তে বাধ্য করা—আমাদের কর্মসূচীর প্রধান অংশ দাঁড়াল। গভর্নমেন্টকে সস্তা দরে এবং দুঃস্থ শ্রেণিকে বিনামূল্যে চাল-গম দেওয়ায় বাধ্য করা ছিল অন্যতম কার্যক্রম। সম্পূর্ণ দায়িত্ব তখন বিদেশি গভর্নমেন্ট নেননি, এখন স্বদেশী গভর্নমেন্টও নিচ্ছেন না। কিন্তু এই বিষয়ে সরকারের দায়িত্ব আছে, এই নীতি গ্রহণে বাধ্য করার মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত গণ-আন্দোলনের সাফল্যের স্বীকৃতি আছে।

বর্ধমান জেলায় তখন আমরা পার্টির কর্মসূচী অনুযায়ী ঐক্যবদ্ধ খাদ্য আন্দোলন এবং তদনুযায়ী সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। আন্দোলনের জোরে বর্ধমান শহরে এক বড় অংশকে সস্তায় রেশন দেওয়ানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। অন্যান্য শহরাঞ্চলেও এর প্রতিফলন হয়। গ্রামাঞ্চলে কৃষকসভার জোরদার আন্দোলনের ফলে জোতদারের কাছে ধান ঋণ আদায়ে পার্টি কৃষকসভার প্রভাবিত অঞ্চলগুলিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হয়। পাটির সকল কর্মীই এইসব কাজে আত্মনিয়োগ করেন। রায়নায় আমাদের কাজ গ্রামাঞ্চলে আমাদের কাজের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। প্রায় সমগ্র থানা এবং পার্শ্ববর্তী খণ্ডঘোষ এবং জামালপুর থানার কিছু অংশ জুড়ে কিছুদিন আমরা জোতদার ও ধনী কৃষকদের ধান বিক্রি বন্ধ করে দিতে পেরেছিলাম। গ্রাম ও পাশাপাশি গ্রামে ঋণ দেওয়ার পূর্ণ তালিকা মেনে নেওয়ার পরই শুধু বাকি অংশ বিক্রয়ের ছাড় দেওয়া হত। কৃষক সভার অনুমতি ব্যতিরেকে গাড়ি ও গাড়োয়ান পাওয়া ছিল অসম্ভব। আর পেলেও গ্রাম থেকে বেরোতে পারত না কিংবা পথে আটক পড়ত। জেলার অন্যান্য জায়গায় উল্লেখের প্রয়োজন নেই। এ সব কথা উল্লেখ করলাম শুধু এই জন্য যে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ পদ্ধতিতে এইসব কাজে অন্যান্য সহকর্মীর সঙ্গে কমরেড হরেকৃষ্ণও সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়েছিলেন।

আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও এসে পড়ে। ফুড কমিটিতে আমরা জনগণকে আনতে পেরেছিলাম বলে শহরে আমাদের দাবিরও বেশ কিছু অংশ মেনে নেওয়া হয় এবং বিতরণের দায়িত্বও ফুড কমিটির উপর বর্তায়। সস্তা রেশন দেওয়ার তালিকা ঠিক করা হয় এবং সরকারি অফিসে ফুড কমিটির স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে এক বড় সংখ্যার রেশন কার্ড লিখে বিলির ব্যবস্থা করতে হয়; হিসাবের কাজে দক্ষতার দরুন এই কাজ ও স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব কমরেড হরেকৃষ্ণকে নিতে হয় এবং তিনি সার্থকভাবে তা প্রতিপালন করেন।

১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের সঙ্গে সঙ্গে বর্ধমান জেলার বিরাট অংশ দামোদর ও অজয়ের বানে ভেসে যায়। এ ব্যাপারেও আমাদের ব্যাপক রিলিফ ইত্যাদির কার্যক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। বলা বাহুল্য এতেও কমরেড হরেকৃষ্ণকে দায়িত্ব নিতে হয় এবং পালন করতে হয়। এই সূত্রে আমাদের পরবর্তীকালের কার্যসূচী অজয় বাঁধের উল্লেখ করতে হয়। রেল ও গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের স্বার্থে দামোদর বাঁধের দায়িত্ব সরকার নিত কিন্তু অজয় বাঁধের দায়িত্ব নিত না। ১৯৪৫ সালে জেলার রাজনীতিক জীবনে একটা বড় ঘটনা হচ্ছে জেলায় (হাটগোবিন্দপুরে) প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলন। এই সম্মেলনকে সার্থক করার জন্য আমাদের সকলকেই নির্দিষ্ট দায়িত্ব নিতে হয়। বলা বাহুল্য, অনুষ্ঠানের সাফল্যে কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙার-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ ও বন্যার পর থেকেই অজয় বাঁধের আন্দোলন চলতে থাকে। এলাকার গণ-আন্দোলন ও সংগঠনের পার্টির তরফ থেকে দায়িত্ব ছিল কমরেড বিপদবারণ রায় ও কমরেড দাশরথি চৌধুরীর। আমাদের ও জনগণের দাবি ছিল সরকারকে এই বাঁধের দায়িত্ব নিতে হবে।

সরকার সম্মত ছিল না। আমরা জেলার ঐক্যবদ্ধ জনমতকে স্থানীয় জনগণের পিছনে নিয়ে আসতে সমর্থ হই। আন্দোলনের শীর্ষ এক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট নয়টি ইউনিয়ন বোর্ডের সমস্ত সদস্য (৮১ জন) সংগঠিত বিরাট জনতার সমাবেশের ডেপুটেশন নিয়ে গিয়ে কালেক্টরের কাছে একযোগে পদত্যাগপত্র পেশ করেন। লক্ষ করার বিষয় যে সদস্যদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৭ জন ছিলেন সরকার মনোনীত। তবু এরূপ সম্ভব হল কৃষকসভার আন্দোলনের ফলে। বক্তব্য ছিল বন্যা প্রতিরোধের ব্যবস্থা না হলে তাঁরা ইউনিয়ন বোর্ড (এবং স্বভাবতই চৌকিদারি) ব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে পারবেন না। শেষে সরকারকে রাজি করা সম্ভব হল কিন্তু তাঁরা সেটা এমন সময় করলেন (জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ ভাগে ৩রা জুন) যাতে তাঁরা দাবি মেনেছেন অথচ কার্যত করা গেল না বিষয়টা এইতেই পর্যবসিত হয়। যা সম্ভব নয় তাই কৃষকসভা ও সংশ্লিষ্ট গণ-সংগঠন অজয় বাঁধ কমিটি সম্ভব করল। কন্ট্রাক্টর বলল চাষের সময় মজুর কোথায় পাওয়া যাবে? কয়দিনেই তো বান আসবে। কৃষকসভা সমগ্র মানুষকে, সমাজকে, যাঁরা নিজ হালে চাষ করেন তাঁদের ও সমগ্র স্থানীয় মানুষকে বাঁধের কাজে মজুরের কাজ করার আবেদন করল। সপ্তাহকাল লাঙল বন্ধ ঘোষণা করল। কমরেড বিপদবারণ রায় ও কমরেড দাশরথি চৌধুরী ছাড়া এই সময় পার্টির সমস্ত নেতৃস্থানীয় কর্মীও এই কাজে নিযুক্ত। কৃষকসভার অন্যতম নেতা হিসাবে কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙার-এর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তখনকার বিধানসভার আসন ব্যবস্থা অনুযায়ী কয়লা খনি শ্রমিকদের একটি বিশেষ নির্বাচন কেন্দ্র ছিল। এই নির্বাচনে ১৯৩৭-এ কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি জয়ী হয়েছিলেন। যোগাযোগ যদিও পূর্বেও ছিল, এই নির্বাচনের মাধ্যমেই আসানসোলে আমাদের শ্রমিক আন্দোলনের সূত্রপাত। ১৯৪৬-এ এই কেন্দ্রে পার্টি প্রার্থী করেছিল ইন্দ্রজিৎ গুপ্তকে। জেলা পার্টির সমগ্র শক্তিকে এই নির্বাচনে যুক্ত করতে হয়। এই নির্বাচনে প্রাথমিক সংগঠনের কাজ থেকে শুরু করেই কমরেড হরেকেষ্টকে নিতে হয় শত্রুর শক্তিশালী ঘাঁটি কাজোরায় । সহায়ক ছিলেন শহীদ প্রভাত কুণ্ডু। কমরেড কৃষ্ণচন্দ্র হালদার প্রমুখ এই কাজোরা কেন্দ্রে তাঁর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছিলেন। ছোরা গ্রামকে কেন্দ্র করে কমরেড হরেকেষ্ট সমগ্র এলাকা সংগঠন করছিলেন। কাজোরা গ্রামের অফিসে তদন্ত করতে গিয়ে দেখেন শত্রুরা আক্রমণের জন্য জমায়েত সৃষ্টি করেছে। সেদিন স্থানীয় কমরেডরা ইশারায় তখনই ফিরতে নির্দেশ না দিলে সেখানেই তাঁকে প্রাণ দিতে হত; তিনি ইশারা বুঝে ফিরলেন। সাইকেলে ছিলেন। কিন্তু শত্রুরা সেই অবস্থাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। সজোরে একটা লাঠির আঘাত পায়ে পড়ল এবং হাড় ভেঙে গেল। সেই ভাঙা পা নিয়েই কমরেড পাঁচ মাইল সাইকেল চালিয়ে ছোরা গ্রামে এসে পৌঁছেছিলেন। পোলিং-এর আগের দিন আমরা যখন আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে উপস্থিত হলাম তখন দেখি বেদনায় কাতর হয়ে বিছানায় শায়িত। তবু তিনি পোলিং-এর শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র ছাড়েননি।

১৯৪৬-৪৭-এ দ্বিতীয় ক্যানেল আন্দোলন। সরকার প্রথম ক্যানেল আন্দোলনের পরে যে চুক্তি হয়েছিল তা লঙ্ঘন করে কর বৃদ্ধি করেন এবং বাধ্য হয়েই কৃষক সমিতির ক্রোক করা গোরু খোঁয়াড় থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ফলে বিনয়দা, হরেকেষ্ট, আমি এবং আরও অনেক ৩৯৫ ধারায় ডাকাতির অভিযোগে অভিযুক্ত হই। কিছুদিন আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করতে হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গে সরকার ডাকাতির মামলা প্রত্যাহার করে, আমরা ছাড়া পাই এবং কংগ্রেস মন্ত্রীমণ্ডলী আমাদের দাবি আংশিক মেনে নিয়ে নতুন চুক্তি করেন।

এরপরই বলতে হয় ১৯৪৮-৪৯-ঘটনা। ১৯৪৮ সালে পার্টি কংগ্রেসের পর ২৬শে মার্চ পাৰ্টি বে-আইনি হয়। ঐ দিনই বর্ধমান পার্টি অফিস থেকে কমরেড হরেকৃষ্ণ এবং অন্যান্য কমরেডরা গ্রেপ্তার হন। বিনয়দা, আমি, মনসুর হাবিব (তখন প্রাদেশিক কৃষকসভার সম্পাদক, সে সময় বর্ধমানে ছিলেন), কমরেড সুবোধ চৌধুরী, কমরেড বিপদবারণ রায়, কমরেড দাশরথি চৌধুরী প্রমুখ আন্ডারগ্রাউন্ড যেতে সক্ষম হই। প্রথম তিন মাসের অর্ডার শেষ হওয়ার পর কমরেড হরেকেষ্টও বাইরে বেরিয়ে জেলা কমিটির নির্দেশে কিছু কাজ গুছিয়েই অবিলম্বে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে আসেন।

বিভিন্ন কাজের মধ্যে ভাগচাষ আন্দোলন ও খেতমজুর আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। রায়নায় এরূপ আন্দোলনে আমাদের কমরেড সন্তোষ ও যুগল শহীদ হন। এই সময় আউসগ্রামের বিল্বগ্রামে কমরেড হরেকৃষ্ণ জোতদারদের দ্বারা ধৃত ও গুরুতররূপে প্রহৃত হন। শেষে পলায়ন করতে সমর্থ হলেও মারের ফলে তার কান জখম হয়। কয়েকটি দাঁতও যায়।

১৯৫০ সালে আন্ডারগ্রাউন্ড অবস্থায় বর্ধমান শহরে ছাত্র ও শহরের কর্মীদের সভা পরিচালনার সময়ে আমরা পুলিশ কর্তৃক ঘেরাও হই। কমরেড হরেকৃষ্ণ পলায়ন করতে সমর্থ হন। বাকি আমরা ১৪ জন গ্রেপ্তার হই। মামলার পরে খালাস হই। ১৯৫১ সালে পরিবর্তিত অবস্থায় আমরা প্রকাশ্যে কাজ শুরু করেছি কিন্তু হরেকৃষ্ণ, সুবোধ চৌধুরী, শিবশঙ্কর চৌধুরী, তারাপদ মোদক প্রমুখ জেলাকমিটির অন্যান্য কমরেডরা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকলেন। বিনয়দা জেলে ছিলেন। সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত কমরেড হরেকৃষ্ণ আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকলেও কেবল ক্ষিপ্রগতির মাধ্যমে ধরা না পড়েও প্রকাশ্য আন্দোলনে নিযুক্ত কর্মীদের সঙ্গে সমতালে ও সমরূপে কাজ করে গেলেন। নির্বাচনের পরে প্রকাশ্য আন্দোলনে বেরিয়ে আসেন।

১৯৫৪ সালে তিনি প্রাদেশিক কৃষকসভার সম্পাদক নিযুক্ত হন। অতঃপর তাঁর কাজ সম্বন্ধে মোটামুটি এখানকার সকলে পরিচিত। দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে ক্রমোত্তর আমাদের মতভেদের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। শেষে ১৯৬২-৬৩ সালে আমরা কিভাবে গ্রেপ্তার হলাম তাও সুবিদিত। ১৯৬৪ সাল হতে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির পরিচ্ছেদ শুরু হল। পার্টি বিভক্ত হওয়ার পর স্বতন্ত্র ধারায় পার্টি নেতৃত্ব কৃষক আন্দোলনের শক্তিশালী করার দায়িত্ব পড়ল অন্যান্যদের সঙ্গে কমরেড হরেকৃষ্ণর উপর। পরের কাহিনির বিবরণ এখানে আর দিচ্ছি না।

কিন্তু প্রবন্ধ শেষ করার পূর্বে তাঁর সম্বন্ধে কয়েকটি কথা না বলে পারছি না। প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই দেখেছি তিনি নিজের ব্যক্তিগত কায়িক ও সাংসারিক সুখ-সুবিধা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন। ব্যক্তিগতভাবেও যখন কোনো অর্থ হাতে এসে পড়ত তাও তিনি পার্টি ফান্ডে জমা দিয়েছেন যদিও গৃহত্যাগের ফলে তাঁর নিজের প্রয়োজনও কম ছিল না। এইভাবে সহস্রাধিক টাকা পার্টি ফান্ডে এলো। স্নেহপ্রবণ আত্মীয়- স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের কাছে কিছু পেলে তাও পার্টির ফান্ডে জমা দিতেন। ব্যক্তিগত অভ্যাসের দিক থেকে শৃঙ্খলার সঙ্গে এত অধ্যবসায়ী মানুষ কম দেখা যায়। তাঁর পা, কণ্ঠস্বর কিংবা হাত (অর্থাৎ কলম)-এর মধ্যে একটা কিংবা একাধিক সদাসর্বদা কাজে নিযুক্ত থাকত। পাঠকরা তাঁর প্রবন্ধাদি যা পড়েছেন তাঁর অধিকাংশ, প্রায় সবই দিনান্তর পরিশ্রমের পর এবং পরের দিনের কার্যসূচী পালনের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালে রাত্রের মধ্যে লেখা। সর্বদিকে এ রকম অকাতর পরিশ্রমের দৃষ্টান্ত বাঙালির মধ্যে বিরল। অন্য কমরেডের সুবিধার দিক হেসে খেলেই দেখে যেতে পারত। আমার নিজের অভিজ্ঞতা এখানে না বলে পারছি না। এক সঙ্গে অনেক দূর হাঁটাকালে প্রায়ই আমার থলিও তাঁর স্কন্ধে হাজির হত। আপত্তি করলে শুনতেন না। সানন্দে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারার এক সহজ গুণ তাঁর ছিল। তার ফলে প্রথমে বর্ধমান জেলায়, পরে সারা পশ্চিমবাংলা জুড়ে প্রতিটি স্থানীয় এলাকাতেই যাঁরা তাঁর সংস্রবে এসেছেন, তাঁরাই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এবং একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনুভব করেছেন।

পরবর্তীকালের রাজনীতিক পরিচয় কমরেডদের জানা। কিছু গোড়ার দিকের কথা এবং ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতির ছাপ এখানে রাখলাম। সম্পূর্ণ সক্ষম অবস্থায় কেবল রোগের আঘাতে আমাদের এ রকম অমূল্য সম্পদকে হারাতে হল, এ বেদনায় সান্ত্বনা পাওয়া কঠিন। তবু কমরেড হরেকেষ্টর স্মৃতি, গত কয়েক বৎসরে যাঁরা শত্রু নিয়োজিত ঘাতকের হাতে প্রাণ দিলেন তাঁদের স্মৃতি, এবং সংগ্রামের আদর্শই আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে এবং তাঁদের প্রদর্শিত পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।


লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় নন্দন, হরেকৃষ্ণ কোঙার স্মরণ-সংখ্যা, শ্রাবণ ১৩৮১ তে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি কর্তৃক প্রকাশিত ‘হরেকৃষ্ণ কোঙার – প্রবন্ধ সংগ্রহ’ -তে লেখাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 


প্রকাশের তারিখ: ২৩-জুলাই-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org