এনকাউন্টার রাজনীতি– আইনের শাসন না ভয়ের রাজনীতি?

অমিত কুমার ঘোষ
এ-রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর অপরাধের প্রবণতা ও সংখ্যা উভয়ই বেড়েছে। বেড়েছে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদির মতো গুরুতর সামাজিক অপরাধও। সরকার যখন দুর্বল হয়, তখন নিজের ক্ষমতা প্রতিপন্ন করতে এনকাউন্টারের মতো ঢালের আশ্রয় নেয়। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। এনকাউন্টার সংস্কৃতির আশ্রয়ে বিজেপি সরকার যেমন একদিকে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিরোধী কণ্ঠের ওপর ভয়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করার রুটম্যাপ বানাচ্ছে। কবিতা লিখেই হোক কিংবা ফাটা কলসির মতো বেজে, এরাজ্যে এনকাউন্টার সংস্কৃতির সামাজিক সম্মতি আদায়ে মন দিয়েছে সরকার। 

​পশ্চিমবঙ্গের পরপর ঘটে যাওয়া এনকাউন্টার বা পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র আলোড়ন রাজ্য রাজনীতিতে। বারুইপুর, গাইঘাটা থেকে ধুলিয়ান— তিনটি ঘটনায় পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যু, আর পুলিশের বয়ানেও দেখা যাচ্ছে অদ্ভুত মিল। মুখ্যমন্ত্রীর ‘সকালে জমা, বিকেলে খরচ’ মন্তব্যের মধ্যেই আইনের শাসন প্রশ্নের মুখে। এনকাউন্টারের রাজনীতি লাগামছাড়া ঘোড়াগাড়ি এখন! এনকাউন্টার শুধুই আর পপুলার জাস্টিস নয়, ইলেক্টোরাল ন্যারেটিভও বটে। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের এই এনকাউন্টার নিয়ে কবিতা, জমা খরচের হিসেব– বিজেপি এ-রাজ্যে এনকাউন্টার সংস্কৃতির জনমত প্রভাবিত করার খেলায় মেতেছে। 

‘Id Quod Alias Non Est Licitum Facit’, এই রোমান লিগ্যাল ম্যাক্সিমের অর্থ– “প্রয়োজন এমন কাজকেও বৈধ করে তোলে, যা অন্যথায় অবৈধ বলে গণ্য হত।” এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং বা বিচারবহির্ভূত হত্যা এই মনস্তত্ত্বকেই ঢাল করে! যাবতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে যে মৌলিক প্রশ্নটা– অপরাধ দমনের নামে রাষ্ট্র কি নিজেই আইন ভাঙতে পারে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধীর অধিকার রক্ষা করার অর্থ অপরাধকে সমর্থন করা নয়। বরং এর অর্থ হল, অপরাধের অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে আইন, প্রমাণ, নিরপেক্ষ বিচার এবং সংবিধান-স্বীকৃত পদ্ধতির মাধ্যমে—রাষ্ট্রের বা কোনো ব্যক্তির ইচ্ছামতো নয়। এনকাউন্টার কিংবা বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে ভীষণ গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। এনকাউন্টার কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যার পক্ষে জনপরিসরে যে যুক্তিটি প্রায়শই দেওয়া হয়, তার কেন্দ্রে রয়েছে মূলত Deterrence Theory কিংবা অপরাধ নিরুৎসাহিত করার তত্ত্ব— অপরাধী যদি জানে যে-অপরাধ করলে তার মৃত্যুও হতে পারে, তাহলে সে অপরাধ করতে ভয় পাবে। রাষ্ট্র যুক্তি দেয়, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে এনকাউন্টার অপরাধীদের মনে তাৎক্ষণিক ভীতি সৃষ্টি করতে পারে, যা আসলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্বিচারে হত্যার ঝুঁকি তৈরি করে। জেরেমি বেন্থাম কিংবা স্টুয়ার্ট মিলের ইউটিলিটারিয়েনিজম বা উপযোগবাদের চরম সংস্করণ বলে, একজন বিপজ্জনক ব্যক্তির মৃত্যু যদি বহু মানুষের জীবন বাঁচায়, তাহলে তা বৃহত্তর জনস্বার্থে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু এখানেই উপযোগবাদী যুক্তির সমস্যা। প্রথমত, অভিযুক্ত ব্যক্তি সত্যিই বিপজ্জনক কি না, তা নির্ধারণে ভুল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিচার ছাড়া হত্যা করলে নির্দোষ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। তৃতীয়ত, রাষ্ট্র যদি নিজেই অভিযোগকারী, বিচারক ও শাস্তিদাতা হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা দুর্বল হয়। 

বিচারবহির্ভূত হত্যার বিতর্কে রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় সমস্যা হল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। মন্তেস্কু The Spirit of the Laws (1748) গ্রন্থে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পুলিশ ও নির্বাহী বিভাগ অপরাধ তদন্ত করবে, আদালত প্রমাণ বিচার করে অপরাধ ও দায় নির্ধারণ করবে, আইনসভা অপরাধ ও শাস্তির আইনি কাঠামো তৈরি করবে। পুলিশ যদি একই সঙ্গে অভিযুক্তকে অপরাধী ঘোষণা করে, তার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করে এবং সেই কাজের বৈধতা নিজেই নির্ধারণ করে, তাহলে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না! John Rawls তাঁর ন্যায়বিচারের তত্ত্বে (A Theory of Justice, 1971) বলছেন যে শুধু অপরাধ কমছে কিনা দেখলে হবে না, বরং রাষ্ট্র কীভাবে অপরাধ দমন করছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গুলি সকলের অধিকার রক্ষা করছে কিনা– সেটাও সমানভাবে দেখতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যখন কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চায়, তখন তাকে আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সেই রাষ্ট্রের পুলিশ যদি বিচার ছাড়াই কাউকে হত্যা করে, তাহলে সেটি কি কার্যত বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ড নয়? মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতা আদালতের। পুলিশের নয়! Bachan Singh v. State of Punjab (1980) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট মানুষের জীবনের মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। এই মামলায় পাঁচ জন বিচারকের বেঞ্চ ‘Rarest of the Rare’ ডকট্রিন তৈরি করে। মৃত্যুদণ্ড কেবল বিরলতম অপরাধের ক্ষেত্রে দেওয়া যাবে, যখন বিকল্প শাস্তি একেবারেই অপ্রতুল বলে আদালত মনে করে। এখন প্রশ্ন হল, আদালত যেখানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে এতগুলি সাংবিধানিক ও বিচারিক শর্ত পূরণ করতে বাধ্য, সেখানে পুলিশ কীভাবে বিচার ছাড়াই কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারে?

এ-রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর অপরাধের প্রবণতা ও সংখ্যা উভয়ই বেড়েছে। বেড়েছে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদির মতো গুরুতর সামাজিক অপরাধও। সরকার যখন দুর্বল হয়, তখন নিজের ক্ষমতা প্রতিপন্ন করতে এনকাউন্টারের মতো ঢালের আশ্রয় নেয়। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। এনকাউন্টার সংস্কৃতির আশ্রয়ে বিজেপি সরকার যেমন একদিকে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিরোধী কণ্ঠের ওপর ভয়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করার রুটম্যাপ বানাচ্ছে। কবিতা লিখেই হোক কিংবা ফাটা কলসির মতো বেজে, এরাজ্যে এনকাউন্টার সংস্কৃতির সামাজিক সম্মতি আদায়ে মন দিয়েছে সরকার। 

​ রাজ্যের মাটিতে পরপর ঘটে যাওয়া এই এনকাউন্টারগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যে আইনের শাসন না ভয়ের শাসন– সরকার কী চায়? প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুর পর তার বাবার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া এবং সাধারণ মানুষের একটা বড়ো অংশের এই ঘটনাকে সমর্থন করা প্রমাণ করছে যে, ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় মামলার জট এবং রায়দানে বিলম্ব সাধারণ মানুষের মনে বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত হতাশাজনক করে তুলেছে। ‘I will see you in court’-এর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পট জাস্টিস-এর চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট। সমাজে যখন অপরাধের পারদ ক্রমশ উর্ধমুখী হয় এবং রাষ্ট্র অপরাধ দমনে ব্যর্থ থাকে, ঠিক তখন সাধারণ মানুষ প্রচলিত আইনের চেয়ে দমনমূলক ও কঠিন শাস্তির ওপর বেশি ভরসা করতে শুরু করে। আইনের চেয়ে ক্ষমতার ভয়কে তখন অধিক প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। ​যদি একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশই বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তবে তা গণতন্ত্রের স্তম্ভ গুলোকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়ার কাজ করে। গণতন্ত্রকে খোখলা বানিয়ে ছাড়ে! প্রহ্লাদ দাসের মা আমাদের সবার সামনে যে প্রশ্নটা রেখেছে— হাত বাঁধা থাকা সত্ত্বেও সে কীভাবে পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে নিল? তা আসলে এনকাউন্টারের সত্যতা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমগ্র বিচারব্যবস্থা এবং সংবিধানের প্রতি গভীর নৈতিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়! এদেশে গত দুই দশকে মুড়ি মুড়কির মতো বেড়েছে ফেক এনকাউন্টারের সংখ্যা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা একটি আরটিআই থেকে প্রাপ্ত তথ্যে সামনে এসেছে যে ২০০০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভারতে ১৭৮২টি ভুয়ো এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে ঘটেছে ৭৯৪টি অর্থাৎ প্রায় ৪৪.৫৫%। ২০১৭ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এনকাউন্টারের সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপকভাবেই! ভারতের সবর্ববৃহৎ রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কার্যকালে ১৭ হাজার ৪৩টি কথিত এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে বলে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে উত্তর প্রদেশ পুলিশ। এসব ঘটনায় মারা গিয়েছেন ২৮৯ জন। এর মধ্যে অনেকগুলোই ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর সময়ে ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মনে আছে ২০১৯ সালে তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদ? এক পশুচিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে অভিযুক্তকে প্রায় মধ্যরাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্ত বলে অভিযোগ করেছিল তেলেঙ্গানা রাজ্যের পুলিশ। তখনই গুলি চালানো হয়। ওই ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখন এই বিচারবহির্ভূত হত্যার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়ে বলেছিল যে, সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমেই অপরাধীর শাস্তি হওয়া কাম্য। 

মডেল এক! অপরাধের ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্ত পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করবে। আর পুলিশ আত্মরক্ষার্থে খুন করবে অপরাধীকে। অতীতে ভারতে বহু এমন এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। এরাজ্যেও শুরুটা এক মডেলেই। অথচ প্রশ্ন ওঠে, পুলিশের রিভলভার কীভাবে ছিনতাই হল? বন্দি পালানোর চেষ্টা করলে তার পায়ে বা কোমরের নিচে গুলি করার কথা, তাহলে হত্যা করার জন্য গুলি কেন করা হল? প্রশ্নগুলো কেউ তুলছে না বা তুলবেও না, কারণ এনকাউন্টার এদেশে শুধুই আর অপরাধ দমনের পদ্ধতিতে আটকে নেই। বরং এনকাউন্টার এদেশের পপুলিস্ট কালচারে বরাবর নায়কোচিত কাজ হিসেবে উপস্থাপিত হয়ে এসেছে! অনুষ্টুপ বসুর ২০১০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে (‘Encounters in the City: Cops, Criminals, and Human Rights in Hindi Film’)  দেখিয়েছেন, মুম্বইয়ের এনকাউন্টার সংস্কৃতি কীভাবে জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমায় পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এনকাউন্টার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উপাদান হল এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট কিংবা দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি। এখানে একজন পুলিশ অফিসারকে এমনভাবে দেখানো হয়, যেন প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হলেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতায় অপরাধের সমাধান করতে সক্ষম। হিরোইজম আছে, আইনের বালাই নেই! রোহিত শেট্টিরা কোপাগান্ডা (Copaganda, কপ এবং প্রোপাগান্ডা শব্দ দুটির মিশ্রণ) ছড়িয়ে একের পর এক ব্লকবাস্টার বানিয়েছেন, আর রাষ্ট্র দেদার এনকাউন্টার সংস্কৃতির কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার করেছে। ২০২৬ সালে National Law School of India Review-এ প্রকাশিত স্তুতি শাহ ও জ্যোতিকা তোমারের গবেষণাপত্রে ( “Glorifying Khaki: Policing, Power, and Copaganda in Hindi Cinema”) রোহিত শেট্টির জনপ্রিয় কপ ইউনিভার্সের সিনেমাগুলিকে বিশ্লেষণ করে দেখায়, কীভাবে কিছু মূলধারার সিনেমা পুলিশি vigilante-কে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকে প্রয়োজনীয় ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। অপূর্ব লাখিয়ার Shootout at Lokhandwala, সঞ্জয় গুপ্তের Shootout at Wadala, কিংবা রোহিত শেট্টির Singham, Simmba আসলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছে। গ্রামসির তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই! শাসন কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই নয়, সামাজিক সম্মতি, সংস্কৃতি ও প্রচলিত ধারণার মাধ্যমেও স্থায়ী হতে পারে। আর এই মুহূর্তে এদেশে আরএসএস-বিজেপির ফ্যাসিবাদী প্রবণতা নিজেদের কুকীর্তির সামাজিক সম্মতি আদায়ে ব্যস্ত! এনকাউন্টার সংস্কৃতিকে প্রথমে জনপ্রিয় করে তুলে, তার দ্বারা বিরোধী কণ্ঠ কিংবা এদেশের সংখ্যালঘু, প্রান্তিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো। 

কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন কিংবা ভারতীয় সংবিধান এ-ব্যাপারে কী বলছে? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর মৌলিক ঘোষণাপত্র Universal Declaration of Human Rights-এ জীবনের অধিকার সংবলিত ৩নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “Everyone has the right to life, liberty and security of person.”, অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। একই কথা বলছে ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদও– “No person shall be deprived of his life or personal liberty except according to procedure established by law.” এই অধিকার শুধু নির্দোষ ব্যক্তির জন্য নয়। অভিযুক্ত, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি, দণ্ডিত অপরাধী এবং রাষ্ট্রের বিরোধী ব্যক্তিও সংবিধানের সুরক্ষার আওতায় থাকে। রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের বৈধতাও নির্ধারিত হবে আইন, প্রয়োজনীয়তা, পরিস্থিতি এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির (ICCPR) ধারা ৬(১) অনুসারে: “প্রত্যেক মানুষের জীবন ধারণের সহজাত অধিকার রয়েছে। এই অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে। কাউকে যথেচ্ছভাবে তার জীবন থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।” ICCPR-এর ধারা ১৪(২) অনুসারে, অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে অভিযোগ প্রমাণিত না-হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য করা হবে। 

সাজানো কিংবা ভুয়ো এনকাউন্টার তো ভারতীয় সংবিধানের ১৪নং এবং ২১নং অনুচ্ছেদের মতো মূল সাংবিধানিক বিধানগুলির পরিপন্থী। ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ অনুযায়ী, আইনের চোখে রাষ্ট্রের শাসক, পুলিশ, সাধারণ নাগরিক, অভিযুক্ত কিংবা অপরাধী— কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ভুয়ো এনকাউন্টার আইনের চোখে অসমতা তৈরি করে। ধরুন, দুজন ব্যক্তি একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত। একজনের ক্ষেত্রে পুলিশ FIR, তদন্ত, চার্জশিট, বিচার এবং আদালতের রায় অনুসরণ করছে। অন্যজনকে কোনো বিচার ছাড়াই এনকাউন্টারের নামে হত্যা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে আইনের স্বাভাবিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। রাষ্ট্র নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে বিচার পাবে আর কে বিচার ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডের মতো পরিণতির সম্মুখীন হবে। ভুয়ো এনকাউন্টার একজন অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থন, সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন এবং নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। মণিপুরে ১,৫২৮টি কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়ে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টে Extra Judicial Execution Victim Families Association v. Union of India (2017) মামলা দায়ের হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, সশস্ত্র বাহিনী বা পুলিশের অতিরিক্ত কিংবা প্রতিশোধমূলক বলপ্রয়োগে মৃত্যু হলে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। আদালত নির্দিষ্ট অভিযোগগুলির তদন্তের জন্য CBI-র বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দেয়। 

আর ন্যায্য বিচারের অধিকার এদেশের ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২-এ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির অধিকার এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আটক সংক্রান্ত সুরক্ষা রয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের কারণ জানানো, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ এবং গ্রেপ্তারের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার মতো বিধান অন্তর্ভুক্ত। কাউকে গ্রেপ্তার করার পর যদি আইনানুগ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে হত্যা করা হয়, তাহলে ঘটনাটি শুধু জীবনের অধিকারের প্রশ্ন নয়; বেআইনি আটক, হেফাজতের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। 

জাতিসংঘের Economic and Social Council ১৯৮৯ সালে “Principles on the Effective Prevention and Investigation of Extra-legal, Arbitrary and Summary Executions” গ্রহণ করে। এই নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত, নির্বিচার ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মতো হত্যাকাণ্ড আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা জরুরি পরিস্থিতিকেও এ ধরনের হত্যার সাধারণ অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। 

ওম প্রকাশ ও অন্যান্য বনাম ঝাড়খণ্ড রাজ্য মামলায় আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, “শুধুমাত্র একজন কুখ্যাত অপরাধী বলেই অভিযুক্তকে হত্যা করা পুলিশ কর্মকর্তাদের কর্তব্য নয়। নিঃসন্দেহে, পুলিশকে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে বিচারের জন্য সোপর্দ করতে হবে।” আদালত আরও বলে যে, এগুলো রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষিত সন্ত্রাসবাদের শামিল।

আর.এস সোধি বনাম উত্তরপ্রদেশ রাজ্য মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, কোনো মৃত্যু ভুয়া এনকাউন্টারের কারণে ঘটেছে নাকি প্রকৃত এনকাউন্টারের কারণে, তা নিবিড়ভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এই মামলায়, তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা যাতে নষ্ট না-হয়, সেজন্য তদন্তভার সিবিআই-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪-তে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট People’s Union for Civil Liberties (PUCL) v. State of Maharashtra মামলায় পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নির্দেশাবলি (এনকাউন্টারে মৃত্যু হলে দ্রুত নথিবদ্ধকরণ ও তদন্ত, ঘটনাটির উপযুক্ত ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা, সাক্ষ্য, অস্ত্র ও ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ ও পরীক্ষা, ময়নাতদন্ত এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট প্রস্তুত করা, বেআইনি হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য প্রযোজ্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ থাকলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ ইত্যাদি) নির্ধারণ করে। রায়টিতে ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ২১-এর গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয় এবং পুলিশি এনকাউন্টারকে বিচারের আওতা ও তদন্তমূলক জবাবদিহির বাইরে রাখা যায় না বলে স্পষ্ট করা হয়েছিল। 

অর্থাৎ, যে তিনটি আইনি দিক এক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য রাখছে– প্রথমত, পুলিশের কাছে কেউ অপরাধী বলে সন্দেহভাজন হলেও আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না-হওয়া পর্যন্ত তার বিচার পাওয়ার অধিকার থাকে। দ্বিতীয়ত, আত্মরক্ষা বা অন্যের জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ এবং শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যা এক নয়। আর তৃতীয়ত, পুলিশি অভিযানে মৃত্যু হলে স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। গুরুতর অপরাধের পর জনরোষ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। কিন্তু জনপ্রিয়তা এবং আইনি বৈধতা এক বিষয় নয়। কোনো হত্যাকাণ্ডকে জনতার একাংশ সমর্থন করলেও তা নিজে থেকে বৈধ হয়ে যায় না। আবার কোনো পুলিশি বলপ্রয়োগ জনসমক্ষে সমালোচিত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি প্রমাণিত হয় না। তাই প্রয়োজন হয় নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, প্রমাণ এবং আইনের প্রয়োগ। এই কারণেই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্র কি শুধু অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে, নাকি নিজের ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কেও একই মাত্রায় জবাবদিহি করছে? না জমা খরচের হিসেব করতে গিয়ে জবাবদিহিতা ভুলেছে? 

যে দেশে বিলকিস বানোর ধর্ষকদের মুক্তির উল্লাস হয়, যে দেশে তিলোত্তমার ধর্ষণের ঘটনায় বিচারের নামে প্রহসন হয়, যে দেশে সমাজবিরোধীরা চালায়, যে দেশে আশারামদের বাপু বানানো হয়, অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যামামলায় জড়িত নাম দুষ্যন্ত কুমার গৌতমদের রাজ্যপাল বানানো হয়, আর প্রজ্বল রেভান্নাদের সংসদে পাঠানো হয়– সেই দেশের মানুষ দেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারাবে স্বাভাবিকভাবেই। সেই দেশের মানুষ পুলিশের হিরোইজমে প্রভাবিত হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর এনকাউন্টারকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো রাষ্ট্র ভয়ের শাসন কায়েম করবে দেশে! আইনের শাসন নয়, ভয়ের। যে ভয়ে অপরাধ ভাঙবে না, ভাঙবে গণতন্ত্র।


প্রকাশের তারিখ: ০৩-নভেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org