সিএএ: বিধির বিপদ

অর্ণব ভট্টাচার্য
সিএএ-র বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি, খ্রিস্টান, শিখ উদ্বাস্তুদের একটি হলফনামা দিতে হবে। এছাড়া তাদের যোগ্যতা সংক্রান্ত একটি শংসাপত্র (এলিজিবিলিটি সার্টিফিকেট) দেখাতে হবে, যেখানে প্রত্যেক উদ্বাস্তুর পরিচিতি সম্পর্কে এবং তারা যে স্বধর্মে আছেন তার শংসাপত্র দেবেন একজন স্থানীয় এবং সুপরিচিত সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানের কোনও কর্মকর্তা।

আইন পাশ হওয়ার সাড়ে চার বছর পর সিএএ-র বিধি প্রকাশিত হল। যথারীতি এ নিয়ে বিরাট কৃতিত্ব দাবি করছে বিজেপি যেন কোনও ঐতিহাসিক কাজ করেছে কেন্দ্রের সরকার! অথচ বিধিতে লুকিয়ে রয়েছে বিপদ, যা কিনা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। অবশ্য আরএসএস-বিজেপি মানুষকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে চলেছে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে। 

আইনী কাগজপত্র ক’জনের আছে? 

সিএএ-র বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে এদেশে আশ্রয় নেওয়া অমুসলিম উদ্বাস্তুদের অনলাইনে আবেদন জমা করে নিজেদের বেআইনী অনুপ্রবেশকারী বলে ঘোষণা করতে হবে। এই উদ্বাস্তুরা যে একসময় বাংলাদেশ বা পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের নাগরিক ছিলেন তার প্রমাণ হিসেবে দিতে হবে পাসপোর্ট/ রেসিডেন্সিয়াল পারমিট/ বার্থ সার্টিফিকেট/ স্কুল সার্টিফিকেট/ সরকারি আইডেন্টিটি কার্ড/ সরকারি লাইসেন্স /জমির দলিল /বাবা-মা বা দাদু-দিদিমা বা ঠাকুরদা-ঠাকুরমার মধ্যে কারুর এই তিন দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ/ যে কোনও সরকারি নথি– যা আবেদনকারীকে ওই তিন দেশের মধ্যে কোন একটির বাসিন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এর সাথে দিতে হবে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে অন্তত সাত বছর একটানা থাকার কোনও প্রমাণ। সেই কাগজ জোগাড় করতেও অনেকের সমস্যা হবে। তবু ধরা যাক, ভারতে থাকার প্রমাণ কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে জোগাড় হয়ে গেল, কিংবা কারুর রেশন কার্ড বা স্কুল সার্টিফিকেট আছে। কিন্তু অনেকের কাছেই তো বাংলাদেশ বা পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে থাকার কোন বৈধ প্রমাণপত্র নেই। তাদের কি হবে? দেশভাগের বলি এই সমস্ত অগণিত মানুষ যাদের রাষ্ট্র নিঃশর্তে গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদের এভাবে বড় বিপদে ফেলতে চলেছে সিএএ। 

অমুসলিম উদ্বাস্তুদের শংসাপত্র-আরেক ফাঁদ 

সিএএ-র বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি, খ্রিস্টান, শিখ উদ্বাস্তুদের একটি হলফনামা দিতে হবে। এছাড়া তাদের যোগ্যতা সংক্রান্ত একটি শংসাপত্র (এলিজিবিলিটি সার্টিফিকেট) দেখাতে হবে, যেখানে প্রত্যেক উদ্বাস্তুর পরিচিতি সম্পর্কে এবং তারা যে স্বধর্মে আছেন তার শংসাপত্র দেবেন একজন স্থানীয় এবং সুপরিচিত সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানের কোনও কর্মকর্তা। সরকারি পরিভাষায় এই ‘লোকালি রেপিউটেড কমিউনিটি ইনস্টিটিউশান’ বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে যাদের দেওয়া শংসাপত্রের ওপর নাগরিকত্ব পাওয়া বা না-পাওয়া নির্ভর করছে? এভাবে কি সঙ্ঘ পরিবারের সংগঠনগুলির মুখাপেক্ষী করে তোলা হবে উদ্বাস্তুদের? লক্ষ্যণীয় যে এক্ষেত্রে নিবন্ধীকৃত বা রেজিস্টার্ড সংস্থার কথা বলা হয়নি, শুধু স্থানীয় ও সুপরিচিত সংস্থা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ এভাবে কার্যত সঙ্ঘ পরিবারের ছত্রছায়ায় গজিয়ে ওঠা নানাবিধ সংগঠনের ইচ্ছা, অনিচ্ছার ওপর নাগরিকত্বের মত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে। এটা অত্যন্ত গর্হিত এবং বেআইনী পদক্ষেপ যা উদ্বাস্তুদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। 

তথ্য যাচাই কে করবে? 

নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সমস্ত আবেদন জেলা স্তরের কমিটির মাধ্যমে কেন্দ্রের নিযুক্ত কমিটির কাছে জমা পড়বে। জেলাস্তরের কমিটি প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদন খতিয়ে দেখে কেন্দ্রের নিযুক্ত এমপাওয়ারড কমিটিকে পাঠাবে। এই এমপাওয়ারড কমিটি সব তথ্য যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। নাগরিকত্বের আবেদনকারীর পক্ষ থেকে দাখিল করা তথ্যপ্রমাণ যাচাই করার সময় বাংলাদেশ বা পাকিস্তান কিম্বা আফগানিস্তানে থাকার যে প্রমাণপত্র দেওয়া হবে তাকে যাচাই করতে গেলে তো সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। সেটা না পাওয়া গেলে তো আবেদনকারী ত্রিশঙ্কু অবস্থায় থাকবেন। কতদিন বা কত বছর এই অবস্থা চলবে তা কেউ বলতে পারবে? আসামের মানুষের সম্প্রতি এনআরসি নিয়ে করুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। সিএএ-র বিধি অনুযায়ী নাগরিকত্বের আবেদনে যিনি নিজেকে স্বেচ্ছায় বেআইনী অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঘোষণা করেছেন তার কি পরিণতি হবে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। 

কাজের কথা 

২০১৯ সালে মূলত ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্রতর করার জন্য সিএএ পাশ করেছিল বিজেপি। একদিকে সংবিধান লঙ্ঘন করে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হল এবং সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝানো হল যে তারা অবাঞ্ছিত। অন্যদিকে বিজেপি এনডিএ সরকারের পুরোনো অপরাধ, ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সিএএ-র মাধ্যমে সব উদ্বাস্তুকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু সিএএ-র যে বিধি প্রকাশিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করে একথা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে এই ভাবে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা কার্যত নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারা। এই আইন একটি ফাঁদ যা উদ্বাস্তুদের চরম বিপদে ফেলবে। বিশেষত যারা গরিব, নিম্নবিত্ত তারা বড় সমস্যায় পড়বেন। 

দেশভাগ ছিল এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। যারা তার শিকার হলেন তাদের নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দিতে হবে। তাদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি চলবে না। তাই অবিলম্বে ২০০৩ সালের কালা নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে সিএএ কে পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

আরও জানতে পড়ুন–

সিএএ: লক্ষ্য আসলে মেরুকরণ : শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার


প্রকাশের তারিখ: ১৫-মার্চ-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org