বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রশ্ন : আপনি ইতিহাস চর্চায় সাম্প্রতিক সরকারি হস্তক্ষেপের উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন করেছে?
রোমিলা থাপার: ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদের (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টরিকাল রিসার্চ) 'টুয়ার্ডস ফ্রিডম' গ্রন্থমালার অন্তর্ভুক্ত অধ্যাপক কে এন পানিক্কর ও অধ্যাপক সুমিত সরকার সম্পাদিত বই দুটির প্রকাশ বন্ধ করতে গিয়ে এবং এন সি ই আর টি-র বিদ্যালয় স্তরের পাঠ্যপুস্তকগুলি নতুন করে লেখার ক্ষেত্রে যে ধরনের গোপনীয়তা অবলম্বন করা হচ্ছে তা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। দেশের কয়েকজন অগ্রণী ঐতিহাসিকদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি বইদুটি প্রকাশনার অনুমতি দেওয়া সত্ত্বেও যে ভাবে সরকারী হস্তক্ষেপে বই দুটির প্রকাশনা বন্ধ করা হলো তা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ঐতিহাসিকের স্বাধীনতার উপর একটা বড় আঘাত, কেন বইদুটো প্রকাশ করা হবে না তার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ দেখানো হয়নি। নতুন করে কেনই বা এর পর্যালোচনা প্রয়োজন তাও আমার কাছে বোধগম্য নয়। বিদ্যালয় স্তরের বইগুলির ক্ষেত্রেও একই গোপনীয়তা আমরা লক্ষ্য করি। ১৯৬৫ সালে যখন বইগুলো লেখার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল, তখন পাঠক্রম তৈরি করেছিলেন একদল বিশেষজ্ঞ। পরে আর একটি কমিটি তাদের তৈরি করা পাঠক্রমের মূল্যায়ন করেছিল। পুরনো পাঠক্রম পালটানো যেতেই পারে। নতুন করে পাঠ্যপুস্তকও লেখা প্রয়োজন। কিন্তু শুধুমাত্র বামপন্থী পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে পাঠ্যপুস্তকগুলি বাতিল করা নিন্দনীয়। এ ক্ষেত্রেও সেই একই গোপনীয়তা। কারা এই পাঠক্রমের পুনর্মূল্যায়ন করবেন, কারাই বা নতুন করে পাঠ্যপুস্তকগুলি লিখবেন তা সুষ্ঠুভাবে জানা প্রয়োজন। ইতিহাসের পাঠক্রম ও পাঠ্যবিষয় দেশের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিকেরাই ঠিক করতে পারেন, সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা ধর্মীয় নেতাদের ভাবনা গ্রহণযোগ্য নয়। ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে একথাও মানা যায় না। আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে এসেছিল—এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় মূলত কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে। তাতে ঐতিহাসিকের বিশ্লেষণ পালটানো যায় না।
প্রশ্ন। আপনার কি মনে হয় পাঠ্যপুস্তক লেখার ক্ষেত্রে সরকারের কোন ভূমিকা থাকা উচিত নয় ?
রোমিলা থাপার: ইদানীং ঘটনাক্রম থেকে আমার ক্রমশ তাই মনে হচ্ছে। যদি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সরকার পালটানোর সঙ্গে সঙ্গে পাঠক্রম ও পাঠ্যবিষয় পরিবর্তন করা আবশ্যিক হয়ে ওঠে, তাহলে এক্ষেত্রে সরকারী ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। কিন্তু কয়েক দশক আগে আমরা যখন বিদ্যালয় স্তরের পাঠ্যপুস্তক লিখতে আগ্রহী হয়েছিলাম, তখন বিদ্যালয় স্তরের ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকগুলির অত্যন্ত নিম্নমান আমাদের অনেক বেশি ভাবিয়েছিল। আবার কয়েকটি উচ্চমানের পাঠ্যপুস্তক ছাত্রদের দিতে চেয়েছিলাম, যেগুলি অগ্রণী ঐতিহাসিকদের লেখা এবং বিজ্ঞান সন্মত পদ্ধতি অনুসরণ করে। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটা মৌলিক কাঠামো আমরা দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম, যাতে ভারতের ইতিহাসের পঠনপাঠন ও আমাদের ইতিহাস চেতনা আঞ্চলিক সঙ্কীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ না থাকে। আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রয়োজন নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু ভারতীয় জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে আঞ্চলিক ইতিহাসের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন আমার মনে হয় সরকারি উদ্যোগে পাঠ্যপুস্তক না লিখে তা ঐতিহাসিকদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
প্রশ্ন: ভারতীয় ইতিহাস বীক্ষায় বিশেষত প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ প্রায়ই উঠছে। আপনি এ বিষয়ে কী মনে করেন ?
রোমিলা থাপার: নানাভাবে বিভিন্ন স্তরে এ জাতীয় বিকৃতি যে ঘটে সে সম্পর্কে আমাদের অবহিত থাকা প্রয়োজন ও এই বিকৃতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করা প্রয়োজন। ঐতিহাসিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে অনেক সিনেমা তৈরি হয়, সেগুলি বিনোদন হিসাবে ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে সিনেমায় যেভাবে চরিত্র বা ঘটনার উপস্থাপনা ঘটে তা ইতিহাস নয়। অশোকের উপর যে চলচ্চিত্রটি এখন দেখানো হচ্ছে, তাকে তো আর ইতিহাস বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক সময়ই যারা এই সিনেমাগুলো দেখেন তাঁদের অনেকেই এর মধ্যে ইতিহাসের সন্ধান করেন। তাই স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে এই ধরনের ফিল্মগুলো মূলত কল্পনাশ্রয়ী, ঐতিহাসিক ভাষার সঙ্গে এর কোন যোগ নেই।
প্রশ্ন । তথ্য বিকৃতির তো আরও নানা উদাহরণ আছে।
রোমিলা থাপার: নিশ্চয়ই। বিদ্যালয় স্তরের পাঠ্য পুস্তকের তথ্য বিকৃতি অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। যেভাবে হিন্দুত্ববাদী চেতনা ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় প্রভাব ফেলছে, তাতে তথ্য বিকৃতি অবশ্যম্ভাবী। আর্যদের আদি বাসস্থান নিয়ে বিতর্ক এমন একটা উদাহরণ যেখানে ভারতবর্ষকে আর্যদের আদিভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেছে।
প্রশ্ন। এর সমাধানের উপায় কী?
রোমিলা থাপার: সাধারণ স্তরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিক চেতনা বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য আঞ্চলিক স্তরে ইতিহাস গবেষণা সংগঠিত করার জন্য আঞ্চলিক সংসদ উপযোগী হতে পারে। আঞ্চলিক স্তরে এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে ইতিহাস গবেষণায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সবথেকে বেশি প্রয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিহাস চেতনা বাড়ানো। যাতে তাঁরা ইতিহাস ও কাহিনির মধ্যে প্রভেদটা বুঝতে সক্ষম হন। এ বিষয়টা ঐতিহাসিকদের অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
প্রশ্ন । এই তথ্য বিকৃতির সমস্যা কি ইতিহাস লেখার একটা অন্যতম মৌলিক সমস্যা নয়, বিশেষত যেখানে ঐতিহাসিক তথ্যের মধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা থাকে ? আমরা সঙ্গত কারণেই যাকে তথ্য বিকৃতি বলছি তাকে অনেকে দুটি ভিন্ন মতের সংঘাত বলে প্রতিপন্ন করতে চাইছেন।
রোমিলা থাপার: শুধুমাত্র দুটি ভিন্ন মতের বিরোধ নয়। তথ্য বিকৃতি তখনই ঘটে যখন তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে পদ্ধতিগুলো ঐতিহাসিকরা অবলম্বন করে আসছেন তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। তথ্যের উৎসেরও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সুলতান মাহমুদের সামরিক অভিযান বর্ণনা করতে গিয়ে সমকালীন একটি গ্রন্থে যে ধরনের গণহত্যার বিবরণ আছে, তা নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন তোলা যায়। কে এই বর্ণনা লিখছেন? কেনই বা লিখছেন? তার উদ্দেশ্য কি? যে আকারের গণহত্যার বিবরণ দিচ্ছেন তা আদৌ সম্ভব কি না? সামরিক অভিযানের সময় এই জাতীয় গণহত্যা বারবার ঘটেছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই বিবরণকে পরে অনেকেই অংশত ব্যবহার করেছেন। অনেকেই সুলতান মাহমুদ তার আক্রমণকালে কিভাবে হিন্দুদের হত্যা করেছিলেন সেকথা বলেছেন, কিন্তু একই সঙ্গে মুলতানে যে বহুসংখ্যক শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিমদের হত্যা করা হয়েছিল সে সম্পর্কে নীরব থেকেছেন। অন্যদিকে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই যে অনেক মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে নীরবতা তথ্য বিকৃতির অন্য রূপ। কলহনের রাজতরঙ্গিনী থেকে জানা যায় খ্ৰীষ্টীয় একাদশ শতকে কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হর্ষদ আর্থিক প্রয়োজনে মন্দির লুট করেছিলেন। এর জন্য ‘উৎপাটন নায়ক’ নামে এক শ্রেণীর কর্মচারী নিযুক্ত হয়েছিল। এরকম আরও উদাহরণ আছে যার ভিত্তিতে বলা যায় রাজশক্তির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা সময়ে এবং সেটা ইসলাম ভারতবর্ষে রাজশক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই মন্দির লুট করা হয়েছে ও মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। অনেক বৌদ্ধ মন্দির ভাঙা হয়েছে। এসব কথা আমরা যথেষ্ট বলছি না কেন ?
প্রশ্ন। সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণ প্রসঙ্গে আলোচনায় সোমনাথ মন্দিরের লুণ্ঠন ও ধ্বংসের প্রসঙ্গ বার বার এসেছে, এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
রোমিলা থাপার: অনেক সময় বলা হয়, সুলতান মাহমুদের আক্রমণ ও সোমনাথ মন্দিরের ধ্বংস হিন্দুদের চৈতন্যে এমন গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল যে হিন্দু মানসিকতায় তার একটা স্থায়ী প্রভাব পড়েছে। 'হিন্দু ট্রমা'-র কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সমকালীন কোন দেশজ সূত্র থেকে আমরা এই 'ট্রমা'-র কোন ইঙ্গিত পাই না। রমেশচন্দ্র মজুমদারও এ প্রসঙ্গে সমকালীন সূত্রগুলির নীরবতার কথা বলেছেন। আর রমেশচন্দ্র মজুমদার নিশ্চয়ই বামপন্থী ছিলেন না। অন্যদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে এই আক্রমণের বিধ্বংসী প্রভাবের উল্লেখ আল-বেরুনীর রচনা থেকে পাওয়া যায়। মাহমুদের আক্রমণ ইসলাম সম্পর্কে হিন্দু মানসে কোন স্থায়ী বিরূপতার সৃষ্টি করেনি। হিন্দুরা তুর্কীদের আক্রমণকারী হিসাবে দেখেছে; কিন্তু আরবী বণিকদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিরূপতা ছিল না। খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের শেষের দিকের একটি লিপিতে সোমনাথ মন্দিরে নির্মাণকার্যের উল্লেখ আছে, কিন্তু সুলতান মাহমুদের কোন উল্লেখ নেই। আবার ত্রয়োদশ শতকের একটি লেখা থেকে আমরা জানতে পারি যে হোরমুজের একজন আরবী বণিক সেখানে জমি পাচ্ছে একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য। অনেককাল পরে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে বিলেতে হাউস অফ কমন্স-এর একটি বিতর্কে আমরা দেখি এই 'ট্রমা'-র কথা বলা হচ্ছে – হিন্দু পরাজয়ের স্মৃতি হিসাবে। আধুনিককালে জাতীয়তাবাদী ভাবনাতেও এ সম্পর্কে মতের বিভিন্নতা ছিল। একদিকে কে এম মুন্সী মন্দির পুনর্নির্মাণের কথা বলেছেন। অন্যদিকে মন্দির পুনর্নির্মাণ জওহরলাল নেহরু একটি জাতীয়তাবাদী প্রকল্প বলে মনে করেননি। আমাদের জাতীয় মানসের এই বহুমাত্রিকতা বিশ্লেষণ করা ভারতীয় ঐতিহাসিকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ঐতিহাসিকের এই অধিকার সুরক্ষিত করার প্রশ্নটি আজ যখন বার বার ফিরে আসছে, তখন জাতীয় রাষ্ট্রের প্রথম পর্যায়ের নেহরুবাদী উদারপন্থার নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না।
প্রশ্ন। বিশ্বাস ও ইতিহাসের মধ্যে সম্পর্ক কী?
রোমিলা থাপার: যে যা বিশ্বাস করে তাই-ই তো ঘটেনি। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদরা বড়জোর বলতে পারেন বিশ্বাসকে ইতিহাস বলে ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু কেউ যখন বলতে শুরু করে বিশ্বাসই ইতিহাস এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে রামের জন্ম এখানেই, সেখানে মন্দির ছিলো তখন ইতিহাসবিদকে কথা বলতেই হয়। বলতেই হয়, না তেমন কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। আজকের দিনে ঐতিহাসিক প্রমাণ বলতে কী বোঝায় এবং সেই প্রমাণ কীভাবে প্রমাণিত হয়, তা নিয়ে অনেক তীব্রতর ধারণা আমাদের আছে। সুতরাং অতীত সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের ব্যাখ্যা আর ভারতীয় ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ যে ব্যাখ্যা চালু করতে চাইছে তার মধ্যে পার্থক্য আছে। পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রায়ই ইতিহাসের নামে বিশ্বাসকে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ হয়তো বলেন রামজন্মভূমি এখানেই ছিলো। তাহলে দেখতে হবে তাদের যুক্তির ধরন কী, যারা বিরোধিতা করছেন তাদের যুক্তির ধরনই বা কী। কেননা প্রচলিত ধারণা যা-ই হোক, সেই ধারণাকে শিরোধার্য করে ইতিহাসবিদ চলতে পারেন না।
প্রশ্ন। ইতিহাসবিদরা কি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন?
রোমিলা থাপার: সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ সবসময়েই ইতিহাসকে ব্যবহারের চেষ্টা করে। ১৯২০-৩০'র দশকে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা দুই পৃথক সম্প্রদায় থেকে দুই পৃথক জাতির তত্ত্বে পৌঁছেছিল। একইভাবে হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িক লেখালিখিতে এই তত্ত্বকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। হিন্দুত্বের আন্দোলন যখন শুরু হয়, সাভারকার ও গোলওয়ালকরের মতো নেতারা এইরকম প্রশ্ন তুলতে থাকেন - আমাদের জাতির উৎস কী? হিন্দু জাতি কীভাবে তৈরি হলো? কোনো জনগোষ্ঠী বা জাতি বা সম্প্রদায়ের উৎস নিয়ে আলোচনা হলে অবশ্যই ইতিহাস এসে যায়। দ্বিতীয়ত, জাতির পরিচিতিসত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠলে তা ইতিহাসেরই প্রশ্ন। আর তৃতীয়ত, যেমন আমরা সাম্প্রতিককালে দেখেছি অতীতের ভ্রান্তিকে ঠিক করা বা বদলা নেবার যুক্তি হাজির করা হচ্ছে। কিছু কাজের মাধ্যমে যেন ভারসাম্য তৈরি করা, যেন অযোধ্যায় যদি কোনো মন্দির থেকে থাকে আর বাবর যদি তা মসজিদ তৈরির জন্য ভেঙে থাকেন তাহলে মসজিদ ভাঙলে সমান সমান হয়ে যাবে। এক ধরনের ধ্বংসকাণ্ডকে আরেক ধরনের ধ্বংসকাণ্ড দিয়ে জবাব দেওয়া। অতীতের বদলা আজ সত্যিই কি নেওয়া যায়? অতীতের সমস্যা যদি বর্তমানের কোনো সমস্যা তৈরি করে থাকে তাহলে চেষ্টা করা যেতে পারে পরিস্থিতিকে উন্নততর করার, সমস্যার খারাপ অংশটি সারিয়ে তোলার। কিন্তু অতীতের ভুল সংশোধনের ভণিতা করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের কারণে। সেক্ষেত্রে ইতিহাসবিদকে ঢুকে পড়তে হচ্ছে রাজনৈতিক বিতর্কে। এই বিতর্কে অংশ নিতেই হবে এবং বলতে হবে ইতিহাসকে এভাবে ব্যবহার করা চলে না।
প্রকাশের তারিখ: ০৫-ডিসেম্বর-২০২২ |